Dhaka ০৪:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক। | ২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্য সরাসরি নাকচ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরোধী এবং ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। আইজিপি অসতর্কতাবশত এমন বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ঠিক হয়নি, উচিত হয়নি।’

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সরকার তো ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স। উনি (আইজিপি) সহজ-সরল মানুষ। আইনের কঠোর প্রয়োগের বিষয়ে বলতে গিয়ে অসতর্কতাবশত বলে ফেলেছেন। এটা ঠিক হয়নি, উচিত হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হতে দেবে না। এ বিষয়ে সরকার অত্যন্ত কঠোর। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু (কাস্টডিয়াল ডেথ) কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকারের সময়ে এখন পর্যন্ত ক্রসফায়ার কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। অপরাধ দমন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। সেখানে তিনি বলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করতেও পিছপা হবে না।

আইজিপি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ পুলিশকে ফ্যাসিস্ট বলে, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল বলে আখ্যা দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, আমরা সেটাই করব।’

আইজিপির এ বক্তব্যের পর রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়। বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অর্থে আইজিপি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের বিষয়টি বোঝাতেই তিনি শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশ মানবাধিকার সমুন্নত রেখে জনগণের জানমাল রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এদিকে আইজিপির বক্তব্যের সমালোচনা করে মঙ্গলবার দুপুরে প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ক্রসফায়ার নিয়ে পুলিশপ্রধানের মন্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর।

রিজভী বলেন, যে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, সেই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় পুলিশপ্রধানের মুখে ক্রসফায়ারের কথা তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। অপরাধ দমনে দেশে পর্যাপ্ত আইন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আইনবহির্ভূত কোনো পদ্ধতি অনুসরণ না করে প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান।

আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্রসফায়ার সংক্রান্ত এ ধরনের বক্তব্য সংবিধান ও আইনের শাসনের পরিপন্থী। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং এবি পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনও বক্তব্যটির সমালোচনা করেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কোরআনের বিধান বাস্তবায়নে সংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আমির হামজা, টানলেন সোলায়মান (আ.) ও রানি বিলকিসের ঘটনা

ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

Update Time : ০৩:০৬:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক। | ২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্য সরাসরি নাকচ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরোধী এবং ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। আইজিপি অসতর্কতাবশত এমন বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ঠিক হয়নি, উচিত হয়নি।’

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সরকার তো ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স। উনি (আইজিপি) সহজ-সরল মানুষ। আইনের কঠোর প্রয়োগের বিষয়ে বলতে গিয়ে অসতর্কতাবশত বলে ফেলেছেন। এটা ঠিক হয়নি, উচিত হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হতে দেবে না। এ বিষয়ে সরকার অত্যন্ত কঠোর। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু (কাস্টডিয়াল ডেথ) কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকারের সময়ে এখন পর্যন্ত ক্রসফায়ার কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। অপরাধ দমন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। সেখানে তিনি বলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করতেও পিছপা হবে না।

আইজিপি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ পুলিশকে ফ্যাসিস্ট বলে, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল বলে আখ্যা দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, আমরা সেটাই করব।’

আইজিপির এ বক্তব্যের পর রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়। বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অর্থে আইজিপি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের বিষয়টি বোঝাতেই তিনি শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশ মানবাধিকার সমুন্নত রেখে জনগণের জানমাল রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এদিকে আইজিপির বক্তব্যের সমালোচনা করে মঙ্গলবার দুপুরে প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ক্রসফায়ার নিয়ে পুলিশপ্রধানের মন্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর।

রিজভী বলেন, যে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, সেই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় পুলিশপ্রধানের মুখে ক্রসফায়ারের কথা তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। অপরাধ দমনে দেশে পর্যাপ্ত আইন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আইনবহির্ভূত কোনো পদ্ধতি অনুসরণ না করে প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান।

আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্রসফায়ার সংক্রান্ত এ ধরনের বক্তব্য সংবিধান ও আইনের শাসনের পরিপন্থী। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং এবি পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনও বক্তব্যটির সমালোচনা করেছে।