১১ দলের প্রেস ব্রিফিংয়ে সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র মেরামতের দাবি; ৩১ অক্টোবর ঢাকা–খুলনা–কুষ্টিয়া লংমার্চ, সরকারকে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
নিজস্ব প্রতিবেদক |-দৈনিক প্রান্তিক। ২৭ অক্টোবর ২০২৬
‘আমরা মাঠে তামাশা করতে বা খেলতে নামিনি। সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র মেরামতের দাবি নিয়ে হাজার হাজার শহীদের রক্তের দায় মাথায় নিয়ে মাঠে নেমেছি। তাই কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তে পা দেব না, ইনশাআল্লাহ।’
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর জোট নয়, এটি জনগণের ঐক্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও গতিপথ নির্ধারণ, আধিপত্যবাদ মোকাবিলা এবং ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করার সংগ্রামে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। আগামী দিনে এই ঐক্যের পরিসর আরও বিস্তৃত হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এতে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতা ও বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকের অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল আগামী ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চের প্রস্তুতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন।
গোপালগঞ্জে অপতৎপরতা হলে রাজপথে মোকাবিলার ঘোষণা
সম্প্রতি গোপালগঞ্জে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লংমার্চের বহর ওই জেলার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, তাঁরা এ ধরনের আশঙ্কা করছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকলে কর্মসূচি স্বাভাবিকভাবেই পালন করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, গোপালগঞ্জে তাঁদের দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও ইসলামপন্থি ও দেশপ্রেমিক বিপুলসংখ্যক মানুষ রয়েছেন। কোনো দুরভিসন্ধিমূলক অপতৎপরতা কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটানোর চেষ্টা হলে তা রাজপথেই মোকাবিলা করা হবে।
গোপালগঞ্জ প্রশাসনকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এর দায় সরকার ও প্রশাসনকেই বহন করতে হবে।
গণভোটের রায় কার্যকরসহ একাধিক দাবিতে লংমার্চ
মামুনুল হক জানান, গণভোটের রায় কার্যকর, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং নাগরিক জীবনের বিভিন্ন সংকট সমাধানের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছে। এর আগে চট্টগ্রাম ও রংপুরে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত তৃতীয় লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারের সংকট নিরসন, প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অবসান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবিও কর্মসূচিতে তুলে ধরা হবে।
এ ছাড়া শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড, জুলাই গণহত্যা ও শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হবে।
মামুনুল হক বলেন, আগের দুটি লংমার্চের মতো এবারও ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি সফল হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আয়োজিত এই লংমার্চে সব দেশপ্রেমিক নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
তিনি জানান, ৩১ অক্টোবর সকাল ৭টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চ শুরু হবে। পরে বিভিন্ন পথ অতিক্রম করে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে কর্মসূচি শেষ হবে।
সরকারকে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
চলমান জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, সংসদ ও রাজপথে তাঁরা সরকারকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে সহনশীল কর্মসূচি পালন করে আসছেন। কিন্তু সরকারের আচরণে বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না বলে তাঁদের মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জনগণের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। সরকারকে জনগণের প্রত্যাশা ও মনোভাব অনুধাবন করে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন মামুনুল হক। নির্বাচন কমিশনের সচিব পর্যায়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকারের এ ধরনের ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, এর ব্যত্যয় ঘটলে তাঁরা নীরব থাকবেন না। ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন।
আইজিপির বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারের মতো বিষয় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল পদ থেকে বক্তব্য আসা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ধরনের বক্তব্যে তাঁরা স্তম্ভিত ও শঙ্কিত।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী নিয়েও সমালোচনা
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় সফর এবং সফরসঙ্গীদের তালিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মামুনুল হক। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সফরে এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাঁদের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব বা প্রটোকল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সফরকে বিনোদন ও ঘোরাঘুরির আয়োজনে পরিণত করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদের অধিবেশন নিয়ে বিরোধী দলের সংশয়
জাতীয় সংসদের আসন্ন চতুর্থ অধিবেশন প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমাধানের ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে তাঁদের সংশয় রয়েছে।
তিনি জানান, সংসদ অধিবেশনের আগে বিরোধী দলের নেতারা আবারও বৈঠকে বসবেন। সেখানে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ
ভারতের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘যাঁরা এ ধরনের অভিযোগ করছেন, তাঁরা বোধহয় সঙ্গে ছিলেন; তাই তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন।’
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক |-দৈনিক প্রান্তিক। ২৭ অক্টোবর ২০২৬ 






















