আচরণবিধি লঙ্ঘন, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ; ১৮৫ কেন্দ্রের ১১৫টিই অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, নিরাপত্তায় বিশেষ প্রস্তুতি
নিজস্ব প্রতিবেদক- দৈনিক প্রান্তিক | ২৮ অক্টোবর ২০২৬
রাত পোহালেই ভোট। বহুল আলোচিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে শেষ মুহূর্তে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনি লড়াইয়ে মূল আলোচনায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। দুই দলের প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে চলছে শেষ মুহূর্তের হিসাব-নিকাশ, স্নায়ুযুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকায় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে ভোটের আগের দিনই প্রশ্নের মুখে পড়েছে নির্বাচনি পরিবেশ।
ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা ১১-দলীয় জোটের সমর্থনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আবদুল আলীম নিজামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. খাদেমুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিবেচনায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় গত ২১ আগস্ট থেকে ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য হয়। এরপর নির্বাচন কমিশন উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। বিএনপির জন্য আসনটি রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও সাংগঠনিক অবস্থান ধরে রাখার লড়াই। অন্যদিকে জামায়াতের কাছে এটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটিতে নিজেদের নির্বাচনি সক্ষমতা প্রমাণের বড় সুযোগ। ফলে উপনির্বাচনটি কেবল একটি সংসদীয় আসনের জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, দুই দলের স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও জনসমর্থন যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
ভোটের আগের দিন মঙ্গলবার রাতে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলামের কাছে পৃথকভাবে অভিযোগ জানান জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন এবং বিএনপির প্রতিনিধিরা। জামায়াত প্রার্থীর অভিযোগ, নির্বাচনি প্রচারণা শেষ হওয়ার পর স্থানীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিওর কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে তাঁদের ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে প্রভাবিত করা হয়েছে। সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের তালিকায় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।
এ ছাড়া আখানগরের বলিতাপাড়ায় জামায়াতের নির্বাচনি উঠান বৈঠকে বিএনপি সমর্থকদের হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ করেন দেলাওয়ার হোসেন। তাঁর দাবি, এ ঘটনায় তাঁদের কয়েকজন কর্মী আহত হলেও প্রতিকার না পেয়ে উল্টো তাঁদের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
অন্যদিকে জামায়াতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বিএনপির প্রতিনিধি ও পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মো. আতাউর রহমান পাল্টা অভিযোগ করেন, সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের তালিকায় জামায়াতঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অন্যায়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিপক্ষ নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট করতে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে বিএনপির প্রার্থী প্রতিপক্ষের উসকানিতে উত্তেজিত না হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান আতাউর রহমান।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, উভয় পক্ষের অভিযোগই তাঁরা পেয়েছেন। অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে নির্বাচনি নিরাপত্তার চিত্রেও রয়েছে বাড়তি সতর্কতার ইঙ্গিত। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের মোট ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১৫টিকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাকি ৭০টি কেন্দ্রও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-১৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনজুর করিম জানিয়েছেন, নির্বাচনি নিরাপত্তায় ছয়টি মোবাইল টহল দল ও দুটি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ দল দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি ডগ স্কোয়াড, বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট, ড্রোন এবং বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
গত ২৫ অক্টোবর থেকে নির্বাচনি এলাকায় এসআরবি-১৩ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটগ্রহণের দিন এবং পরবর্তী দুই দিন, অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করবেন। সার্বিক নিরাপত্তা কার্যক্রম সমন্বয়ে অপারেশনস কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৭৫, নারী ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৯ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। আসনটিতে রয়েছে ২২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা। বুধবার সকাল থেকেই জেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে ভোটগ্রহণের সরঞ্জাম বিতরণ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বুঝে নিয়েছেন।
নির্বাচনি প্রচারণা শেষ হয়েছে মঙ্গলবার সকাল ৮টায়। শেষ দিনের প্রচারণায় বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ, পথসভা ও জনসভায় অংশ নেন। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের সমর্থন চেয়েছেন তাঁরা।
এখন অপেক্ষা ভোটের। ১৮৫টি কেন্দ্রের নিরাপত্তা, দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং ভোটারদের নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করাই নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ নাকি দাঁড়িপাল্লা—কোন প্রতীকে রায় দেবেন ভোটাররা, তা জানা যাবে আগামীকাল ভোট গণনার পর।
নিজস্ব প্রতিবেদক- দৈনিক প্রান্তিক | ২৮ অক্টোবর ২০২৬ 





















