Dhaka ০৭:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লিতে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের ঢেউ, তরুণদের ক্ষোভে নড়ছে ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক-দৈনিক প্রান্তিক।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janta Party-CJP) আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যেই পরীক্ষা-জালিয়াতি, বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং সরকারি জবাবদিহির দাবিতে একটি বৃহৎ গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ দিল্লির রাজপথে নেমে এলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদনগুলো বলছে, আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (NEET)-এর প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায় নির্ধারণ, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, সরকারি নিয়োগ ও পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ধারাবাহিক পরীক্ষা-অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

‘ককরোচ’ নামটির পেছনেও রয়েছে বিতর্ক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বেকার তরুণদের উদ্দেশে অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনকারীরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘ককরোচ’ শব্দটি গ্রহণ করেন। পরে সেই পরিচয়ই সংগঠনের রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।

সোমবার দিল্লিতে সংসদমুখী ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে হাজারো বিক্ষোভকারী এগিয়ে গেলে পুলিশ ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। সংঘর্ষে বহু আন্দোলনকারী ও নিরাপত্তা সদস্য আহত হন। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে অনশন শুরু করেন পরিবেশবাদী ও শিক্ষাসংস্কারক সোনম ওয়াংচুক। তার অনশন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত তাদের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।

এদিকে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অভিজিৎ দিপকে সাম্প্রতিক সহিংসতার পর জানান, আপাতত বড় ধরনের মিছিলের পরিবর্তে অবস্থান কর্মসূচি, আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথেই তারা এগোবেন। তার অভিযোগ, পুলিশের কঠোর অভিযানে বহু তরুণ-তরুণী আহত হয়েছেন। তবে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি ঘোষণা দেন।

অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দাবি করেছে, এই বিক্ষোভ স্বতঃস্ফূর্ত নয়; এর পেছনে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব রয়েছে। বিরোধী দলগুলো আবার উল্টো সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের ন্যায্য দাবিকে দমন করার অভিযোগ তুলেছে। ফলে আন্দোলনটি শুধু শিক্ষা সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভারতের সমসাময়িক রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নফাঁস, উচ্চ বেকারত্ব, সরকারি চাকরির সংকট এবং তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়ায় তা সময়ই বলবে, তবে এটি ভারতের তরুণ সমাজের ক্ষোভ ও প্রত্যাশার একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে ইতোমধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

এইচএসসিতে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ; অকৃতকার্য প্রায় ৬ লাখ

দিল্লিতে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের ঢেউ, তরুণদের ক্ষোভে নড়ছে ভারত

Update Time : ০৮:৫২:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক-দৈনিক প্রান্তিক।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janta Party-CJP) আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যেই পরীক্ষা-জালিয়াতি, বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং সরকারি জবাবদিহির দাবিতে একটি বৃহৎ গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ দিল্লির রাজপথে নেমে এলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদনগুলো বলছে, আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (NEET)-এর প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায় নির্ধারণ, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, সরকারি নিয়োগ ও পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ধারাবাহিক পরীক্ষা-অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

‘ককরোচ’ নামটির পেছনেও রয়েছে বিতর্ক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বেকার তরুণদের উদ্দেশে অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনকারীরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘ককরোচ’ শব্দটি গ্রহণ করেন। পরে সেই পরিচয়ই সংগঠনের রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।

সোমবার দিল্লিতে সংসদমুখী ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে হাজারো বিক্ষোভকারী এগিয়ে গেলে পুলিশ ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। সংঘর্ষে বহু আন্দোলনকারী ও নিরাপত্তা সদস্য আহত হন। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে অনশন শুরু করেন পরিবেশবাদী ও শিক্ষাসংস্কারক সোনম ওয়াংচুক। তার অনশন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত তাদের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।

এদিকে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অভিজিৎ দিপকে সাম্প্রতিক সহিংসতার পর জানান, আপাতত বড় ধরনের মিছিলের পরিবর্তে অবস্থান কর্মসূচি, আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথেই তারা এগোবেন। তার অভিযোগ, পুলিশের কঠোর অভিযানে বহু তরুণ-তরুণী আহত হয়েছেন। তবে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি ঘোষণা দেন।

অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দাবি করেছে, এই বিক্ষোভ স্বতঃস্ফূর্ত নয়; এর পেছনে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব রয়েছে। বিরোধী দলগুলো আবার উল্টো সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের ন্যায্য দাবিকে দমন করার অভিযোগ তুলেছে। ফলে আন্দোলনটি শুধু শিক্ষা সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভারতের সমসাময়িক রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নফাঁস, উচ্চ বেকারত্ব, সরকারি চাকরির সংকট এবং তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়ায় তা সময়ই বলবে, তবে এটি ভারতের তরুণ সমাজের ক্ষোভ ও প্রত্যাশার একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে ইতোমধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।