Dhaka ০৪:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমি! আমার কে!

মোঃ আলফাজ উদ্দিন

গণ সাংবাদিক ও নাগরিক লেখক।

মানুষের জীবনে সবচেয়ে উচ্চারিত দুটি শব্দ—‘আমি’ এবং ‘আমার’। শব্দ দুটি ছোট, অথচ এর বিস্তার মহাবিশ্বের মতো বিশাল। জন্মের পর থেকেই মানুষ নিজের অস্তিত্বের পরিচয় খুঁজতে শেখে। একটু বড় হলে আবিষ্কার করে অধিকার, সম্পর্ক, স্বার্থ ও প্রত্যাশা। একসময় ‘আমি’ হয়ে ওঠে ব্যক্তিসত্তার পরিচয়, আর ‘আমার’ হয়ে ওঠে অধিকারবোধের পরিধি। কিন্তু জীবনের গভীরতর প্রশ্নটি থেকে যায়—আমি আসলে কে? আর যাকে আমার বলছি, সে-ই বা কতটুকু আমার?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মানুষকে নিজের আয়নার সামনে দাঁড়াতে হয়। সেখানে শুধু মুখ দেখা যায় না; দেখা যায় তার আচার-অনাচার, সত্য-মিথ্যা, বিবেক-অবিবেক, যুক্তি-অযৌক্তিকতা, ভালোবাসা-বিদ্বেষ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং আত্মপ্রবঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস।

‘আমি’ মানুষের অস্তিত্বের স্বাভাবিক ঘোষণা। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া অপরাধ নয়; বরং আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিকাশের পূর্বশর্ত। কিন্তু এই আমিত্ব যখন আত্মকেন্দ্রিকতায় রূপ নেয়, তখন মানুষ নিজের বাইরে অন্য কোনো অস্তিত্বকে স্বীকার করতে চায় না। নিজের মতকে সত্য, নিজের সিদ্ধান্তকে ন্যায়, নিজের স্বার্থকে প্রয়োজন এবং নিজের অবস্থানকে চূড়ান্ত বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এখানেই আত্মপরিচয়ের সঙ্গে অহমিকার পার্থক্য তৈরি হয়।

আত্মমর্যাদা মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়, অহমিকা অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় ভাবতে শেখায়। আত্মবিশ্বাস মানুষকে সত্যের মুখোমুখি করে, অহমিকা সত্যকে নিজের অনুকূলে সাজাতে শেখায়। ফলে মানুষ একসময় নিজের ভুলের চেয়েও অন্যের প্রতিবাদকে বড় অপরাধ মনে করতে শুরু করে।

অথচ মানুষ যত বড়ই হোক, তার জ্ঞান সীমিত, ক্ষমতা সাময়িক এবং অস্তিত্ব অনিবার্যভাবে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

মানুষের পরিচয় তার উচ্চারিত বক্তব্যে যতটা প্রকাশ পায়, তার চেয়ে বেশি প্রকাশ পায় আচরণে। মুখে নীতি, অন্তরে স্বার্থ; কথায় মানবতা, কাজে নিষ্ঠুরতা; প্রকাশ্যে সততা, গোপনে অনাচার—এসব বৈপরীত্য মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সমাজে এমন মানুষের অভাব নেই, যারা অন্যের অনিয়মের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, অথচ নিজের অনিয়মের ক্ষেত্রে নীরব। অন্যের দুর্নীতিকে অপরাধ বলে, নিজের সুবিধা আদায়কে কৌশল বলে। অন্যের মিথ্যাকে প্রতারণা বলে, নিজের মিথ্যাকে পরিস্থিতির প্রয়োজনে বলা কথা বলে চালিয়ে দেয়।

এখানেই নৈতিকতার সবচেয়ে বড় সংকট। কারণ অনাচার কেবল অপরাধ সংঘটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যায়কে ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও একধরনের নৈতিক বিচ্যুতি।

মানুষ যখন নিজের বিবেকের আদালত বন্ধ করে দেয়, তখন বাইরের কোনো আদালতই তাকে পুরোপুরি ন্যায়পরায়ণ করতে পারে না।

সত্যের একটি নিজস্ব অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু মানুষ প্রায়ই সত্যকে দেখে নিজের অবস্থান, বিশ্বাস, স্বার্থ ও অভিজ্ঞতার জানালা দিয়ে। ফলে একই ঘটনা কারও কাছে ন্যায়বিচার, কারও কাছে অবিচার; কারও কাছে প্রতিবাদ, কারও কাছে বিশৃঙ্খলা; কারও কাছে আত্মরক্ষা, কারও কাছে আগ্রাসন।

