Dhaka ০৬:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

দেশের রাজনীতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ঘিরে নতুন করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। একে অপরের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ দলটির সঙ্গে গোপন সমঝোতা, রাজনৈতিক সখ্য ও যোগসাজশের অভিযোগ তুলছে দুই পক্ষ। শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও পরস্পরকে দায়ী করার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘আওয়ামী লীগ কার্ড’।

ক্ষমতাসীন বিএনপির অভিযোগ, দেশকে অস্থিতিশীল করতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা দেশের বাইরে থেকে অর্থ সরবরাহ করছেন। দেশের ভেতরে কয়েকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী সেই অর্থ ও ইন্ধনে শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। অন্যদিকে জামায়াতের অভিযোগ, বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে বিএনপি। দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার পথ তৈরি করছে বলেও দাবি তাদের।

তবে দুই পক্ষের এসব গুরুতর অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সত্যিই কি কোনো পক্ষের গোপন রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে, নাকি প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে দলটি এখন পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে?

বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। নির্বাচনের পর বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য সরকারের কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে শুরু থেকেই মতপার্থক্য দেখা দেয়।

পরবর্তী সময়ে জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধী দল সোচ্চার হয়। সরকার গঠনের সাত মাসের মধ্যেই লংমার্চ, বিভাগীয় সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী জোট। এসব কর্মসূচিতে সরকারের নীতির সমালোচনার পাশাপাশি সরকারবিরোধী কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্যও এসেছে।

সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে আর সহযোগিতা না করার ঘোষণা দিয়েছেন। এর পাশাপাশি রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বকেয়া বেতন, মজুরি বৃদ্ধি এবং অন্যান্য শ্রমিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনও জোরালো হয়েছে।

সরকারের অভিযোগ, এসব আন্দোলনের কিছু অংশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে একটি মহল দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। এর পেছনে বিরোধী দলের ইন্ধন রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের মধ্যে যোগসাজশের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে জামায়াতের দাবি, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করে সরকার নিজের ব্যর্থতা আড়াল করতে চাইছে। বিরোধী দলকে চাপে রাখতেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।

গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের পর বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।

দেশের কয়েকটি শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, পলাতক স্বৈরাচারী শক্তি সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে। দেশের ভেতরে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করা কয়েকটি গোষ্ঠী সেই অর্থের সহায়তায় অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে। … এই দুইপক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।’

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত রয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তিনি বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম, অর্থ লেনদেনের বিবরণ কিংবা গোয়েন্দা তথ্যের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করেননি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরদিন ২১ অক্টোবর বুধবার রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশ লেবার পার্টির নতুন কার্যালয় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে পাল্টা অভিযোগ তোলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিএনপি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে। বিএনপি আওয়ামী লীগকে দেশে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

গোলাম পরওয়ারের দাবি, দেশে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও চাঁদাবাজির মতো সমস্যার কারণে শ্রমজীবী মানুষের জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে। অথচ শ্রমিকদের অসন্তোষের দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানো হচ্ছে। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে না দেখে আলোচনার মাধ্যমে তাদের দাবি বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপির বিরুদ্ধে নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করার অভিযোগও তোলেন জামায়াতের এই নেতা।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাজধানীর শান্তিনগরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ শেষে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তিনি অভিযোগ করেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও একটি ‘গুপ্ত দল’ যৌথভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, পরাজিত শক্তি ও ওই দলের আচরণ এবং কথাবার্তায় মিল রয়েছে। অতীতের মতো এখনো তারা বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেওয়ার বক্তব্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তবে রিজভীও তাঁর বক্তব্যে অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি বা বিস্তারিত প্রমাণ জনসমক্ষে তুলে ধরেননি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও দুই দলের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সমর্থন আদায় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার অভিযোগ উঠেছিল।

সে সময় বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির জন্য তদবিরের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কোনো কোনো এলাকায় নির্বাচনী জনসভায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।

