Dhaka ১১:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতের গণতন্ত্র: সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অধিকারের সংকট

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের পরিচিতি দীর্ঘদিনের। বিপুল জনসংখ্যা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নিয়মিত নির্বাচন, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি দেশটিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিচয় কেবল তার নির্বাচনী আয়োজনের ব্যাপকতা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। গণতন্ত্রের প্রকৃত ভিত্তি নিহিত থাকে নাগরিকের সমান অধিকার, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতার মধ্যে।

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এই মৌলিক সত্যকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোটের মধ্যে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা আপাতদৃষ্টিতে একটি নির্বাচনী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিতর্ক। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। এখানে প্রশ্ন উঠেছে নাগরিকের ভোটাধিকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে।

ভারতের রাজনৈতিক সংকটকে তাই কেবল বিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার এবং তার বাস্তব রাজনৈতিক চর্চার মধ্যকার দূরত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ভারত যে রাষ্ট্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বহুধর্মীয়, বহুভাষিক, বহুজাতিক ও বিপুল বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি জনগোষ্ঠীকে অভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে ঐক্যবদ্ধ রাখা। দেশভাগের সাম্প্রদায়িক ক্ষত, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, জাতপাতের বিভাজন এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের মধ্যেও ভারত সংসদীয় গণতন্ত্র ও সর্বজনীন ভোটাধিকারের পথ বেছে নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত ছিল তৎকালীন বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন প্রথম দিকের সরকারগুলো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তা, সংসদীয় বিতর্ক, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার যে ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করেছিল, তা পরবর্তী ভারতীয় রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য তৈরি করে। তবে সেই ঐতিহ্য কখনোই ত্রুটিমুক্ত ছিল না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংঘাত এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও সামাজিক অসন্তোষ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুরু থেকেই  ব্যাপক পরিসরে উপস্থিত ছিল।

১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের জরুরি অবস্থা ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক গভীর সতর্কসংকেত। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকার জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত করে, সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের আটক করে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছিল, নির্বাচিত সরকারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বিপন্ন করতে পারে।

জরুরি অবস্থার অবসানের পর ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয় এবং বিরোধী শক্তির ক্ষমতায় আরোহণ ভারতীয় জনগণের গণতান্ত্রিক প্রতিরোধক্ষমতার একটি ঐতিহাসিক প্রকাশ ছিল। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে ভারতীয় রাজনীতি যে শিক্ষা গ্রহণ করার কথা ছিল, তা হলো—গণতন্ত্রের নিরাপত্তা কোনো একক রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না; বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও পারস্পরিক ভারসাম্যের ওপর তা নির্ভরশীল।

পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থান, জাতপাতভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির বিস্তার এবং ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির প্রসার ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন রূপ দিয়েছে। বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শনের বিস্তার ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে একটি নতুন আদর্শিক সংঘাত তৈরি করেছে।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির ক্ষমতায় আরোহণ এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে নতুন গতি দেয়। ২০১৯ সালে দলটি আরও শক্তিশালী জনসমর্থন অর্জন করে। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের শরিকদের সমর্থনে সরকার গঠন করে। এই ফলাফল দেখিয়েছে, ভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির প্রভাব শক্তিশালী হলেও নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখনো বিদ্যমান।

কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভ’- সরকার পরিচালনার বৈধতা প্রদান করে; রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ক্ষমতার অনুগত করে তোলার অধিকার দেয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য উপাদান, কিন্তু সংখ্যালঘুর অধিকার, বিরোধী মতের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করার কোনো নৈতিক বা আইনগত অনুমোদন নয়।

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম। নির্বাচন কমিশনের যুক্তি হলো, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্ভুল ভোটার তালিকা অপরিহার্য। মৃত ব্যক্তি, স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত ভোটার, একাধিকবার নিবন্ধিত ব্যক্তি এবং আইনগতভাবে অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া নির্বাচন কমিশনের স্বাভাবিক প্রশাসনিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