এখানে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্বাভাবিক। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যকে সত্যের বিকৃতি ঘটানোর অজুহাত বানানো বিপজ্জনক।

মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর মিথ্যাটি অনেক সময় অন্যকে বলা মিথ্যা নয়; বরং নিজেকে বলা মিথ্যা। নিজের স্বার্থপরতাকে দায়িত্ব, প্রতিহিংসাকে ন্যায়বিচার, ক্ষমতার অপব্যবহারকে শৃঙ্খলা এবং পরাজয়কে ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের কাছেই নিজের সত্য গোপন করে।

এভাবে একসময় মিথ্যা আর সত্যের পার্থক্য হারিয়ে যায় না; বরং মানুষ পার্থক্যটি জেনেও মিথ্যার পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

দর্শন মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা তৈরি করে। প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করতে শেখায়, অস্তিত্ব ও বাস্তবতার গভীরে প্রবেশ করতে শেখায়। কিন্তু দর্শন যখন চিন্তার পরিবর্তে গোষ্ঠীগত আনুগত্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তার মুক্তিকামী চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মানুষের চিন্তাজগতে দ্বন্দ্ব থাকবে। বিশ্বাসের সঙ্গে সংশয়, আবেগের সঙ্গে বিবেচনা, ব্যক্তিস্বার্থের সঙ্গে সামষ্টিক স্বার্থ এবং স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। এই দ্বন্দ্ব থেকেই নতুন চিন্তা, নতুন উপলব্ধি এবং সভ্যতার অগ্রযাত্রা।

কিন্তু দ্বন্দ্ব যখন সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে ব্যক্তি আক্রমণ, মত দমন কিংবা প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতায় পর্যবসিত হয়, তখন তা আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থাকে না।

যুক্তি মানুষের চিন্তাকে শাণিত করে, কিন্তু যুক্তির নামে অযৌক্তিকতাকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। অনেক সময় মানুষ যুক্তি খোঁজে সত্য জানার জন্য নয়, বরং নিজের পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য। তখন যুক্তি হয়ে ওঠে সত্যের অনুসন্ধানী নয়, স্বার্থের আইনজীবী।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি সত্যকে গ্রহণ করার জন্য যুক্তি ব্যবহার করছি, নাকি নিজের পছন্দের সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যুক্তিকে ব্যবহার করছি?

এই একটি প্রশ্নের মধ্যেই মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সততার বড় পরীক্ষা লুকিয়ে আছে।

মানুষ প্রথম ‘আমার’ শব্দটির অর্থ শেখে পরিবারে। আমার বাবা, আমার মা, আমার সন্তান, আমার ভাই, আমার বোন, আমার সংসার—এই সম্পর্কগুলো মানুষকে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও দায়িত্বের অনুভূতি দেয়।

কিন্তু সম্পর্কের মধ্যেও মালিকানাবোধের একটি সূক্ষ্ম বিপদ রয়েছে। আমরা অনেক সময় প্রিয়জনকে ভালোবাসার নামে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে গিয়ে তার স্বপ্নকে অস্বীকার করি। জীবনসঙ্গীর স্বাধীনতাকে নিজের অধিকার মনে করি। পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে পরিবারের সদস্যের ব্যক্তিসত্তাকে উপেক্ষা করি।

অথচ মানুষ কোনো মানুষের সম্পত্তি নয়। সম্পর্কের সৌন্দর্য মালিকানায় নয়, পারস্পরিক মর্যাদা ও দায়িত্ববোধে।

আমার সন্তান মানে আমার ইচ্ছার প্রতিচ্ছবি নয়; সে একটি স্বতন্ত্র মানুষ। আমার জীবনসঙ্গী মানে আমার অধীনস্থ কেউ নয়; সে আমার সহযাত্রী। আমার পরিবার মানে শুধু আমার সুখ-সুবিধার আশ্রয় নয়; এটি অন্যের সুখ-দুঃখের প্রতিও আমার দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র।

যে পরিবারে ‘আমি’ বড় হয়ে ‘আমরা’ হতে শেখে না, সেখানে সম্পর্কের বাহ্যিক কাঠামো টিকে থাকলেও আত্মিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে।

পরিবারের সীমানা পেরিয়ে মানুষ প্রবেশ করে সমাজে। সেখানে তার পরিচয় শুধু ব্যক্তি হিসেবে নয়; প্রতিবেশী, নাগরিক, সহকর্মী, পেশাজীবী ও সামাজিক সত্তা হিসেবে।

কিন্তু সামাজিক জীবনে ‘আমার’ শব্দটির পরিধি যত বাড়ে, দায়িত্ববোধ তত বাড়ে কি?

