প্রান্তিক ডেক্স
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে সাত বছর পর ভারত সফরে এসে শনিবার রাতে আয়োজিত গালা নৈশভোজে অংশ নেননি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দিনের কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া, ব্রিকস সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়া এবং মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরও নৈশভোজ এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে নতুন করে কূটনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করেছে।
শি জিনপিংয়ের এই অনুপস্থিতিকে নিছক ব্যক্তিগত ব্যস্ততা বা বিশ্রামের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার পাশাপাশি কূটনৈতিক অসন্তোষের একটি হিসাবি সংকেত হিসেবেও বিশ্লেষণ করছেন পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ। কারণ, শি শুধু নৈশভোজেই অনুপস্থিত ছিলেন না; তিনি এমন একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন এড়িয়ে গেছেন, যেখানে ব্রিকসের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে দিনের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন ও মোদি-শি বৈঠকে তাঁর উপস্থিতি ছিল পূর্ণাঙ্গ।
কূটনীতিতে রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি অনেক সময়ই নিছক আনুষ্ঠানিকতার বিষয় থাকে না। বিশেষ করে শীর্ষ সম্মেলনের মতো আয়োজনে কোন অনুষ্ঠানে কোনো নেতা থাকছেন এবং কোনটিতে থাকছেন না—সেটিও রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে। সেই বিবেচনায় মোদির দেওয়া নৈশভোজে শির অনুপস্থিতি ভারতের প্রতি সূক্ষ্ম অসন্তোষ বা দূরত্ব প্রদর্শনের একটি কৌশল হতে পারে—এমন ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে।
এর পেছনে ভারত-চীন সম্পর্কের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালের লাদাখ সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র অবিশ্বাসের মধ্যে ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে উত্তেজনা কমানো, যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সীমান্ত, বাণিজ্য ভারসাম্য, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতার মতো প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি।
শনিবারের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও দুই নেতা সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। শি জিনপিং ভারত-চীন সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার কথা বলেন এবং দুই দেশকে অংশীদার হিসেবে কাজ করার ওপর জোর দেন। মোদিও সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার মৌলিক শর্ত হিসেবে তুলে ধরেন।
এই ইতিবাচক বৈঠকের পরই নৈশভোজে শির অনুপস্থিতি তাই আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে দুই নেতা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা দিচ্ছেন, অন্যদিকে চীনা প্রেসিডেন্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে অংশ নিচ্ছেন না—এই দুই ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, সম্পর্কের বরফ গললেও পারস্পরিক আস্থার সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
তবে শির অনুপস্থিতির কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ এখনো ভারত বা চীন প্রকাশ করেনি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দিনের দীর্ঘ কর্মসূচির পর তিনি হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নিতে পারেন। ফলে এটিকে সরাসরি ‘কূটনৈতিক প্রতিবাদ’ হিসেবে ঘোষণা করার মতো সরকারি প্রমাণ এখনো নেই।
কিন্তু কূটনৈতিক আচরণের ভাষায় ঘটনাটিকে একেবারে গুরুত্বহীন বলেও উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ, শি জিনপিংয়ের ভারত সফর নিজেই ছিল অত্যন্ত প্রতীকী—২০১৯ সালের পর এটি তাঁর প্রথম ভারত সফর। দুই দেশের সম্পর্ক যখন সতর্ক পুনর্মিলনের পর্যায়ে, তখন এমন একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনে তাঁর অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ব্যাখ্যার জন্ম দিচ্ছে।
আরেক অনুপস্থিত নেতা আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তিনি সম্মেলনের কার্যক্রম শেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফিরে যান বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিকে শির সিদ্ধান্তের সঙ্গে একই রাজনৈতিক অর্থে দেখার সুযোগ কম।
নৈশভোজে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ ব্রিকসের অন্যান্য শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও এতে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অমিত শাহ, নির্মলা সীতারামন, পীযূষ গোয়েল, অশ্বিনী বৈষ্ণব, শিবরাজ সিং চৌহান, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
ফলে মোদির গালা নৈশভোজে শি জিনপিংয়ের অনুপস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে একটি ছোট আনুষ্ঠানিক ঘটনা হলেও এর কূটনৈতিক তাৎপর্য বড়। এটি হয়তো প্রকাশ্য প্রতিবাদ নয়, কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে চীনের সতর্কতা, অসন্তোষ কিংবা দর-কষাকষির অবস্থান জানান দেওয়ার একটি নীরব কূটনৈতিক সংকেত হতে পারে।
বিশেষ করে একই দিনে মোদি-শি বৈঠকে বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্বের কথা বলার পর নৈশভোজ এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে দুই দেশের সম্পর্কের দ্বৈত বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেই দেখা যায়—মুখে সহযোগিতার বার্তা, কিন্তু আচরণে এখনো সতর্ক দূরত্ব।
সুতরাং শি জিনপিংয়ের নৈশভোজ বর্জনকে সরাসরি ‘কূটনৈতিক প্রতিবাদ’ বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। তবে ঘটনাটি যে ভারতের প্রতি চীনের অসন্তোষ, সতর্কতা অথবা কৌশলগত দূরত্বের সম্ভাব্য ইঙ্গিত বহন করছে, তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সীমান্ত, বাণিজ্য ও কৌশলগত আলোচনায় কী ধরনের অগ্রগতি হয়—সেটিই শেষ পর্যন্ত এই নীরব বার্তার প্রকৃত অর্থ স্পষ্ট করবে।
প্রান্তিক ডেক্স 



