এই যুক্তির যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একটি বৈধ প্রশাসনিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য গৃহীত পদ্ধতিও অবশ্যই আইনসম্মত, স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণে সক্ষম হতে হবে।

রয়টার্সের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকা সংশোধনের বিভিন্ন পর্যায়ে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে বলে বিরোধী পক্ষ দাবি করছে। প্রকাশিত পরিসংখ্যানে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত এবং ৩ কোটি অনুপস্থিত বা শনাক্ত করা যায়নি—এমন ভোটারের নাম বাদ পড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব নাম বাদ দেওয়ার পেছনে মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক নিবন্ধিত ও অন্যান্য অযোগ্য ভোটারের বিষয় রয়েছে। ফলে বাদ পড়া সব নামকে বৈধ ভোটারের নাম হিসেবে বিবেচনা করা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।

তবু এত বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও গণতান্ত্রিক প্রশ্ন তৈরি করে। এত বড় পরিসরে ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে ভুল শনাক্তকরণ, তথ্যগত অসংগতি, নোটিশ প্রদানের সীমাবদ্ধতা এবং আপিলের সুযোগ কতটা কার্যকর রয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ভারতের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, পরিযায়ী শ্রমিক, গৃহহীন মানুষ, প্রবীণ নাগরিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় পুরোনো নথি সংগ্রহ করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। নামের বানান, জন্মতারিখ, ঠিকানা কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের সামান্য অসংগতিও কোনো ব্যক্তিকে প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে ফেলতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্রের ভোটার তালিকা নির্ভুল করার দায়িত্ব নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের বৈধ প্রক্রিয়া থাকতে পারে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এমন হতে পারে না, যেখানে প্রশাসনিক ভুলের দায়ও শেষ পর্যন্ত নাগরিককেই বহন করতে হয়।

ভোটাধিকার কোনো প্রশাসনিক অনুগ্রহ নয়; এটি সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক অধিকার। ভারতের সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটাধিকারের সাংবিধানিক ভিত্তি নির্ধারণ করেছে। অতএব, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি পদক্ষেপে এই অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এখানে আরেকটি পার্থক্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন—ভোটার তালিকা থেকে কোনো ব্যক্তির নাম বাদ পড়া মানেই তাঁর নাগরিকত্ব বিলুপ্ত হওয়া নয়। ভোটার নিবন্ধন এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণ পৃথক আইনগত বিষয়। কিন্তু একজন যোগ্য নাগরিকের নাম অন্যায়ভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে তাঁর নির্বাচনী অংশগ্রহণের অধিকার বাস্তবিক অর্থেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে বিতর্কের প্রকৃত চরিত্র অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে নির্বাচন পরিচালনা করাই এই প্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব। কমিশনের সিদ্ধান্ত সব রাজনৈতিক পক্ষের পছন্দ হবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু তার সিদ্ধান্তের পেছনে আইন, প্রমাণ, যুক্তি এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া থাকতে হবে—এটাই গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা।

ভারতের বর্তমান বিতর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি ক্রমশ তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, ভোটার তালিকা সংশোধনে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অপর দুই সদস্য—সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অন্তত ১৪টি আপত্তি উত্থাপনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন, ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থাপনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কমিশনের সম্মিলিত ক্ষমতা প্রয়োগের প্রশ্ন রয়েছে।

এ ধরনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিজে কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। বরং স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু মতপার্থক্যের বিষয়গুলো যদি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে, তাহলে সেগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া কমিশনের দায়িত্ব।

এখানে নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিরোধীদের অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। একইভাবে কমিশনের সাংবিধানিক মর্যাদার অজুহাতে সব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বাতিল করাও যুক্তিসংগত নয়।

একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার জবাবদিহি করার সক্ষমতা। যে প্রতিষ্ঠান নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে তথ্য ও যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে না, তার প্রতি জনআস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে নতুন মাত্রা লাভ করে। কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন দলের নেতারা দিল্লিতে প্রতিবাদী পদযাত্রায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদবসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা।