আমার বাড়ি, আমার জমি, আমার প্রতিষ্ঠান, আমার সংগঠন, আমার পদ, আমার প্রভাব—এসবের সঙ্গে যদি অন্যের অধিকার, সম্মান ও ন্যায্যতার প্রশ্ন যুক্ত না হয়, তাহলে ব্যক্তিগত অর্জন সামাজিক বৈষম্যের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সমাজে বিভাজনের অন্যতম কারণ হলো নিজের স্বার্থকে সর্বজনীন স্বার্থ বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। নিজের গোষ্ঠীর অন্যায়কে সমর্থন করা, প্রতিপক্ষের ন্যায়সংগত দাবিকেও অস্বীকার করা, পরিচিতজনের অপরাধ আড়াল করা কিংবা অপরিচিতের ন্যায্য অধিকার হরণ করা—এসবই সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয়।

আমরা প্রায়ই জানতে চাই, সমাজ আমাকে কী দিয়েছে। কিন্তু খুব কমই প্রশ্ন করি, সমাজের প্রতি আমার দায় কতটুকু?

অথচ সমাজ কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়। সমাজ মানে অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত অস্তিত্ব। অন্যের অধিকারকে অস্বীকার করে নিজের অধিকার নিরাপদ রাখা যায় না। অন্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

ব্যক্তি ও পরিবারের পর ‘আমার’ শব্দটির সবচেয়ে জটিল বিস্তার রাষ্ট্রীয় পরিসরে। আমার দেশ, আমার সংবিধান, আমার সরকার, আমার প্রশাসন, আমার আইন, আমার স্বাধীনতা—এই প্রতিটি উচ্চারণের সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।

কিন্তু রাষ্ট্র কি কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি?

সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে, কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক নয়। রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের অস্তিত্ব দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বৃহত্তর। প্রশাসন নাগরিকের সেবক, নাগরিক প্রশাসনের প্রজা নয়। আইন সবার জন্য সমান হওয়ার কথা, কিন্তু ক্ষমতার প্রভাবে আইন যদি ভিন্ন ভিন্ন মানুষের জন্য ভিন্নভাবে কাজ করে, তাহলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, ক্ষমতাবান ব্যক্তি একসময় নিজের ইচ্ছাকে রাষ্ট্রের ইচ্ছা, নিজের স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থ এবং নিজের সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা বলে বিবেচনা করতে শুরু করেন।

এখানেই ‘আমি’ রাষ্ট্রকে গ্রাস করতে চায়।

অথচ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মধ্যে নয়; বরং আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, নাগরিকের মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহির সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত।

যে রাষ্ট্রে নাগরিক প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সেখানে রাষ্ট্রের চেয়ে ক্ষমতার নিরাপত্তা বড় হয়ে ওঠে। আর যে রাষ্ট্রে ক্ষমতাবান ব্যক্তি প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য থাকেন, সেখানে নাগরিকের অস্তিত্ব অর্থবহ হয়ে ওঠে।

মানুষের জীবনে প্রাপ্তির যেমন শেষ নেই, তেমনি অভাবেরও শেষ নেই। যার অর্থ আছে, তার আরও অর্থের আকাঙ্ক্ষা; যার ক্ষমতা আছে, তার আরও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা; যার পরিচিতি আছে, তার আরও পরিচিতির আকাঙ্ক্ষা।

কিন্তু সব অভাব অর্থনৈতিক নয়। মানুষের সবচেয়ে বড় অভাব কখনো কখনো বিবেকের, কখনো সহমর্মিতার, কখনো আত্মসমালোচনার, আবার কখনো নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহসের।

আমরা অনেক কিছু অর্জন করি, কিন্তু কী হারাচ্ছি, তার হিসাব রাখি না। বাড়ি বড় হয়, কিন্তু হৃদয়ের জায়গা সংকুচিত হয়। পরিচিতি বাড়ে, কিন্তু পরিচয়ের গভীরতা কমে। সম্পদ বাড়ে, কিন্তু তৃপ্তি বাড়ে না। মানুষের ভিড় বাড়ে, কিন্তু নিঃসঙ্গতা কমে না।

কারণ মানুষ যখন নিজের অস্তিত্বকে কেবল অর্জনের পরিমাপে বিচার করে, তখন তার ভেতরের মানুষটি ক্রমশ আড়ালে চলে যায়।

জীবনের শেষ বিচারে মানুষ কী রেখে গেল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—সে কতটুকু মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছিল।

এবার মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক—আমি কে? আমার কে?

