Dhaka ০৪:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজীপুর সদর উপজেলায় নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের শেষ ঠিকানা “আলহাজ্ব আবু তাহের মুসুল্লী”

গাজীপুর সদর—শহরের কোলঘেঁষে বেড়ে ওঠা এক জনপদ। এখানে শিল্পের ধোঁয়া আছে, কৃষকের ঘামের গন্ধ আছে; আছে শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আছে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, আছে প্রান্তিক মানুষের টিকে থাকার নিরন্তর লড়াই। সময়ের সঙ্গে বদলেছে রাস্তা, বদলেছে বসতি, বদলেছে মানুষের জীবনযাপনের ধরন; কিন্তু বদলায়নি মানুষের একটি চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা—কেউ একজন তাদের কথা শুনুক।

কেউ একজন বিপদের সময় পাশে দাঁড়াক। কেউ একজন ক্ষমতার দরজায় দাঁড়িয়ে বলুক—‘তোমার কথাটাও গুরুত্বপূর্ণ।’

গাজীপুর সদর উপজেলার রাজনীতিতে আলহাজ্ব আবু তাহের মুসুল্লীর দীর্ঘ পথচলাকে সেই মানুষের কাছে যাওয়ার রাজনীতির একটি ধারাবাহিক অধ্যায় হিসেবেই দেখা যায়।

রাজনীতির মঞ্চে তাঁর পরিচয় আছে, সাংগঠনিক পদ আছে, জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অতীত আছে। কিন্তু তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভাষ্যে এসব পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষ।

মানুষের অধিকার। মানুষের মর্যাদা। আর বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়।

আবু তাহের মুসুল্লীর রাজনৈতিক পথচলা কোনো এক দিনের তৈরি হয় নি। তৃণমূলের সংগঠন থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসে তিনি ইউনিয়ন যুবদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, উপজেলা পর্যায়ে যুবদলের দায়িত্ব পালন করেছেন, পরে উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় তিনি গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। পরবর্তীতে আবারও উপজেলা বিএনপির নেতৃত্বের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসেছে। ২০২১ সালে দীর্ঘ বিরতির পর গাজীপুর সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হলে তিনি আহ্বায়ক হন; ২০২৫ সালেও নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে একই দায়িত্বে রাখা হয় তাঁকে।

পদ বদলেছে, সময় বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতারও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু তাঁর রাজনীতির একটি জায়গা অপরিবর্তিত থেকেছে—তৃণমূল।

কারণ তৃণমূলের রাজনীতি মানে শুধু মিছিলের সারি নয়। তৃণমূল মানে মানুষের ঘরের দরজায় যাওয়া। কৃষকের জমির আইল ধরে হাঁটা। শ্রমিকের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকানো।বেকার তরুণের অস্থিরতা বোঝা।অসহায় পরিবারের কান্না শোনা। আর রাজনীতিকে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

আবু তাহের মুসুল্লীর রাজনৈতিক বক্তব্যে একটি বাক্য বারবার ফিরে আসে—‘আমি নয়, জনতা।’

এই একটি বাক্যের মধ্যেই তাঁর রাজনীতির কাঠামোটি যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

তিনি মনে করেন, জনপ্রতিনিধিত্ব কোনো ব্যক্তিগত অর্জনের নাম নয়; এটি মানুষের অর্পিত দায়িত্ব। ক্ষমতার চেয়ার মানুষের ওপর বসার জন্য নয়, মানুষের কাছে জবাবদিহি করার জন্য।

তাঁর ভাষায়—

এই বক্তব্যে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের দুটি স্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একদিকে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফার প্রতি তাঁর রাজনৈতিক আস্থা; অন্যদিকে তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফাকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি রূপরেখা হিসেবে দেখা।

অর্থাৎ তাঁর কাছে রাজনীতি শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়—রাষ্ট্রের চরিত্র বদলেরও একটি প্রশ্ন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। কৃষক, শ্রমিক, উৎপাদন, আত্মনির্ভরতা, গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের মতো বিষয় সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে।