প্রতিবাদকারীদের প্রধান দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। পদযাত্রার অংশ হিসেবে তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের দিকে অগ্রসর হন এবং পরে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও SIR কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি যৌথ আবেদন দাখিল করেন।

আবেদনে নির্বাচন কমিশনের সম্মিলিত ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর নিরীক্ষার দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। বিরোধীরা বাদ পড়া নামের স্বাধীন নিরীক্ষা, যথাযথ নোটিশ এবং আপিলের কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে।

অন্যদিকে, এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রতিবন্ধকতা এবং কয়েকটি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ ও আটকের ঘটনাও পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করেছে।

বিজেপি এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বিবেচনা করছে। তাদের বক্তব্য, বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রমকে বিতর্কিত করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

দুই পক্ষের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিরোধিতার বৈধতা যেমন স্বীকার করতে হয়, তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগও প্রমাণ ও বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আনতে হয়।

বিরোধীদের রাজপথের আন্দোলনকে কেবল ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেমন রাজনৈতিক সংকীর্ণতা, তেমনি আন্দোলনের প্রতিটি দাবিকে যাচাই ছাড়াই গণতন্ত্রের চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করাও দায়িত্বশীল অবস্থান নয়।

গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্যটিকে ধ্বংস করা যায় না।

ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা, ভোটার তালিকা সংশোধনের বৈধতা এবং নাগরিকের নির্বাচনী অধিকার—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত আইনের শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২৭ মে ২০২৬ তারিখে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিহারের SIR কার্যক্রমের বৈধতা বহাল রাখেন। আদালত সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আইনের অধীনে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনের ক্ষমতা স্বীকার করেন। একই সঙ্গে আদালতের রায় ও সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণের আইনগত ক্ষমতা এক নয়।

তবে এই রায়কে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিহারের SIR কার্যক্রমের আইনগত বৈধতা বহাল রাখার অর্থ এই নয় যে, পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী পরিচালিত প্রতিটি সংশোধনী সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ বলে গণ্য হবে। কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে অনিয়ম, যথাযথ প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় কিংবা নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ উঠলে তার পৃথক বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে।

১২ অক্টোবরের পদযাত্রার পর বিরোধী নেতাদের দাখিল করা যৌথ আবেদন সেই বিচারিক পর্যালোচনারই দাবি তুলেছে। অতএব, এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত অবস্থান জানার আগে কোনো পক্ষের অভিযোগ কিংবা পাল্টা বক্তব্যকে বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।

তবে ভারতের বিচার বিভাগের সামনে দায়িত্বটি নিছক একটি নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার—এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে ন্যায়সংগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের ঐক্য একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির শক্তিশালী নির্বাচনী অবস্থানের বিপরীতে বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলগুলো একটি যৌথ মঞ্চে অবস্থান নিয়েছে। SIR বিতর্ক সেই ঐক্যকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

কিন্তু রাজনৈতিক ঐক্য এবং বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তা এক বিষয় নয়।

কোনো একটি ক্ষমতাসীন দলের বিরোধিতা করার মধ্য দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প নির্মিত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনার সুস্পষ্ট দর্শন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের কর্মসূচি, সামাজিক বৈষম্য হ্রাসের পরিকল্পনা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের নিশ্চয়তা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকার।

বিরোধী দলগুলোরও নিজেদের রাজনৈতিক অতীত, শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষমতায় থাকাকালে গৃহীত বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ গণতন্ত্রের নৈতিকতা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।

যে রাজনৈতিক শক্তি আজ ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি দাবি করছে, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে তাকেও একই মানদণ্ডে বিচার করা হবে। সুতরাং ভারতের বিরোধী রাজনীতির সামনে কেবল বিজেপিকে পরাজিত করার চ্যালেঞ্জ নয়; বরং জনগণের সামনে একটি অধিকতর ন্যায়সংগত, উদার ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা উপস্থাপনের দায়িত্বও রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

এইচএসসিতে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ; অকৃতকার্য প্রায় ৬ লাখ

