Dhaka ০৪:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তুরাগ নদে সাবেক বিমান কর্মকর্তা তাহসিফের মরদেহ: নিখোঁজের নেপথ্যে কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৯ অক্টোবর ২০২৬

তুরাগ নদীর রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন পানিতে ভেসে উঠেছিল এক যুবকের নিথর দেহ। পরনে সাদা পায়জামা ও কালো জামা, হাতে ঘড়ি, পকেটে একটি আইফোন। প্রথমে পরিচয়হীন মরদেহ হিসেবে উদ্ধার হলেও পকেটে থাকা মুঠোফোনের সূত্র ধরে বেরিয়ে আসে তাঁর পরিচয়। তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উত্তরখান থানাধীন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

নৌ পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর আশঙ্কার কথা বলা হলেও এটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশ ও নৌ পুলিশের সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফ সৌরি রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। তাঁর বাবার নাম কে এম এনায়েত হেলাল। তিনি গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) নিখোঁজ হন। পরদিন বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মরদেহ উদ্ধারের সময় তাঁর বয়স আনুমানিক ২৮ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো জামা। হাতে থাকা ঘড়ি এবং পকেটে পাওয়া আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

তবে তিনি কখন, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তুরাগ নদে পৌঁছেছিলেন, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর চলাফেরা, সর্বশেষ অবস্থান, কারও সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়েও পরস্পর যাচাইযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

উত্তরখান থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে থানায় অভিযোগ আসার তথ্য তাদের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে ছিল না। বিষয়টি নৌ পুলিশ আইনানুগভাবে দেখছে।

তাহসিফ সৌরির নাম নতুন করে আলোচনায় আসার অন্যতম কারণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

সেদিন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। তাঁর দেশত্যাগের মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে সামরিক উড়োজাহাজে করে দেশ ছাড়ার দৃশ্য দেখা যায়।

ওই ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের সঙ্গে তাহসিফ সৌরির নাম জড়িয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁকে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ভিডিওটির মূল ধারণকারী এবং প্রথম প্রকাশকারী ব্যক্তি একই কি না, সে বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। কোথাও তাঁকে ভিডিও ধারণকারী বলা হয়েছে, কোথাও ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ওই ভিডিও প্রকাশের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়েও এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তাহসিফ সৌরি বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ছিলেন। তাঁর চাকরি থেকে বিদায়ের বিষয়টি নিয়েও অতীতে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

২০২৫ সালের আগস্টে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বিমানবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার অবসর ও চাকরি থেকে বিদায় নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছিল।

আইএসপিআরের বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরি ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফীকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে পৃথক প্রেক্ষাপটে অবসর দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের অবসরের সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে সংস্থাটি জানিয়েছিল।

তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।

প্রথমত, ২৭ অক্টোবর তিনি ঠিক কখন এবং কোথা থেকে নিখোঁজ হন? তাঁর বাসা থেকে বের হওয়ার সময়, সর্বশেষ অবস্থান এবং যাতায়াতের তথ্য কী?

দ্বিতীয়ত, উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টর থেকে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ পর্যন্ত তিনি কীভাবে পৌঁছালেন? তাঁর সঙ্গে কেউ ছিলেন কি না, অথবা তিনি একাই সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনের কললিস্ট, বার্তা, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল উপাত্ত থেকে নিখোঁজ হওয়ার আগের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কী জানা যায়?

চতুর্থত, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, পানিতে পড়ার আগে কিংবা পরে কোনো আঘাত লেগেছিল কি না এবং মৃত্যুর সময় সম্পর্কে ফরেনসিক পরীক্ষায় কী তথ্য পাওয়া যায়?

পঞ্চমত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আলোচিত ভিডিওর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে অতীতে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, সেটি তাঁর পরবর্তী জীবনে কোনো ধরনের চাপ, হুমকি কিংবা বিরোধের কারণ হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান ছাড়া মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মৃত্যুর আনুমানিক সময়, শরীরে কোনো আঘাত রয়েছে কি না, আঘাতের ধরন, পানিতে ডোবার আগে বা পরে আঘাতের অস্তিত্ব এবং অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে তাঁর ব্যবহৃত আইফোনের ডিজিটাল তথ্য, সর্বশেষ যোগাযোগ, অবস্থানসংক্রান্ত উপাত্ত এবং নিখোঁজ হওয়ার আগের কার্যক্রম তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠার আগে ডিজিটাল আলামতের সত্যতা, সময় এবং প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা জরুরি।

তাহসিফের পরিবারের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছিল কি না, তিনি কারও কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিলেন কি না কিংবা কোনো বিরোধের মধ্যে ছিলেন কি না, তা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা প্রয়োজন।

তুরাগ নদ থেকে সাবেক এই বিমান কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা আপাতত অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে প্রশ্ন আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা, নিখোঁজ হওয়ার পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সমন্বিত তদন্তই নির্ধারণ করতে পারবে—তাহসিফ সৌরির মৃত্যু কীভাবে ঘটেছিল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কোরআনের বিধান বাস্তবায়নে সংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আমির হামজা, টানলেন সোলায়মান (আ.) ও রানি বিলকিসের ঘটনা

তুরাগ নদে সাবেক বিমান কর্মকর্তা তাহসিফের মরদেহ: নিখোঁজের নেপথ্যে কী?

