মোঃ রওশন আলী – বিশেষ প্রতিনিধি–দৈনিক প্রান্তিক ।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়নে সচেতনতামূলক র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়নের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে স্থানীয় নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
র্যালিটি তালতলী বাজার-সংলগ্ন সড়ক থেকে শুরু হয়ে মির্জাপুর ইউনিয়ন সড়ক ও তারেক জিয়ার সড়কের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন এবং মাইকের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়, সতর্কতা ও পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। প্রচারের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজেদের বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার আহ্বান জানানো হয়।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ডা. মো. আলী আকবর, ১ নম্বর ওয়ার্ডের সহসভাপতি মো. আলম মুসল্লি এবং একই ওয়ার্ডের সভাপতি মো. হাবিবুর রহমানসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
ডা. মো. আলী আকবর তার বক্তব্যে বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি রোগের ঝুঁকি কমাতে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া জরুরি। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পানির পাত্র ও আশপাশের যেসব স্থানে পানি জমতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরীক্ষা ও পরিষ্কার রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন—এমন বার্তার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে, যাতে প্রত্যেকে নিজের পরিবার ও প্রতিবেশীদের নিরাপদ রাখতে ভূমিকা রাখতে পারেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মো. আলম মুসল্লির বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু একজন ব্যক্তির কাজ নয়; এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি বাড়ির আশপাশ, রাস্তার পাশ এবং পানি জমার সম্ভাবনা রয়েছে এমন স্থানগুলো পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারেও সবাইকে সচেতন হতে হবে।
তিনি আরও বলেন—প্রতিটি পরিবার সচেতন হলে এবং প্রতিবেশীরা একে অপরকে সহযোগিতা করলে মশার বংশবিস্তার রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা ছড়িয়ে দিতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।
১ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মো. হাবিবুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, এলাকার পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করার ক্ষেত্রে সামাজিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো বাড়ি বা আশপাশে পানি জমে থাকলে তা অপসারণ করতে হবে এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে—এমন স্থানগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন—এলাকাকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য রাখতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি এলাকার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
র্যালিতে মাইকের মাধ্যমে প্রচারিত সচেতনতামূলক বার্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরা হয়:
১. কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না: বাড়ির ছাদ, বারান্দা, আঙিনা ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। বৃষ্টির পর বিশেষভাবে এসব স্থান পরীক্ষা করতে হবে।
২. ফুলের টব ও পানির পাত্র পরিষ্কার রাখতে হবে: ফুলের টবের নিচের ট্রে, বালতি, ড্রাম, পরিত্যক্ত বোতল ও অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানি ফেলে দিতে হবে। পানির পাত্র ঢেকে রাখতে হবে এবং নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
৩. পরিত্যক্ত জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলতে হবে: পুরোনো টায়ার, ভাঙা পাত্র, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের কাপ ও অন্যান্য বর্জ্যে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। এসব জিনিস যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে।
৪. বাড়ির আশপাশ ও নালা-নর্দমা পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে: পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এমন ময়লা ও আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। কোথাও পানি জমে থাকলে তার কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. দিনের বেলাতেও মশার কামড় থেকে সতর্ক থাকতে হবে: এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি কামড়ায়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার, শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা এবং ঘরের দরজা-জানালায় উপযুক্ত নেট ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
৬. ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে: জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা বা ডেঙ্গুর সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
৭. বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে: তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ঝিমুনি দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
৮. পরিবার ও প্রতিবেশীদের সচেতন করতে হবে: ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও এলাকার অন্য বাসিন্দাদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে হবে।
জনসচেতনতায় সম্মিলিত উদ্যোগের প্রত্যাশা
র্যালিতে বহন করা ব্যানারে ‘ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে সচেতন হোন, নিরাপদ থাকুন, সুস্থ থাকুন’ এবং ‘পরিষ্কার রাখুন পরিবেশ’—এমন বার্তা তুলে ধরা হয়। মাইকের মাধ্যমে প্রচারিত সচেতনতামূলক কথাবার্তার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা এবং প্রতিরোধমূলক কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সচেতনতামূলক প্রচার নয়, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং জমে থাকা পানির উৎস ধ্বংস করাও জরুরি। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে এডিস মশার বংশবিস্তার কমানো এবং ডেঙ্গুর ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।
ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়নে আয়োজিত এ সচেতনতামূলক র্যালির মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ধরনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা যায়।
রওশন আলী - বিশেষ প্রতিনিধি- দৈনিক প্রান্তিক । 




