ভারতের গণতন্ত্র: সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অধিকারের সংকট

Update Time : ০৪:৫৮:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের পরিচিতি দীর্ঘদিনের। বিপুল জনসংখ্যা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নিয়মিত নির্বাচন, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি দেশটিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিচয় কেবল তার নির্বাচনী আয়োজনের ব্যাপকতা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। গণতন্ত্রের প্রকৃত ভিত্তি নিহিত থাকে নাগরিকের সমান অধিকার, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতার মধ্যে।

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এই মৌলিক সত্যকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোটের মধ্যে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা আপাতদৃষ্টিতে একটি নির্বাচনী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিতর্ক। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। এখানে প্রশ্ন উঠেছে নাগরিকের ভোটাধিকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে।

ভারতের রাজনৈতিক সংকটকে তাই কেবল বিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার এবং তার বাস্তব রাজনৈতিক চর্চার মধ্যকার দূরত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ভারত যে রাষ্ট্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বহুধর্মীয়, বহুভাষিক, বহুজাতিক ও বিপুল বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি জনগোষ্ঠীকে অভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে ঐক্যবদ্ধ রাখা। দেশভাগের সাম্প্রদায়িক ক্ষত, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, জাতপাতের বিভাজন এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের মধ্যেও ভারত সংসদীয় গণতন্ত্র ও সর্বজনীন ভোটাধিকারের পথ বেছে নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত ছিল তৎকালীন বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন প্রথম দিকের সরকারগুলো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তা, সংসদীয় বিতর্ক, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার যে ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করেছিল, তা পরবর্তী ভারতীয় রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য তৈরি করে। তবে সেই ঐতিহ্য কখনোই ত্রুটিমুক্ত ছিল না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংঘাত এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও সামাজিক অসন্তোষ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুরু থেকেই  ব্যাপক পরিসরে উপস্থিত ছিল।

১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের জরুরি অবস্থা ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক গভীর সতর্কসংকেত। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকার জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত করে, সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের আটক করে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছিল, নির্বাচিত সরকারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বিপন্ন করতে পারে।

জরুরি অবস্থার অবসানের পর ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয় এবং বিরোধী শক্তির ক্ষমতায় আরোহণ ভারতীয় জনগণের গণতান্ত্রিক প্রতিরোধক্ষমতার একটি ঐতিহাসিক প্রকাশ ছিল। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে ভারতীয় রাজনীতি যে শিক্ষা গ্রহণ করার কথা ছিল, তা হলো—গণতন্ত্রের নিরাপত্তা কোনো একক রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না; বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও পারস্পরিক ভারসাম্যের ওপর তা নির্ভরশীল।

পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থান, জাতপাতভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির বিস্তার এবং ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির প্রসার ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন রূপ দিয়েছে। বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শনের বিস্তার ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে একটি নতুন আদর্শিক সংঘাত তৈরি করেছে।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির ক্ষমতায় আরোহণ এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে নতুন গতি দেয়। ২০১৯ সালে দলটি আরও শক্তিশালী জনসমর্থন অর্জন করে। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের শরিকদের সমর্থনে সরকার গঠন করে। এই ফলাফল দেখিয়েছে, ভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির প্রভাব শক্তিশালী হলেও নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখনো বিদ্যমান।

কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভ’- সরকার পরিচালনার বৈধতা প্রদান করে; রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ক্ষমতার অনুগত করে তোলার অধিকার দেয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য উপাদান, কিন্তু সংখ্যালঘুর অধিকার, বিরোধী মতের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করার কোনো নৈতিক বা আইনগত অনুমোদন নয়।

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম। নির্বাচন কমিশনের যুক্তি হলো, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্ভুল ভোটার তালিকা অপরিহার্য। মৃত ব্যক্তি, স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত ভোটার, একাধিকবার নিবন্ধিত ব্যক্তি এবং আইনগতভাবে অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া নির্বাচন কমিশনের স্বাভাবিক প্রশাসনিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