সময়ের স্রোতে রাষ্ট্র ও সমাজ বদলেছে। বদলেছে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, মানুষের প্রয়োজন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জও।

সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় তারেক রহমানের ৩১ দফাকে আবু তাহের মুসুল্লী দেখছেন রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের একটি রাজনৈতিক রূপরেখা হিসেবে।

তাঁর কাছে ১৯ দফা অতীতের একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার; ৩১ দফা সেই ধারাকে নতুন সময়ের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টা।

এই জায়গাতেই তাঁর রাজনীতির একটি মৌলিক বক্তব্য সামনে আসে—

রাষ্ট্র মানুষের জন্য।

রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য।

আর রাষ্ট্রযন্ত্র যদি মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যায়, তবে রাজনীতির দায়িত্ব সেই দূরত্ব কমিয়ে আনা।

নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রাজনীতি

গাজীপুর সদর উপজেলার বিস্তৃত জনপদে মানুষের সমস্যা এক রকম নয়।

কোথাও জমি ও জলাবদ্ধতার সমস্যা, কোথাও যোগাযোগের সংকট। কোথাও কর্মসংস্থানের অভাব, কোথাও শিক্ষার সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ। কোথাও শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, কোথাও নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা।

এই বিচিত্র বাস্তবতার মধ্যেই ‘বঞ্চিত মানুষ’ কথাটি একটি বিস্তৃত অর্থ পায়।

আবু তাহের মুসুল্লীর রাজনৈতিক বক্তব্যে সেই বঞ্চিত মানুষ দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কথায় উঠে আসে সাধারণ মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন।

তাঁর রাজনীতির ভাষায় তাই বিরোধিতার পাশাপাশিও রয়েছে সেবার কথা।

সংগ্রামের পাশাপাশি রয়েছে মানুষের পাশে থাকার কথা। ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি রয়েছে দায়িত্বের কথা।

রাজনীতির মাঠে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক হঠাৎ তৈরি হয় না। সময় লাগে। দরকার হয় মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়ার।

আবু তাহের মুসুল্লীর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে সেই জনসম্পৃক্ততার চিত্রই বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

কখনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব, কখনো সাংগঠনিক সভা, কখনো সামাজিক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ গাজীপুর সদরকে ঘিরে।

রাজনীতিকে তিনি কেবল দলীয় কার্যালয়ের চার দেয়ালে আটকে রাখতে চান না; বরং স্থানীয় সমাজের বিভিন্ন পরিসরের সঙ্গে তার একটি সংযোগ রাখতে চান।

জনপ্রতিনিধিত্বের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে। প্রত্যাশার সঙ্গে থাকে হিসাবও।

আবু তাহের মুসুল্লী নিজেও তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে পূর্বের দায়িত্বকাল ও অসমাপ্ত কাজের প্রসঙ্গ তুলেছেন। সুযোগ পেলে মানুষের সেবা এবং অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার প্রত্যয়ের কথা বলেছেন।

এই কথাটির ভেতরে রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা লুকিয়ে আছে।

মানুষ শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। মানুষ জানতে চায়—আগে কী হয়েছে?  হয়নি?

কেন হয়নি? আর এবার কীভাবে হবে?

