মোঃ রওশন আলী , বিশেষ প্রতিনিধি-দৈনিক প্রান্তিক।
জয়নতলী দারুন নাজাত কওমি হাফিজিয়া মাদ্রাসার মাহফিলে ধর্মীয় বিধান, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামী মূল্যবোধ নিয়ে বক্তব্য
পবিত্র কোরআনের বিধান বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত—এ প্রশ্ন তুলে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও দায়িত্ব নিয়ে সমালোচনা করেছেন ইসলামী বক্তা ও সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা। বক্তব্যে তিনি বলেছেন, কোরআনের বিধান নিয়ে শুধু ধর্মীয় মাহফিলে আলোচনা করলেই হবে না; রাষ্ট্র পরিচালনা ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে হজরত সোলায়মান (আ.) ও সাবার রানি বিলকিসের ঘটনা উল্লেখ করে বর্তমান সময়ের সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও ভূমিকার বিষয়টিও সামনে আনেন তিনি।
জয়নতলী দারুন নাজাত কওমি হাফিজিয়া মাদ্রাসার উদ্যোগে আয়োজিত এক ইসলামী মাহফিলে এসব কথা বলেন মুফতি আমির হামজা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট সমাজসেবক মো. আলম মুসল্লী। এতে স্থানীয় মুসল্লি, আলেম-ওলামা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
কোরআনের বিধান ও সংসদের দায়িত্ব
মাহফিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে মুফতি আমির হামজা পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে পারিবারিক সম্পর্ক, ধর্মীয় বিধান ও সমসাময়িক সমাজব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় তিনি সূরা আন-নিসার ২৩ নম্বর আয়াতের শেষাংশের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। ইসলামে পারিবারিক সম্পর্ক, বিবাহ ও সামাজিক জীবন পরিচালনায় নির্ধারিত বিধান রয়েছে উল্লেখ করে এসব বিষয়ে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বক্তব্যের একপর্যায়ে দেশের আইন প্রণয়নব্যবস্থা ও জাতীয় সংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আমির হামজা। তাঁর বক্তব্যে কোরআনের বিধান নিয়ে সংসদে আলোচনা এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইসলামী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে।
তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর দৃষ্টিতে কোরআনের বিধান বাস্তবায়নের প্রশ্নে সংসদে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ধর্মীয় বিধান ও ইসলামী মূল্যবোধকে কেবল ব্যক্তিগত ধর্মাচরণ কিংবা ধর্মীয় সমাবেশের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা ও আইন প্রণয়নের আলোচনাতেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সূরা আলে ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতের প্রসঙ্গ
বক্তব্যে সূরা আলে ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মুফতি আমির হামজা। এ আয়াতে সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখা এবং আল্লাহর প্রতি ঈমানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি মুসলমানদের নৈতিক দায়িত্ব, অন্যায়ের বিরোধিতা এবং সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচনা করেন। তাঁর মতে, ইসলামী আদর্শের অনুসরণ শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়; সামাজিক জীবনেও এর প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও এ সময় আলোচনা করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামী ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান
মাহফিলে আমির হামজার বক্তব্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং দলটির রাজনৈতিক অবস্থান। এ সময় তিনি দলটির কার্যক্রমের পক্ষে নিজের মতামত তুলে ধরেন এবং সমালোচকদের বক্তব্যের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন।
কোরআনের বিধান বাস্তবায়ন ও ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও সমালোচনার প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন তিনি।
বক্তব্যে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নাম উল্লেখ করে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন। সংসদে কোরআনের বিধান বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব কী হওয়া উচিত, সে প্রশ্নও সামনে আনেন তিনি।
এ সময় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়নের বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন আমির হামজা।
সমসাময়িক সমাজ ও জাহেলি যুগের প্রসঙ্গ
বর্তমান সমাজের নৈতিকতা ও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। এ সময় সমসাময়িক সমাজের বিভিন্ন প্রবণতার সঙ্গে জাহেলি যুগের বৈশিষ্ট্যের তুলনা টানেন।
বিভিন্ন ব্যক্তি ও রাজনৈতিক অবস্থানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন, মানুষের কাছে কোনো বিষয় গ্রহণযোগ্য কিংবা অগ্রহণযোগ্য হওয়ার পেছনে তার নিজস্ব বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব থাকে।
এ প্রসঙ্গে লেখিকা তসলিমা নাসরিনের নামও উল্লেখ করেন তিনি। ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং প্রচলিত সামাজিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য তুলে ধরে ইসলামী আদর্শের বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন মুফতি আমির হামজা।
সোলায়মান (আ.) ও রানি বিলকিসের ঘটনা টেনে সংসদের প্রসঙ্গ
মাহফিলের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নামলে বর্ণিত হজরত সোলায়মান (আ.) ও সাবার রানি বিলকিসের ঘটনা।
কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, হুদহুদ পাখির মাধ্যমে সোলায়মান (আ.) সাবা অঞ্চলের সংবাদ জানতে পারেন। পরে তিনি রানি বিলকিসের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিটি পাওয়ার পর রানি বিলকিস তাঁর সভাসদদের ডেকে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করেন এবং তাঁদের মতামত জানতে চান।
এই ঘটনাটি উল্লেখ করে মুফতি আমির হামজা বর্তমান সময়ের সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও ভূমিকার প্রসঙ্গ সামনে আনেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনো বার্তা, প্রস্তাব কিংবা বিষয়কে উপেক্ষা না করে তা নিয়ে আলোচনা ও পরামর্শের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
সোলায়মান (আ.) ও রানি বিলকিসের ঘটনার সঙ্গে সমসাময়িক সংসদীয় ব্যবস্থা ও আইন প্রণয়নের প্রসঙ্গ যুক্ত করে তাঁর বক্তব্যে নেতৃত্বের দায়িত্ব, পরামর্শের গুরুত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় নির্দেশনার প্রতিফলনের বিষয়টি উঠে আসে।
ধর্মীয় বিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক দায়িত্ব
মুফতি আমির হামজার বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে কোরআনের বিধান বাস্তবায়ন, ইসলামী মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বের প্রশ্ন। তাঁর আলোচনায় ধর্মীয় নির্দেশনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে সম্পর্ক, সংসদে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে সমালোচনা প্রাধান্য পায়।
জয়নতলী দারুন নাজাত কওমি হাফিজিয়া মাদ্রাসার এ মাহফিলে ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংসদের ভূমিকা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামী মূল্যবোধের প্রয়োগ নিয়ে বক্তব্য দেন তিনি।
মোঃ রওশন আলী , বিশেষ প্রতিনিধি-দৈনিক প্রান্তিক। 




