এই যুক্তির যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একটি বৈধ প্রশাসনিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য গৃহীত পদ্ধতিও অবশ্যই আইনসম্মত, স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণে সক্ষম হতে হবে।

রয়টার্সের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকা সংশোধনের বিভিন্ন পর্যায়ে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে বলে বিরোধী পক্ষ দাবি করছে। প্রকাশিত পরিসংখ্যানে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত এবং ৩ কোটি অনুপস্থিত বা শনাক্ত করা যায়নি—এমন ভোটারের নাম বাদ পড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব নাম বাদ দেওয়ার পেছনে মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক নিবন্ধিত ও অন্যান্য অযোগ্য ভোটারের বিষয় রয়েছে। ফলে বাদ পড়া সব নামকে বৈধ ভোটারের নাম হিসেবে বিবেচনা করা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।

তবু এত বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও গণতান্ত্রিক প্রশ্ন তৈরি করে। এত বড় পরিসরে ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে ভুল শনাক্তকরণ, তথ্যগত অসংগতি, নোটিশ প্রদানের সীমাবদ্ধতা এবং আপিলের সুযোগ কতটা কার্যকর রয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ভারতের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, পরিযায়ী শ্রমিক, গৃহহীন মানুষ, প্রবীণ নাগরিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় পুরোনো নথি সংগ্রহ করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। নামের বানান, জন্মতারিখ, ঠিকানা কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের সামান্য অসংগতিও কোনো ব্যক্তিকে প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে ফেলতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্রের ভোটার তালিকা নির্ভুল করার দায়িত্ব নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের বৈধ প্রক্রিয়া থাকতে পারে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এমন হতে পারে না, যেখানে প্রশাসনিক ভুলের দায়ও শেষ পর্যন্ত নাগরিককেই বহন করতে হয়।

ভোটাধিকার কোনো প্রশাসনিক অনুগ্রহ নয়; এটি সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক অধিকার। ভারতের সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটাধিকারের সাংবিধানিক ভিত্তি নির্ধারণ করেছে। অতএব, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি পদক্ষেপে এই অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এখানে আরেকটি পার্থক্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন—ভোটার তালিকা থেকে কোনো ব্যক্তির নাম বাদ পড়া মানেই তাঁর নাগরিকত্ব বিলুপ্ত হওয়া নয়। ভোটার নিবন্ধন এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণ পৃথক আইনগত বিষয়। কিন্তু একজন যোগ্য নাগরিকের নাম অন্যায়ভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে তাঁর নির্বাচনী অংশগ্রহণের অধিকার বাস্তবিক অর্থেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে বিতর্কের প্রকৃত চরিত্র অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে নির্বাচন পরিচালনা করাই এই প্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব। কমিশনের সিদ্ধান্ত সব রাজনৈতিক পক্ষের পছন্দ হবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু তার সিদ্ধান্তের পেছনে আইন, প্রমাণ, যুক্তি এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া থাকতে হবে—এটাই গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা।

ভারতের বর্তমান বিতর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি ক্রমশ তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, ভোটার তালিকা সংশোধনে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অপর দুই সদস্য—সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অন্তত ১৪টি আপত্তি উত্থাপনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন, ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থাপনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কমিশনের সম্মিলিত ক্ষমতা প্রয়োগের প্রশ্ন রয়েছে।

এ ধরনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিজে কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। বরং স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু মতপার্থক্যের বিষয়গুলো যদি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে, তাহলে সেগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া কমিশনের দায়িত্ব।

এখানে নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিরোধীদের অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। একইভাবে কমিশনের সাংবিধানিক মর্যাদার অজুহাতে সব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বাতিল করাও যুক্তিসংগত নয়।

একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার জবাবদিহি করার সক্ষমতা। যে প্রতিষ্ঠান নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে তথ্য ও যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে না, তার প্রতি জনআস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে নতুন মাত্রা লাভ করে। কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন দলের নেতারা দিল্লিতে প্রতিবাদী পদযাত্রায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদবসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা।