Update Time : ০৪:৫৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৯ অক্টোবর ২০২৬

তুরাগ নদীর রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন পানিতে ভেসে উঠেছিল এক যুবকের নিথর দেহ। পরনে সাদা পায়জামা ও কালো জামা, হাতে ঘড়ি, পকেটে একটি আইফোন। প্রথমে পরিচয়হীন মরদেহ হিসেবে উদ্ধার হলেও পকেটে থাকা মুঠোফোনের সূত্র ধরে বেরিয়ে আসে তাঁর পরিচয়। তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উত্তরখান থানাধীন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

নৌ পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর আশঙ্কার কথা বলা হলেও এটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশ ও নৌ পুলিশের সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফ সৌরি রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। তাঁর বাবার নাম কে এম এনায়েত হেলাল। তিনি গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) নিখোঁজ হন। পরদিন বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মরদেহ উদ্ধারের সময় তাঁর বয়স আনুমানিক ২৮ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো জামা। হাতে থাকা ঘড়ি এবং পকেটে পাওয়া আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

তবে তিনি কখন, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তুরাগ নদে পৌঁছেছিলেন, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর চলাফেরা, সর্বশেষ অবস্থান, কারও সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়েও পরস্পর যাচাইযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

উত্তরখান থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে থানায় অভিযোগ আসার তথ্য তাদের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে ছিল না। বিষয়টি নৌ পুলিশ আইনানুগভাবে দেখছে।

তাহসিফ সৌরির নাম নতুন করে আলোচনায় আসার অন্যতম কারণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

সেদিন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। তাঁর দেশত্যাগের মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে সামরিক উড়োজাহাজে করে দেশ ছাড়ার দৃশ্য দেখা যায়।

ওই ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের সঙ্গে তাহসিফ সৌরির নাম জড়িয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁকে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ভিডিওটির মূল ধারণকারী এবং প্রথম প্রকাশকারী ব্যক্তি একই কি না, সে বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। কোথাও তাঁকে ভিডিও ধারণকারী বলা হয়েছে, কোথাও ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ওই ভিডিও প্রকাশের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়েও এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তাহসিফ সৌরি বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ছিলেন। তাঁর চাকরি থেকে বিদায়ের বিষয়টি নিয়েও অতীতে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

২০২৫ সালের আগস্টে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বিমানবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার অবসর ও চাকরি থেকে বিদায় নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছিল।

আইএসপিআরের বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরি ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফীকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে পৃথক প্রেক্ষাপটে অবসর দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের অবসরের সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে সংস্থাটি জানিয়েছিল।

তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।

প্রথমত, ২৭ অক্টোবর তিনি ঠিক কখন এবং কোথা থেকে নিখোঁজ হন? তাঁর বাসা থেকে বের হওয়ার সময়, সর্বশেষ অবস্থান এবং যাতায়াতের তথ্য কী?

দ্বিতীয়ত, উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টর থেকে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ পর্যন্ত তিনি কীভাবে পৌঁছালেন? তাঁর সঙ্গে কেউ ছিলেন কি না, অথবা তিনি একাই সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনের কললিস্ট, বার্তা, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল উপাত্ত থেকে নিখোঁজ হওয়ার আগের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কী জানা যায়?

চতুর্থত, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, পানিতে পড়ার আগে কিংবা পরে কোনো আঘাত লেগেছিল কি না এবং মৃত্যুর সময় সম্পর্কে ফরেনসিক পরীক্ষায় কী তথ্য পাওয়া যায়?

পঞ্চমত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আলোচিত ভিডিওর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে অতীতে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, সেটি তাঁর পরবর্তী জীবনে কোনো ধরনের চাপ, হুমকি কিংবা বিরোধের কারণ হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান ছাড়া মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মৃত্যুর আনুমানিক সময়, শরীরে কোনো আঘাত রয়েছে কি না, আঘাতের ধরন, পানিতে ডোবার আগে বা পরে আঘাতের অস্তিত্ব এবং অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে তাঁর ব্যবহৃত আইফোনের ডিজিটাল তথ্য, সর্বশেষ যোগাযোগ, অবস্থানসংক্রান্ত উপাত্ত এবং নিখোঁজ হওয়ার আগের কার্যক্রম তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠার আগে ডিজিটাল আলামতের সত্যতা, সময় এবং প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা জরুরি।

তাহসিফের পরিবারের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছিল কি না, তিনি কারও কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিলেন কি না কিংবা কোনো বিরোধের মধ্যে ছিলেন কি না, তা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা প্রয়োজন।

তুরাগ নদ থেকে সাবেক এই বিমান কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা আপাতত অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে প্রশ্ন আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা, নিখোঁজ হওয়ার পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সমন্বিত তদন্তই নির্ধারণ করতে পারবে—তাহসিফ সৌরির মৃত্যু কীভাবে ঘটেছিল।