আমি কি শুধু আমার নাম, পরিচয়, পেশা, পদবি, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থান? আমি কি আমার বিশ্বাসের সমষ্টি, নাকি আমার বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার সাহসও আমার পরিচয়ের অংশ? আমি কি আমার অর্জন, নাকি আমার ভুল স্বীকার করার ক্ষমতাও আমার অস্তিত্বের পরিচায়ক?

আর আমার বলতে কী বোঝায়?

যে মানুষটি আমার পাশে থাকে, সে কি আমার? যে সম্পদ আমি ভোগ করি, তা কি চিরকাল আমার? যে ক্ষমতা আমি প্রয়োগ করি, তা কি স্থায়ীভাবে আমার? যে সমাজে আমি বসবাস করি, তার দায় কি শুধু অন্যের? যে রাষ্ট্রের নাগরিক আমি, তার ভবিষ্যৎ কি কেবল শাসকের হাতে?

প্রকৃতপক্ষে ‘আমার’ শব্দটি অধিকারের পাশাপাশি দায়িত্বেরও ঘোষণা। যে অধিকার দায়িত্বহীন, তা একসময় আধিপত্যে পরিণত হয়। যে ভালোবাসায় স্বাধীনতা নেই, তা নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়। যে বিশ্বাসে প্রশ্ন নেই, তা অন্ধত্বে পরিণত হয়। যে ক্ষমতায় জবাবদিহি নেই, তা স্বেচ্ছাচারিতায় রূপ নেয়।

মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার অসম্পূর্ণতায়। সে ভুল করে, আবার সংশোধিত হয়। সে দ্বন্দ্বে পড়ে, আবার সমাধান খোঁজে। সে কখনো সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, কখনো নিজের স্বার্থে সত্য থেকে বিচ্যুত হয়। কিন্তু তার সামনে সব সময় একটি সুযোগ থাকে—নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার।

নিজেকে চেনার অর্থ নিজের প্রশংসা করা নয়; নিজের অন্ধকারের মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন করা। নিজের ভুলের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে না দেওয়া। নিজের অধিকারের পাশাপাশি অন্যের অধিকার স্বীকার করা। নিজের বিশ্বাসকে ধারণ করার পাশাপাশি ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের অস্তিত্ব ও মর্যাদা মেনে নেওয়া।

জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায় মানুষ অনেক পরিচয় অর্জন করে, অনেক সম্পর্ক গড়ে, অনেক সম্পদের মালিক হয়, অনেক ক্ষমতার অধিকারী হয়। কিন্তু সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি পরিচয় থাকা প্রয়োজন—মানুষ।

আমি যদি নিজের বাইরে অন্যের অস্তিত্ব স্বীকার না করি, তাহলে আমার আমিত্ব অসম্পূর্ণ। আমি যদি নিজের স্বার্থের বাইরে সামষ্টিক কল্যাণ বুঝতে না শিখি, তাহলে আমার অর্জন অর্থহীন। আমি যদি সত্য জানার পরও মিথ্যার পক্ষে দাঁড়াই, তাহলে আমার জ্ঞান আমাকে মুক্তি দিতে পারবে না। আমি যদি নিজের অন্যায়কে অন্যায়ের স্বীকৃতি দিতে না পারি, তাহলে আমার নৈতিকতার দাবি কেবলই আত্মপ্রবঞ্চনা।

হয়তো জীবনের সবচেয়ে কঠিন দর্শনটি খুব সহজ—নিজেকে জানা, নিজের সীমা বোঝা এবং অন্যের অস্তিত্বকে নিজের মতোই মর্যাদা দেওয়া।

‘আমি’ থাকব, কিন্তু সেই আমি যেন অন্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার না করে। ‘আমার’ থাকবে, কিন্তু সেই আমার যেন অন্যের ন্যায্য অধিকার গ্রাস না করে। আমার বিশ্বাস থাকবে, কিন্তু তা যেন বিবেককে বন্দি না করে। আমার ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু তা যেন ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে উঠে না যায়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু ‘আমি কে?’ নয়; বরং আরও গভীর—

আমি যেমন নিজেকে আমার বলি, তেমনি আমার বলে যাদের দাবি করি, তাদের কাছে আমি আসলে কে?

এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো মানুষের প্রকৃত পরিচয়, সম্পর্কের প্রকৃত অর্থ এবং ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র হয়ে ওঠার নৈতিক ভিত্তি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কোরআনের বিধান বাস্তবায়নে সংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আমির হামজা, টানলেন সোলায়মান (আ.) ও রানি বিলকিসের ঘটনা

আমি! আমার কে!