কারণ মানুষের স্মৃতি দীর্ঘ। একটি রাস্তা তৈরি হওয়ার দিনটি মানুষ মনে রাখে; আবার বছরের পর বছর ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে যাওয়ার কষ্টও ভুলে যায় না।

একটি বিদ্যালয়ের নতুন ভবন যেমন ভবিষ্যতের স্বপ্ন তৈরি করে, তেমনি একটি বন্ধ দরজাও মানুষের মনে হতাশা তৈরি করে।

রাজনীতির প্রকৃত পরীক্ষা তাই প্রতিশ্রুতির মঞ্চে নয়—বাস্তব জীবনের মাটিতে।

আবু তাহের মুসুল্লীর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নেয়, তা হলো—অধিকার।

এই অধিকার কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার নয়। নিজের কথা বলার অধিকার। ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার। শিক্ষা পাওয়ার অধিকার। চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার। কর্মসংস্থানের অধিকার। নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার। এবং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার অধিকার।

তিনি যে কল্যাণ রাষ্ট্রের কথা বলেন, সেখানে রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপ হওয়ার কথা মানুষের জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে—কতটা মানুষ স্বস্তি পেল, কতটা পরিবার নিরাপদ হলো, কতটা তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেল, কতটা কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পেল, কতটা শ্রমিক সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারল—সেই হিসাবেই।

রাজনীতিতে ‘শেষ ঠিকানা’ কথাটি সহজ নয়।

কারও কাছে রাজনীতির শেষ ঠিকানা সংসদ।

কারও কাছে মন্ত্রণালয়।

কারও কাছে ক্ষমতার কেন্দ্র।

কিন্তু আবু তাহের মুসুল্লীর বক্তব্যে রাজনীতির শেষ ঠিকানাটি যেন অন্য কোথাও—

মানুষের কাছে।

যে মানুষটি ভোটের সময় নাগরিক, কিন্তু সারা বছর রাষ্ট্রের সেবাপ্রার্থী; যে শ্রমিক প্রতিদিন শহরের অর্থনীতি সচল রাখে, কিন্তু নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চিত; যে কৃষক মাটিতে বীজ বোনে, অথচ ফসলের ন্যায্য মূল্য নিয়ে শঙ্কিত; যে তরুণ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পায় না—রাজনীতির ভাষায় সেই মানুষই তাঁর ‘জনতা’।

তাই তাঁর রাজনীতির দাবিও বড়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কোরআনের বিধান বাস্তবায়নে সংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আমির হামজা, টানলেন সোলায়মান (আ.) ও রানি বিলকিসের ঘটনা

গাজীপুর সদর উপজেলায় নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের শেষ ঠিকানা “আলহাজ্ব আবু তাহের মুসুল্লী”

Update Time : ০৪:৪৫:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

গাজীপুর সদর—শহরের কোলঘেঁষে বেড়ে ওঠা এক জনপদ। এখানে শিল্পের ধোঁয়া আছে, কৃষকের ঘামের গন্ধ আছে; আছে শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আছে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, আছে প্রান্তিক মানুষের টিকে থাকার নিরন্তর লড়াই। সময়ের সঙ্গে বদলেছে রাস্তা, বদলেছে বসতি, বদলেছে মানুষের জীবনযাপনের ধরন; কিন্তু বদলায়নি মানুষের একটি চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা—কেউ একজন তাদের কথা শুনুক।

কেউ একজন বিপদের সময় পাশে দাঁড়াক। কেউ একজন ক্ষমতার দরজায় দাঁড়িয়ে বলুক—‘তোমার কথাটাও গুরুত্বপূর্ণ।’

গাজীপুর সদর উপজেলার রাজনীতিতে আলহাজ্ব আবু তাহের মুসুল্লীর দীর্ঘ পথচলাকে সেই মানুষের কাছে যাওয়ার রাজনীতির একটি ধারাবাহিক অধ্যায় হিসেবেই দেখা যায়।

রাজনীতির মঞ্চে তাঁর পরিচয় আছে, সাংগঠনিক পদ আছে, জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অতীত আছে। কিন্তু তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভাষ্যে এসব পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষ।

মানুষের অধিকার। মানুষের মর্যাদা। আর বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়।

