২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কিছু মানুষ চলে যান নিঃশব্দে। অথচ তাঁদের চলে যাওয়ার শব্দ বহুদূর পর্যন্ত শোনা যায়। কোনো পদ-পদবি, প্রচার কিংবা জৌলুসের মধ্য দিয়ে নয়—মানুষের জীবনে রেখে যাওয়া আলোতেই তাঁরা বেঁচে থাকেন। একজন শিক্ষকও তেমনই। শ্রেণিকক্ষের সীমিত পরিসরে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের অক্ষর পড়ান না; অদৃশ্য হাতে গড়ে দেন মানুষের চিন্তা, মনন ও ভবিষ্যৎ।
নিভৃতে আলো জ্বালিয়ে যাওয়া তেমনই এক মানুষ ওয়াজেদ আলী খান মাস্টার। ৯৫ বছরের দীর্ঘ জীবন শেষে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভোর ৫টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন—ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন আদর্শ প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতা তাঁর কাছে কেবল জীবিকার অবলম্বন ছিল না; ছিল মানুষ গড়ার এক নীরব সাধনা। প্রাথমিক শিক্ষার সেই কোমল বয়সে অসংখ্য শিশুর হাতে তিনি তুলে দিয়েছেন জ্ঞানের প্রথম প্রদীপ। তাঁদের চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে, মননশীলতা জাগাতে এবং সৃজনশীলতার পথে এগিয়ে দিতে নিজের কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় উৎসর্গ করেছেন।
অবসর নিয়েছেন চাকরি থেকে, কিন্তু শিক্ষকতা থেকে নয়। কারণ প্রকৃত শিক্ষকের অবসর হয় না। বিদ্যালয়ের দরজা পেরিয়ে তাঁর পাঠ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের জীবনে; তাঁদের চিন্তা, আচরণ ও কর্মের মধ্য দিয়ে সেই পাঠ বেঁচে থাকে বহুদিন।
ওয়াজেদ আলী খান মাস্টারের জীবনেও সেই উত্তরাধিকারেরই বিস্তার দেখা যায়।
তাঁর তিন পুত্র ও দুই কন্যার প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে সালাহ উদ্দিন খান হারুন পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। মেঝো ছেলে মো. রায়হান উদ্দিন খান বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-১ শাখায় দায়িত্ব পালন করছেন। ছোট ছেলে শরিফ উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
বড় মেয়ে শামীমা সুলতানা গৃহিণী এবং ছোট মেয়ে শাহিন সুলতানা ঢাকার একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন।
তবে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কেবল তাঁর সন্তানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার চেয়েও গভীর এক উত্তরাধিকার ছড়িয়ে থাকে তাঁর শিক্ষার্থীদের মননে। শ্রেণিকক্ষের নীরব দুপুরে, একটি চকখণ্ডের সাদা রেখায় কিংবা কোনো একদিন বলা সামান্য অথচ জীবনবদলে দেওয়া কথায় তিনি রেখে যান তাঁর অস্তিত্বের চিহ্ন। সেই শিক্ষার্থীরা যখন সময়ের স্রোত পেরিয়ে নিজেদের জীবন গড়ে, তাঁদের চিন্তা ও কর্মে যখন সেই শিক্ষকের বপন করা মূল্যবোধের অঙ্কুর আবার নতুন প্রজন্মে জন্ম নেয়, তখন শিক্ষক আর কেবল একজন ব্যক্তি থাকেন না—তিনি হয়ে ওঠেন এক চলমান উত্তরাধিকার, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বহমান আলোর নাম।
ওয়াজেদ আলী খান মাস্টার ছিলেন সেই নীরব নির্মাতাদের একজন। তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে। অসংখ্য শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনি মননশীলতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক চেতনার বীজ বপন করেছেন। তাঁদের অনেকেই আজ জীবনের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। সময় তাঁদের দূরে নিয়ে গেছে, বদলে দিয়েছে তাঁদের পরিচয় ও কর্মক্ষেত্র; কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের দেওয়া শিক্ষার আলো সহজে নিভে যায় না।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর কিছু কাজের কোনো স্মারকফলক থাকে না। কোনো সরকারি নথিতে তার পূর্ণ হিসাবও লেখা থাকে না। একজন শিক্ষক কতজন মানুষের জীবনকে স্পর্শ করেছেন, কতটি শিশুর চিন্তার জানালা খুলে দিয়েছেন, কতজনকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে হাঁটতে শিখিয়েছেন—তার হিসাব থাকে মানুষের স্মৃতিতে।
সেই স্মৃতিই ওয়াজেদ আলী খান মাস্টারের সবচেয়ে বড় স্মারক।
আজ তাঁর হাতে নেই চক। নেই বিদ্যালয়ের সেই পরিচিত বারান্দা, নেই শ্রেণিকক্ষের কোলাহল। নেই শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ব্যস্ততা। একটি দীর্ঘ কর্মজীবনের পর্দা নেমেছে, একটি জীবনের পাঠ শেষ হয়েছে। কিন্তু তাঁর জ্বেলে যাওয়া প্রদীপগুলো এখনো জ্বলছে—তাঁর সন্তানদের জীবনে, তাঁর শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে, তাঁদের চিন্তা ও কর্মের ভেতরে।
ভোর পাঁচটার সেই শেষ প্রহরে একজন প্রবীণ শিক্ষক পাড়ি জমালেন অনন্তলোকের পথে। পেছনে রয়ে গেল তাঁর পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, অসংখ্য গুণগ্রাহী এবং অগণিত শিক্ষার্থী—যাঁদের জীবনের কোনো এক ভোরে তিনি হয়তো প্রথম বলেছিলেন, শিখো, মানুষ হও।
এমন মানুষদের মৃত্যু তাই নিছক একটি জীবনের সমাপ্তি নয়। তাঁরা চলে যান, কিন্তু তাঁদের ছড়িয়ে দেওয়া আলো থেকে যায়। সময়ের অন্ধকারে সেই আলোই একদিন আবার কোনো নতুন প্রজন্মের পথ দেখায়।
ওয়াজেদ আলী খান মাস্টারও তাই চলে গেলেন—নিভৃতে আলো জ্বালিয়ে।
নক্ষত্রের মতো কিছু মানুষ অস্ত যান, কিন্তু তাঁদের আলো থেকে যায় আকাশের গায়ে। একজন আদর্শ শিক্ষকও তেমনই—জীবনের পাঠশালা থেকে বিদায় নেন, অথচ তাঁর পাঠ চলতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
মহান আল্লাহ মরহুম ওয়াজেদ আলী খান মাস্টারকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন, তাঁর জীবনের নেক আমলগুলো কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় বেদনা সহ্য করার শক্তি দান করুন।
আমিন।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন-সম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক। 