প্রতিবাদকারীদের প্রধান দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। পদযাত্রার অংশ হিসেবে তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের দিকে অগ্রসর হন এবং পরে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও SIR কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি যৌথ আবেদন দাখিল করেন।

আবেদনে নির্বাচন কমিশনের সম্মিলিত ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর নিরীক্ষার দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। বিরোধীরা বাদ পড়া নামের স্বাধীন নিরীক্ষা, যথাযথ নোটিশ এবং আপিলের কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে।

অন্যদিকে, এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রতিবন্ধকতা এবং কয়েকটি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ ও আটকের ঘটনাও পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করেছে।

বিজেপি এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বিবেচনা করছে। তাদের বক্তব্য, বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রমকে বিতর্কিত করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

দুই পক্ষের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিরোধিতার বৈধতা যেমন স্বীকার করতে হয়, তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগও প্রমাণ ও বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আনতে হয়।

বিরোধীদের রাজপথের আন্দোলনকে কেবল ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেমন রাজনৈতিক সংকীর্ণতা, তেমনি আন্দোলনের প্রতিটি দাবিকে যাচাই ছাড়াই গণতন্ত্রের চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করাও দায়িত্বশীল অবস্থান নয়।

গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্যটিকে ধ্বংস করা যায় না।

ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা, ভোটার তালিকা সংশোধনের বৈধতা এবং নাগরিকের নির্বাচনী অধিকার—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত আইনের শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২৭ মে ২০২৬ তারিখে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিহারের SIR কার্যক্রমের বৈধতা বহাল রাখেন। আদালত সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আইনের অধীনে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনের ক্ষমতা স্বীকার করেন। একই সঙ্গে আদালতের রায় ও সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণের আইনগত ক্ষমতা এক নয়।

তবে এই রায়কে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিহারের SIR কার্যক্রমের আইনগত বৈধতা বহাল রাখার অর্থ এই নয় যে, পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী পরিচালিত প্রতিটি সংশোধনী সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ বলে গণ্য হবে। কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে অনিয়ম, যথাযথ প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় কিংবা নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ উঠলে তার পৃথক বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে।

১২ অক্টোবরের পদযাত্রার পর বিরোধী নেতাদের দাখিল করা যৌথ আবেদন সেই বিচারিক পর্যালোচনারই দাবি তুলেছে। অতএব, এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত অবস্থান জানার আগে কোনো পক্ষের অভিযোগ কিংবা পাল্টা বক্তব্যকে বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।

তবে ভারতের বিচার বিভাগের সামনে দায়িত্বটি নিছক একটি নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার—এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে ন্যায়সংগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের ঐক্য একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির শক্তিশালী নির্বাচনী অবস্থানের বিপরীতে বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলগুলো একটি যৌথ মঞ্চে অবস্থান নিয়েছে। SIR বিতর্ক সেই ঐক্যকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

কিন্তু রাজনৈতিক ঐক্য এবং বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তা এক বিষয় নয়।

কোনো একটি ক্ষমতাসীন দলের বিরোধিতা করার মধ্য দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প নির্মিত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনার সুস্পষ্ট দর্শন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের কর্মসূচি, সামাজিক বৈষম্য হ্রাসের পরিকল্পনা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের নিশ্চয়তা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকার।

বিরোধী দলগুলোরও নিজেদের রাজনৈতিক অতীত, শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষমতায় থাকাকালে গৃহীত বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ গণতন্ত্রের নৈতিকতা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।

যে রাজনৈতিক শক্তি আজ ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি দাবি করছে, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে তাকেও একই মানদণ্ডে বিচার করা হবে। সুতরাং ভারতের বিরোধী রাজনীতির সামনে কেবল বিজেপিকে পরাজিত করার চ্যালেঞ্জ নয়; বরং জনগণের সামনে একটি অধিকতর ন্যায়সংগত, উদার ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা উপস্থাপনের দায়িত্বও রয়েছে।