মোঃ আলফাজ উদ্দিন | দৈনিক প্রান্তিক-গাজীপুর | ৪ অক্টোবর ২০২৬
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফেরার পথে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’ (৩০) গাজীপুরের বাইমাইল থেকে পালাননি। প্রাথমিক তদন্তে তিনি ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকে পুলিশের হেফাজত থেকে পালিয়েছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় প্রিজন ভ্যানে দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনার পরপরই পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার আদালত থেকে ৩০ আসামিকে নিয়ে কাশিমপুর কারাগারে ফেরার পথে প্রিজন ভ্যানটি রাত সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় পৌঁছালে পিচ্চি রাজা শৌচকর্মের কথা বলেন। দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) প্রবীর কুমার তাঁকে গাড়ি থেকে নামালে সুযোগ নিয়ে তিনি দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে অন্য ২৯ আসামিকে কারাগারে নেওয়া হয়।
তবে ঘটনার পর গঠিত পর্যবেক্ষণ কমিটির তদন্তে প্রাথমিক সেই বর্ণনায় অসংগতি পাওয়া যায়। সাময়িক বরখাস্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা পিচ্চি রাজা কোথা থেকে পালিয়েছেন, সে বিষয়ে একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দেন। তদন্তে বাইমাইল থেকে পালানোর তথ্যও সঠিক নয় বলে উঠে আসে। পরে প্রাথমিকভাবে ঢাকার তাঁতীবাজারকে পিচ্চি রাজার পালানোর স্থান হিসেবে নিশ্চিত করে ডিবি।
ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে প্রিজন ভ্যানে থাকা এসআই প্রবীর কুমার, কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন, মো. সাকিব, শাকিল হোসেন এবং প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পাশাপাশি ঘটনা তদন্তে একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হয়।
পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসআই প্রবীর কুমার ও প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনকে পিচ্চি রাজার পালানোর ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি তিন পুলিশ সদস্যকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধান গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (সিটি এসবি) মোহাম্মদ মহিউল ইসলাম জানান, সাময়িক বরখাস্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তাঁদের কাছ থেকে এখনো ঘটনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি। পালানোর স্থান নিয়েও তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। ঘটনার প্রকৃত স্থান এবং কীভাবে পিচ্চি রাজা পুলিশের হেফাজত থেকে পালিয়ে গেলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষণ কমিটির সদস্য কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইফতেখার হোসেন জানান, প্রিজন ভ্যান কারাগার থেকে আদালত এবং আদালত থেকে কারাগারে যাওয়ার পথে সাধারণত কোথাও থামার সুযোগ নেই। জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে নিকটবর্তী থানায় গাড়ি থামানোর নিয়ম রয়েছে। কিন্তু দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা যে স্থানে গাড়ি থামানোর কথা বলেছেন, সেখানে থামানোর সুযোগ থাকার কথা নয়।
তিনি আরও জানান, পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রতিবেদন দাখিলের পর বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
এদিকে পিচ্চি রাজার পালানোর ঘটনা তদন্ত করছে গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সাহেব আলী পাঠান জানান, পুলিশ সদস্যরা একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিলেও প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, পিচ্চি রাজা ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকে পালিয়েছেন। ঘটনার সঙ্গে দুই পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার পর তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত এখনো চলছে।
পিচ্চি রাজা কে
চলতি বছরের ১৯ মে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত রাজা ওরফে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে ২৫ থেকে ২৯টি মামলার তথ্য রয়েছে।
তদন্তে এখন যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ
পিচ্চি রাজা ঠিক কীভাবে পুলিশের হেফাজত থেকে বেরিয়ে গেলেন, প্রিজন ভ্যান কেন থামানো হয়েছিল, প্রথমে কেন বাইমাইল বা নাওজোড়ের কথা বলা হয়েছিল এবং তাঁতীবাজারে পালানোর তথ্য কীভাবে নিশ্চিত হলো—এসব প্রশ্ন এখন তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে।
বিশেষ করে পাঁচ পুলিশ সদস্যের বক্তব্যে অসংগতি এবং প্রিজন ভ্যান থামানোর নিয়মের সঙ্গে তাঁদের দেওয়া তথ্যের অসামঞ্জস্য ঘটনাটিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন | দৈনিক প্রান্তিক-গাজীপুর | 



