Update Time : ০৬:৪৩:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

মোঃ আলফাজ উদ্দিন

গণ সাংবাদিক ও নাগরিক লেখক।

মানুষের জীবনে সবচেয়ে উচ্চারিত দুটি শব্দ—‘আমি’ এবং ‘আমার’। শব্দ দুটি ছোট, অথচ এর বিস্তার মহাবিশ্বের মতো বিশাল। জন্মের পর থেকেই মানুষ নিজের অস্তিত্বের পরিচয় খুঁজতে শেখে। একটু বড় হলে আবিষ্কার করে অধিকার, সম্পর্ক, স্বার্থ ও প্রত্যাশা। একসময় ‘আমি’ হয়ে ওঠে ব্যক্তিসত্তার পরিচয়, আর ‘আমার’ হয়ে ওঠে অধিকারবোধের পরিধি। কিন্তু জীবনের গভীরতর প্রশ্নটি থেকে যায়—আমি আসলে কে? আর যাকে আমার বলছি, সে-ই বা কতটুকু আমার?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মানুষকে নিজের আয়নার সামনে দাঁড়াতে হয়। সেখানে শুধু মুখ দেখা যায় না; দেখা যায় তার আচার-অনাচার, সত্য-মিথ্যা, বিবেক-অবিবেক, যুক্তি-অযৌক্তিকতা, ভালোবাসা-বিদ্বেষ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং আত্মপ্রবঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস।

‘আমি’ মানুষের অস্তিত্বের স্বাভাবিক ঘোষণা। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া অপরাধ নয়; বরং আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিকাশের পূর্বশর্ত। কিন্তু এই আমিত্ব যখন আত্মকেন্দ্রিকতায় রূপ নেয়, তখন মানুষ নিজের বাইরে অন্য কোনো অস্তিত্বকে স্বীকার করতে চায় না। নিজের মতকে সত্য, নিজের সিদ্ধান্তকে ন্যায়, নিজের স্বার্থকে প্রয়োজন এবং নিজের অবস্থানকে চূড়ান্ত বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এখানেই আত্মপরিচয়ের সঙ্গে অহমিকার পার্থক্য তৈরি হয়।

আত্মমর্যাদা মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়, অহমিকা অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় ভাবতে শেখায়। আত্মবিশ্বাস মানুষকে সত্যের মুখোমুখি করে, অহমিকা সত্যকে নিজের অনুকূলে সাজাতে শেখায়। ফলে মানুষ একসময় নিজের ভুলের চেয়েও অন্যের প্রতিবাদকে বড় অপরাধ মনে করতে শুরু করে।

অথচ মানুষ যত বড়ই হোক, তার জ্ঞান সীমিত, ক্ষমতা সাময়িক এবং অস্তিত্ব অনিবার্যভাবে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

মানুষের পরিচয় তার উচ্চারিত বক্তব্যে যতটা প্রকাশ পায়, তার চেয়ে বেশি প্রকাশ পায় আচরণে। মুখে নীতি, অন্তরে স্বার্থ; কথায় মানবতা, কাজে নিষ্ঠুরতা; প্রকাশ্যে সততা, গোপনে অনাচার—এসব বৈপরীত্য মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সমাজে এমন মানুষের অভাব নেই, যারা অন্যের অনিয়মের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, অথচ নিজের অনিয়মের ক্ষেত্রে নীরব। অন্যের দুর্নীতিকে অপরাধ বলে, নিজের সুবিধা আদায়কে কৌশল বলে। অন্যের মিথ্যাকে প্রতারণা বলে, নিজের মিথ্যাকে পরিস্থিতির প্রয়োজনে বলা কথা বলে চালিয়ে দেয়।

এখানেই নৈতিকতার সবচেয়ে বড় সংকট। কারণ অনাচার কেবল অপরাধ সংঘটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যায়কে ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও একধরনের নৈতিক বিচ্যুতি।

মানুষ যখন নিজের বিবেকের আদালত বন্ধ করে দেয়, তখন বাইরের কোনো আদালতই তাকে পুরোপুরি ন্যায়পরায়ণ করতে পারে না।

সত্যের একটি নিজস্ব অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু মানুষ প্রায়ই সত্যকে দেখে নিজের অবস্থান, বিশ্বাস, স্বার্থ ও অভিজ্ঞতার জানালা দিয়ে। ফলে একই ঘটনা কারও কাছে ন্যায়বিচার, কারও কাছে অবিচার; কারও কাছে প্রতিবাদ, কারও কাছে বিশৃঙ্খলা; কারও কাছে আত্মরক্ষা, কারও কাছে আগ্রাসন।