আবু তাহের মুসুল্লীর রাজনৈতিক পথচলা কোনো এক দিনের তৈরি হয় নি। তৃণমূলের সংগঠন থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসে তিনি ইউনিয়ন যুবদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, উপজেলা পর্যায়ে যুবদলের দায়িত্ব পালন করেছেন, পরে উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় তিনি গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। পরবর্তীতে আবারও উপজেলা বিএনপির নেতৃত্বের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসেছে। ২০২১ সালে দীর্ঘ বিরতির পর গাজীপুর সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হলে তিনি আহ্বায়ক হন; ২০২৫ সালেও নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে একই দায়িত্বে রাখা হয় তাঁকে।

পদ বদলেছে, সময় বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতারও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু তাঁর রাজনীতির একটি জায়গা অপরিবর্তিত থেকেছে—তৃণমূল।

কারণ তৃণমূলের রাজনীতি মানে শুধু মিছিলের সারি নয়। তৃণমূল মানে মানুষের ঘরের দরজায় যাওয়া। কৃষকের জমির আইল ধরে হাঁটা। শ্রমিকের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকানো।বেকার তরুণের অস্থিরতা বোঝা।অসহায় পরিবারের কান্না শোনা। আর রাজনীতিকে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

আবু তাহের মুসুল্লীর রাজনৈতিক বক্তব্যে একটি বাক্য বারবার ফিরে আসে—‘আমি নয়, জনতা।’

এই একটি বাক্যের মধ্যেই তাঁর রাজনীতির কাঠামোটি যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

তিনি মনে করেন, জনপ্রতিনিধিত্ব কোনো ব্যক্তিগত অর্জনের নাম নয়; এটি মানুষের অর্পিত দায়িত্ব। ক্ষমতার চেয়ার মানুষের ওপর বসার জন্য নয়, মানুষের কাছে জবাবদিহি করার জন্য।

তাঁর ভাষায়—

এই বক্তব্যে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের দুটি স্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একদিকে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফার প্রতি তাঁর রাজনৈতিক আস্থা; অন্যদিকে তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফাকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি রূপরেখা হিসেবে দেখা।

অর্থাৎ তাঁর কাছে রাজনীতি শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়—রাষ্ট্রের চরিত্র বদলেরও একটি প্রশ্ন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। কৃষক, শ্রমিক, উৎপাদন, আত্মনির্ভরতা, গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের মতো বিষয় সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে।

সময়ের স্রোতে রাষ্ট্র ও সমাজ বদলেছে। বদলেছে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, মানুষের প্রয়োজন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জও।

সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় তারেক রহমানের ৩১ দফাকে আবু তাহের মুসুল্লী দেখছেন রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের একটি রাজনৈতিক রূপরেখা হিসেবে।

তাঁর কাছে ১৯ দফা অতীতের একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার; ৩১ দফা সেই ধারাকে নতুন সময়ের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টা।

এই জায়গাতেই তাঁর রাজনীতির একটি মৌলিক বক্তব্য সামনে আসে—

রাষ্ট্র মানুষের জন্য।

রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য।

আর রাষ্ট্রযন্ত্র যদি মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যায়, তবে রাজনীতির দায়িত্ব সেই দূরত্ব কমিয়ে আনা।

নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রাজনীতি

গাজীপুর সদর উপজেলার বিস্তৃত জনপদে মানুষের সমস্যা এক রকম নয়।

কোথাও জমি ও জলাবদ্ধতার সমস্যা, কোথাও যোগাযোগের সংকট। কোথাও কর্মসংস্থানের অভাব, কোথাও শিক্ষার সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ। কোথাও শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, কোথাও নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা।

এই বিচিত্র বাস্তবতার মধ্যেই ‘বঞ্চিত মানুষ’ কথাটি একটি বিস্তৃত অর্থ পায়।

আবু তাহের মুসুল্লীর রাজনৈতিক বক্তব্যে সেই বঞ্চিত মানুষ দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কথায় উঠে আসে সাধারণ মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন।

