দৈনিক প্রান্তিক ডেস্ক | ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভোটাধিকার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও নাগরিক স্বাধীনতার দাবিতে নতুন মাত্রা পেয়েছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে ঘোষিত ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ (উড়তে দাও জাতীয় পতাকা) কর্মসূচির আগে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক অভিজিৎ দীপকেকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। কিন্তু একজন নেতাকে আটকের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের গতি থামানো যায়নি। জাতীয় পতাকা হাতে দিল্লির রাজপথে সমবেত হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। একই সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন শহরেও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। আন্দোলন অব্যাহত রাখতে বিকল্প কর্মপরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান বি’ প্রস্তুত রাখার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
শুক্রবার বিকেল ৫টায় কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে কর্মসূচি শুরুর কথা ছিল। এর আগেই পুরো এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে দিল্লি পুলিশ। পার্কের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ, কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (র্যাফ) সদস্য। প্রস্তুত রাখা হয় জলকামান ও আটককারী যানবাহন। যানজট ও জননিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা কার্যকর থাকার কথা উল্লেখ করে অভিজিৎ দীপকেকে কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার নোটিশ দিয়েছিল পুলিশ।
বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে ঝান্ডেওয়ালার আবাসস্থল থেকে বের হওয়ার পরপরই অভিজিৎ দীপকেকে আটক করে পুলিশ। এ সময় নিজের আটকের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। একই অভিযানে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) নেত্রী নেহা বোরাসহ আরও কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়।
তবে এই আটকের মধ্যেও আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি থেমে থাকেনি। কনট প্লেসে জাতীয় পতাকা হাতে সমবেত হন প্রায় এক হাজার মানুষ। তাঁদের হাতে ছিল ভারতের জাতীয় পতাকা; কণ্ঠে ছিল নাগরিক অধিকার, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির দাবি। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে উঠে আসে—জাতীয় পতাকা বহন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহি চাওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের অংশ। তাঁদের কাছে এই কর্মসূচি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদ নয়; বরং গণতান্ত্রিক অধিকার ও নাগরিক মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন।
সিজেপির মিডিয়া সমন্বয়ক বিজয় এম আগেই জানিয়েছিলেন, অভিজিৎ দীপকেকে কর্মসূচিস্থলে যেতে বাধা দেওয়া হলে বিকল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ‘প্ল্যান বি’ প্রস্তুত থাকার কথা জানানো হলেও এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। তবে নেতাদের অনুপস্থিতিতেও কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে আন্দোলনটি সাংগঠনিক উদ্যোগের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততার পরিচয় দিয়েছে।
এর আগে গত ১০ অক্টোবরের আন্দোলনের সময় অভিজিৎ দীপকেসহ অন্য নেতারা আটক হলে পূর্বে ধারণ করা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে অজিনক্যা শিন্ডেকে সাময়িকভাবে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এবারও আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিকল্প নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সিজেপি।
আন্দোলনের মূল দাবি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের তদন্ত এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। সংগঠনটির অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক নাগরিকের নাম বাদ পড়েছে, যা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগকে সংকুচিত করতে পারে। এ কারণে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে তারা।
এর আগে আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় সিজেপির নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে তিহার কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁদের আটকের প্রতিবাদ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতেই নতুন করে ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল।
উল্লেখ্য, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে ভারতে রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসরে বিতর্ক চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত ও শনাক্ত করা যায়নি—এমন ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার কারণেই তালিকায় পরিবর্তন এসেছে। ভুলবশত বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে বলেও কমিশন জানিয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় আন্দোলনকারীরা।
সিজেপির আন্দোলনের প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের সমর্থনও আলোচনায় এসেছে। আম আদমি পার্টি (এএপি) কনট প্লেসের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির প্রশ্নটি দলীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর নাগরিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।
অভিজিৎ দীপকের আটকের পরও জাতীয় পতাকা হাতে মানুষের রাজপথে উপস্থিতি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। নেতৃত্বের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতির চেয়ে নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, অংশগ্রহণ এবং সাংবিধানিক দাবির প্রতি তাঁদের অঙ্গীকারই যে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি—দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
এখন সিজেপির ঘোষিত ‘প্ল্যান বি’ কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, আন্দোলনে আরও বৃহত্তর নাগরিক অংশগ্রহণ তৈরি হয় কি না এবং ভোটাধিকার ও নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান কতটা এগোয়—সেদিকেই নজর ভারতের রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের।
দৈনিক প্রান্তিক ডেস্ক | ১৬ অক্টোবর ২০২৬ 

