এখানে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্বাভাবিক। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যকে সত্যের বিকৃতি ঘটানোর অজুহাত বানানো বিপজ্জনক।

মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর মিথ্যাটি অনেক সময় অন্যকে বলা মিথ্যা নয়; বরং নিজেকে বলা মিথ্যা। নিজের স্বার্থপরতাকে দায়িত্ব, প্রতিহিংসাকে ন্যায়বিচার, ক্ষমতার অপব্যবহারকে শৃঙ্খলা এবং পরাজয়কে ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের কাছেই নিজের সত্য গোপন করে।

এভাবে একসময় মিথ্যা আর সত্যের পার্থক্য হারিয়ে যায় না; বরং মানুষ পার্থক্যটি জেনেও মিথ্যার পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

দর্শন মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা তৈরি করে। প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করতে শেখায়, অস্তিত্ব ও বাস্তবতার গভীরে প্রবেশ করতে শেখায়। কিন্তু দর্শন যখন চিন্তার পরিবর্তে গোষ্ঠীগত আনুগত্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তার মুক্তিকামী চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মানুষের চিন্তাজগতে দ্বন্দ্ব থাকবে। বিশ্বাসের সঙ্গে সংশয়, আবেগের সঙ্গে বিবেচনা, ব্যক্তিস্বার্থের সঙ্গে সামষ্টিক স্বার্থ এবং স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। এই দ্বন্দ্ব থেকেই নতুন চিন্তা, নতুন উপলব্ধি এবং সভ্যতার অগ্রযাত্রা।

কিন্তু দ্বন্দ্ব যখন সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে ব্যক্তি আক্রমণ, মত দমন কিংবা প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতায় পর্যবসিত হয়, তখন তা আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থাকে না।

যুক্তি মানুষের চিন্তাকে শাণিত করে, কিন্তু যুক্তির নামে অযৌক্তিকতাকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। অনেক সময় মানুষ যুক্তি খোঁজে সত্য জানার জন্য নয়, বরং নিজের পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য। তখন যুক্তি হয়ে ওঠে সত্যের অনুসন্ধানী নয়, স্বার্থের আইনজীবী।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি সত্যকে গ্রহণ করার জন্য যুক্তি ব্যবহার করছি, নাকি নিজের পছন্দের সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যুক্তিকে ব্যবহার করছি?

এই একটি প্রশ্নের মধ্যেই মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সততার বড় পরীক্ষা লুকিয়ে আছে।

মানুষ প্রথম ‘আমার’ শব্দটির অর্থ শেখে পরিবারে। আমার বাবা, আমার মা, আমার সন্তান, আমার ভাই, আমার বোন, আমার সংসার—এই সম্পর্কগুলো মানুষকে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও দায়িত্বের অনুভূতি দেয়।

কিন্তু সম্পর্কের মধ্যেও মালিকানাবোধের একটি সূক্ষ্ম বিপদ রয়েছে। আমরা অনেক সময় প্রিয়জনকে ভালোবাসার নামে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে গিয়ে তার স্বপ্নকে অস্বীকার করি। জীবনসঙ্গীর স্বাধীনতাকে নিজের অধিকার মনে করি। পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে পরিবারের সদস্যের ব্যক্তিসত্তাকে উপেক্ষা করি।

অথচ মানুষ কোনো মানুষের সম্পত্তি নয়। সম্পর্কের সৌন্দর্য মালিকানায় নয়, পারস্পরিক মর্যাদা ও দায়িত্ববোধে।

আমার সন্তান মানে আমার ইচ্ছার প্রতিচ্ছবি নয়; সে একটি স্বতন্ত্র মানুষ। আমার জীবনসঙ্গী মানে আমার অধীনস্থ কেউ নয়; সে আমার সহযাত্রী। আমার পরিবার মানে শুধু আমার সুখ-সুবিধার আশ্রয় নয়; এটি অন্যের সুখ-দুঃখের প্রতিও আমার দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র।

যে পরিবারে ‘আমি’ বড় হয়ে ‘আমরা’ হতে শেখে না, সেখানে সম্পর্কের বাহ্যিক কাঠামো টিকে থাকলেও আত্মিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে।

পরিবারের সীমানা পেরিয়ে মানুষ প্রবেশ করে সমাজে। সেখানে তার পরিচয় শুধু ব্যক্তি হিসেবে নয়; প্রতিবেশী, নাগরিক, সহকর্মী, পেশাজীবী ও সামাজিক সত্তা হিসেবে।

কিন্তু সামাজিক জীবনে ‘আমার’ শব্দটির পরিধি যত বাড়ে, দায়িত্ববোধ তত বাড়ে কি?

