নিজস্ব প্রতিবেদক- দৈনিক প্রান্তিক।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় অবশেষে হত্যা মামলা করেছেন তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। রাজধানীর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে দায়ের করা এ মামলায় তাহসিফের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করবে নৌ-পুলিশ।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে দায়ের করা মামলাটির পরপরই দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর আগে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হেফাজতে থাকা দীপকে রাতেই নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শনিবার (৩১ অক্টোবর) তাঁকে আদালতে হাজির করার প্রস্তুতি নেয় নৌ-পুলিশ।
নৌ-পুলিশ সূত্র জানায়, তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মামলাটি তদন্ত করছে নৌ-পুলিশ। মামলায় হত্যার পাশাপাশি মরদেহ গুম ও আলামত গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হলেও দীপকে সরাসরি আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি; পরবর্তী সময়ে তাঁকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায়। ওই দিন উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট এলাকার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, দীপের সঙ্গে দেখা করে ফিরবেন। বাসার সিসিটিভি ফুটেজে সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে দীপকে গ্যারেজে আসতে এবং ৬টা ৩১ মিনিটে দুজনকে পৃথক মোটরসাইকেলে বের হতে দেখা যায়। এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তাহসিফ।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মোবাইল ফোন থেকে তাঁর মায়ের কাছে একটি ভয়েস বার্তা আসে। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আম্মু, আমি আসছি।’ এটিই ছিল পরিবারের কাছে তাঁর শেষ বার্তা। এর কয়েক ঘণ্টা পর টঙ্গীর তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নৌ-পুলিশ জানায়, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধার করেন। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
তদন্তে নতুন করে আলোচনায় এসেছে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা। পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা দীপকে সঙ্গে নিয়ে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) তুরাগ নদসংলগ্ন রাজাবাড়ী ঘাট ও মাজার বস্তি এলাকা পরিদর্শন করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে ওই এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি কালো মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেলটি তাহসিফের ব্যবহৃত কি না, তা যাচাই করছেন তদন্তকারীরা। এ জন্য আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া বক্তব্যেও অসংগতি পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাঁর একেক সময়ের বক্তব্যে ঘটনার বিবরণে পার্থক্য দেখা গেছে। এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় অবস্থানকালে কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করেন। এ সময় তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন এবং তিনি নিজে পালিয়ে যান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ঘটনাস্থলের কাছাকাছি একটি পোশাক কারখানার নিরাপত্তাকর্মীদের পোশাক দেখে তাঁরা তাঁদের পুলিশ সদস্য বলে ভুল করে থাকতে পারেন। তবে ধাওয়া দেওয়া ব্যক্তিরা কারা ছিলেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে পুলিশের সদস্য ছিলেন কি না কিংবা অন্য কোনো পক্ষের লোক ছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীপের দেওয়া তথ্য ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময়ও তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন তথ্য ও আলামত পরীক্ষা করা হয়।
অন্যদিকে, দীপের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছেন তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম। তাঁর দাবি, ছেলেকে হত্যা করে মরদেহ নদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নিজেই নদে ঝাঁপ দিয়েছেন—দীপের এমন বক্তব্য তিনি বিশ্বাস করেন না।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঘটনার দিনের গতিবিধি, দুই বন্ধুর পৃথক মোটরসাইকেলে চলাচল, মাজার বস্তি এলাকায় তাঁদের উপস্থিতি, ধাওয়া দেওয়ার দাবির সত্যতা এবং উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটির পরিচয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক- দৈনিক প্রান্তিক। 




