তাঁর রাজনীতির ভাষায় তাই বিরোধিতার পাশাপাশিও রয়েছে সেবার কথা।

সংগ্রামের পাশাপাশি রয়েছে মানুষের পাশে থাকার কথা। ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি রয়েছে দায়িত্বের কথা।

রাজনীতির মাঠে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক হঠাৎ তৈরি হয় না। সময় লাগে। দরকার হয় মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়ার।

আবু তাহের মুসুল্লীর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে সেই জনসম্পৃক্ততার চিত্রই বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

কখনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব, কখনো সাংগঠনিক সভা, কখনো সামাজিক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ গাজীপুর সদরকে ঘিরে।

রাজনীতিকে তিনি কেবল দলীয় কার্যালয়ের চার দেয়ালে আটকে রাখতে চান না; বরং স্থানীয় সমাজের বিভিন্ন পরিসরের সঙ্গে তার একটি সংযোগ রাখতে চান।

জনপ্রতিনিধিত্বের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে। প্রত্যাশার সঙ্গে থাকে হিসাবও।

আবু তাহের মুসুল্লী নিজেও তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে পূর্বের দায়িত্বকাল ও অসমাপ্ত কাজের প্রসঙ্গ তুলেছেন। সুযোগ পেলে মানুষের সেবা এবং অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার প্রত্যয়ের কথা বলেছেন।

এই কথাটির ভেতরে রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা লুকিয়ে আছে।

মানুষ শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। মানুষ জানতে চায়—আগে কী হয়েছে?  হয়নি?

কেন হয়নি? আর এবার কীভাবে হবে?

কারণ মানুষের স্মৃতি দীর্ঘ। একটি রাস্তা তৈরি হওয়ার দিনটি মানুষ মনে রাখে; আবার বছরের পর বছর ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে যাওয়ার কষ্টও ভুলে যায় না।

একটি বিদ্যালয়ের নতুন ভবন যেমন ভবিষ্যতের স্বপ্ন তৈরি করে, তেমনি একটি বন্ধ দরজাও মানুষের মনে হতাশা তৈরি করে।

রাজনীতির প্রকৃত পরীক্ষা তাই প্রতিশ্রুতির মঞ্চে নয়—বাস্তব জীবনের মাটিতে।

আবু তাহের মুসুল্লীর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নেয়, তা হলো—অধিকার।

এই অধিকার কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার নয়। নিজের কথা বলার অধিকার। ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার। শিক্ষা পাওয়ার অধিকার। চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার। কর্মসংস্থানের অধিকার। নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার। এবং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার অধিকার।

তিনি যে কল্যাণ রাষ্ট্রের কথা বলেন, সেখানে রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপ হওয়ার কথা মানুষের জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে—কতটা মানুষ স্বস্তি পেল, কতটা পরিবার নিরাপদ হলো, কতটা তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেল, কতটা কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পেল, কতটা শ্রমিক সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারল—সেই হিসাবেই।

রাজনীতিতে ‘শেষ ঠিকানা’ কথাটি সহজ নয়।

কারও কাছে রাজনীতির শেষ ঠিকানা সংসদ।

কারও কাছে মন্ত্রণালয়।

কারও কাছে ক্ষমতার কেন্দ্র।

কিন্তু আবু তাহের মুসুল্লীর বক্তব্যে রাজনীতির শেষ ঠিকানাটি যেন অন্য কোথাও—

মানুষের কাছে।

যে মানুষটি ভোটের সময় নাগরিক, কিন্তু সারা বছর রাষ্ট্রের সেবাপ্রার্থী; যে শ্রমিক প্রতিদিন শহরের অর্থনীতি সচল রাখে, কিন্তু নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চিত; যে কৃষক মাটিতে বীজ বোনে, অথচ ফসলের ন্যায্য মূল্য নিয়ে শঙ্কিত; যে তরুণ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পায় না—রাজনীতির ভাষায় সেই মানুষই তাঁর ‘জনতা’।

তাই তাঁর রাজনীতির দাবিও বড়।