আমার বাড়ি, আমার জমি, আমার প্রতিষ্ঠান, আমার সংগঠন, আমার পদ, আমার প্রভাব—এসবের সঙ্গে যদি অন্যের অধিকার, সম্মান ও ন্যায্যতার প্রশ্ন যুক্ত না হয়, তাহলে ব্যক্তিগত অর্জন সামাজিক বৈষম্যের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সমাজে বিভাজনের অন্যতম কারণ হলো নিজের স্বার্থকে সর্বজনীন স্বার্থ বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। নিজের গোষ্ঠীর অন্যায়কে সমর্থন করা, প্রতিপক্ষের ন্যায়সংগত দাবিকেও অস্বীকার করা, পরিচিতজনের অপরাধ আড়াল করা কিংবা অপরিচিতের ন্যায্য অধিকার হরণ করা—এসবই সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয়।

আমরা প্রায়ই জানতে চাই, সমাজ আমাকে কী দিয়েছে। কিন্তু খুব কমই প্রশ্ন করি, সমাজের প্রতি আমার দায় কতটুকু?

অথচ সমাজ কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়। সমাজ মানে অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত অস্তিত্ব। অন্যের অধিকারকে অস্বীকার করে নিজের অধিকার নিরাপদ রাখা যায় না। অন্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

ব্যক্তি ও পরিবারের পর ‘আমার’ শব্দটির সবচেয়ে জটিল বিস্তার রাষ্ট্রীয় পরিসরে। আমার দেশ, আমার সংবিধান, আমার সরকার, আমার প্রশাসন, আমার আইন, আমার স্বাধীনতা—এই প্রতিটি উচ্চারণের সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।

কিন্তু রাষ্ট্র কি কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি?

সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে, কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক নয়। রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের অস্তিত্ব দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বৃহত্তর। প্রশাসন নাগরিকের সেবক, নাগরিক প্রশাসনের প্রজা নয়। আইন সবার জন্য সমান হওয়ার কথা, কিন্তু ক্ষমতার প্রভাবে আইন যদি ভিন্ন ভিন্ন মানুষের জন্য ভিন্নভাবে কাজ করে, তাহলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, ক্ষমতাবান ব্যক্তি একসময় নিজের ইচ্ছাকে রাষ্ট্রের ইচ্ছা, নিজের স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থ এবং নিজের সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা বলে বিবেচনা করতে শুরু করেন।

এখানেই ‘আমি’ রাষ্ট্রকে গ্রাস করতে চায়।

অথচ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মধ্যে নয়; বরং আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, নাগরিকের মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহির সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত।

যে রাষ্ট্রে নাগরিক প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সেখানে রাষ্ট্রের চেয়ে ক্ষমতার নিরাপত্তা বড় হয়ে ওঠে। আর যে রাষ্ট্রে ক্ষমতাবান ব্যক্তি প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য থাকেন, সেখানে নাগরিকের অস্তিত্ব অর্থবহ হয়ে ওঠে।

মানুষের জীবনে প্রাপ্তির যেমন শেষ নেই, তেমনি অভাবেরও শেষ নেই। যার অর্থ আছে, তার আরও অর্থের আকাঙ্ক্ষা; যার ক্ষমতা আছে, তার আরও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা; যার পরিচিতি আছে, তার আরও পরিচিতির আকাঙ্ক্ষা।

কিন্তু সব অভাব অর্থনৈতিক নয়। মানুষের সবচেয়ে বড় অভাব কখনো কখনো বিবেকের, কখনো সহমর্মিতার, কখনো আত্মসমালোচনার, আবার কখনো নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহসের।

আমরা অনেক কিছু অর্জন করি, কিন্তু কী হারাচ্ছি, তার হিসাব রাখি না। বাড়ি বড় হয়, কিন্তু হৃদয়ের জায়গা সংকুচিত হয়। পরিচিতি বাড়ে, কিন্তু পরিচয়ের গভীরতা কমে। সম্পদ বাড়ে, কিন্তু তৃপ্তি বাড়ে না। মানুষের ভিড় বাড়ে, কিন্তু নিঃসঙ্গতা কমে না।

কারণ মানুষ যখন নিজের অস্তিত্বকে কেবল অর্জনের পরিমাপে বিচার করে, তখন তার ভেতরের মানুষটি ক্রমশ আড়ালে চলে যায়।

জীবনের শেষ বিচারে মানুষ কী রেখে গেল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—সে কতটুকু মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছিল।

এবার মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক—আমি কে? আমার কে?

আমি কি শুধু আমার নাম, পরিচয়, পেশা, পদবি, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থান? আমি কি আমার বিশ্বাসের সমষ্টি, নাকি আমার বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার সাহসও আমার পরিচয়ের অংশ? আমি কি আমার অর্জন, নাকি আমার ভুল স্বীকার করার ক্ষমতাও আমার অস্তিত্বের পরিচায়ক?

আর আমার বলতে কী বোঝায়?

যে মানুষটি আমার পাশে থাকে, সে কি আমার? যে সম্পদ আমি ভোগ করি, তা কি চিরকাল আমার? যে ক্ষমতা আমি প্রয়োগ করি, তা কি স্থায়ীভাবে আমার? যে সমাজে আমি বসবাস করি, তার দায় কি শুধু অন্যের? যে রাষ্ট্রের নাগরিক আমি, তার ভবিষ্যৎ কি কেবল শাসকের হাতে?

প্রকৃতপক্ষে ‘আমার’ শব্দটি অধিকারের পাশাপাশি দায়িত্বেরও ঘোষণা। যে অধিকার দায়িত্বহীন, তা একসময় আধিপত্যে পরিণত হয়। যে ভালোবাসায় স্বাধীনতা নেই, তা নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়। যে বিশ্বাসে প্রশ্ন নেই, তা অন্ধত্বে পরিণত হয়। যে ক্ষমতায় জবাবদিহি নেই, তা স্বেচ্ছাচারিতায় রূপ নেয়।

মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার অসম্পূর্ণতায়। সে ভুল করে, আবার সংশোধিত হয়। সে দ্বন্দ্বে পড়ে, আবার সমাধান খোঁজে। সে কখনো সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, কখনো নিজের স্বার্থে সত্য থেকে বিচ্যুত হয়। কিন্তু তার সামনে সব সময় একটি সুযোগ থাকে—নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার।

নিজেকে চেনার অর্থ নিজের প্রশংসা করা নয়; নিজের অন্ধকারের মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন করা। নিজের ভুলের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে না দেওয়া। নিজের অধিকারের পাশাপাশি অন্যের অধিকার স্বীকার করা। নিজের বিশ্বাসকে ধারণ করার পাশাপাশি ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের অস্তিত্ব ও মর্যাদা মেনে নেওয়া।

জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায় মানুষ অনেক পরিচয় অর্জন করে, অনেক সম্পর্ক গড়ে, অনেক সম্পদের মালিক হয়, অনেক ক্ষমতার অধিকারী হয়। কিন্তু সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি পরিচয় থাকা প্রয়োজন—মানুষ।

আমি যদি নিজের বাইরে অন্যের অস্তিত্ব স্বীকার না করি, তাহলে আমার আমিত্ব অসম্পূর্ণ। আমি যদি নিজের স্বার্থের বাইরে সামষ্টিক কল্যাণ বুঝতে না শিখি, তাহলে আমার অর্জন অর্থহীন। আমি যদি সত্য জানার পরও মিথ্যার পক্ষে দাঁড়াই, তাহলে আমার জ্ঞান আমাকে মুক্তি দিতে পারবে না। আমি যদি নিজের অন্যায়কে অন্যায়ের স্বীকৃতি দিতে না পারি, তাহলে আমার নৈতিকতার দাবি কেবলই আত্মপ্রবঞ্চনা।

হয়তো জীবনের সবচেয়ে কঠিন দর্শনটি খুব সহজ—নিজেকে জানা, নিজের সীমা বোঝা এবং অন্যের অস্তিত্বকে নিজের মতোই মর্যাদা দেওয়া।

‘আমি’ থাকব, কিন্তু সেই আমি যেন অন্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার না করে। ‘আমার’ থাকবে, কিন্তু সেই আমার যেন অন্যের ন্যায্য অধিকার গ্রাস না করে। আমার বিশ্বাস থাকবে, কিন্তু তা যেন বিবেককে বন্দি না করে। আমার ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু তা যেন ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে উঠে না যায়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু ‘আমি কে?’ নয়; বরং আরও গভীর—

আমি যেমন নিজেকে আমার বলি, তেমনি আমার বলে যাদের দাবি করি, তাদের কাছে আমি আসলে কে?

এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো মানুষের প্রকৃত পরিচয়, সম্পর্কের প্রকৃত অর্থ এবং ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র হয়ে ওঠার নৈতিক ভিত্তি।