নির্বাচনের পর কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার খবর প্রকাশিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতে এসব কার্যালয় খোলার ঘটনাও ঘটে। পরবর্তী সময়ে বিএনপির একাংশের নেতাকর্মী ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিবাদের মুখে কয়েকটি কার্যালয় আবার বন্ধ হয়ে যায়।

এ ছাড়া বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের কয়েকজন কারাবন্দি নেতাকর্মীর জামিনে মুক্তি এবং আত্মগোপনে থাকা কারও কারও প্রকাশ্যে আসার ঘটনাও রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। তবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে দলীয় পর্যায়ে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। জামিনের বিষয়টি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং প্রতিটি ঘটনার নিজস্ব আইনি প্রেক্ষাপট রয়েছে।

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল, কথিত লকডাউন কর্মসূচি, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনার পর দলটির সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে সরকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের তৎপরতা, অর্থায়ন এবং বিভিন্ন আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের ক্ষেত্রে পৃথকভাবে তথ্যপ্রমাণ যাচাই করা জরুরি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্তের প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ অবস্থায় দলটির তৎপরতা মোকাবিলায় সরকারের আইনানুগ পদক্ষেপ যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডেও দায়িত্বশীলতা থাকা জরুরি।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলেছেন। সুতরাং বিষয়টি পরিষ্কার করতে হলে সেই তথ্যের ভিত্তি ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যথাযথ প্রক্রিয়ায় সামনে আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিরোধী দলেরও পাল্টা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।

তাঁর মতে, সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগের রাজনীতি চালিয়ে গেলে পতিত আওয়ামী লীগ সেই রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিতে পারে। এতে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক ফজল মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য কতটা গভীর ও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে এসব বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে দোষারোপের রাজনীতি চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে বিতাড়িত রাজনৈতিক শক্তি। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সংযত হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ইস্যুটি এখন কেবল একটি দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়; এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

একদিকে সরকারের দায়িত্ব, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। অন্যদিকে বিরোধী দলের দায়িত্ব, সরকারের ভুলনীতি ও ব্যর্থতার সমালোচনা করা এবং জনগণের স্বার্থে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা করা। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি শ্রমিক অসন্তোষকে ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক অভিযোগ আর প্রমাণ এক নয়। কোনো দলের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ উঠলে তার পক্ষে তথ্যপ্রমাণ থাকা প্রয়োজন। একইভাবে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলে সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আইনানুগ যাচাইয়ের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যথায় বিএনপি ও জামায়াতের পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সংঘাতের সুযোগে আওয়ামী লীগসহ পতিত রাজনৈতিক শক্তি নতুন করে সংগঠিত হওয়ার রাজনৈতিক পরিসর পেতে পারে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেয়ে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি সুদৃঢ় করা এখন অনেক বেশি জরুরি। কারণ ক্ষমতার পালাবদল রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও জনগণের নিরাপত্তা কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, সরকারের সমালোচনা হবে, বিরোধী দল তার দায়িত্ব পালন করবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যখন পারস্পরিক অবিশ্বাস, দোষারোপ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তখন তার সুযোগ নেয় গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী—দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে যাদের অভিন্ন সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, তাদের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক দূরত্ব কোনোভাবেই দেশের জন্য ইতিবাচক নয়। বিশেষত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দুই পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।

সরকার ও বিরোধী দল যদি একে অপরকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে ব্যস্ত রাখে, তাহলে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার পরিবর্তে তাদেরই পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক বিভাজন যত গভীর হবে, পতিত শক্তির জন্য ততই সুযোগ বাড়বে।

এ কারণে এখন সময় এসেছে পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার। সরকারের উচিত বিরোধী দলের ন্যায্য সমালোচনা ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির প্রতি সহনশীল থাকা। অন্যদিকে বিরোধী দলেরও উচিত রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়া।

বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ন্যূনতম বোঝাপড়া থাকা জরুরি। আওয়ামী লীগের অতীত শাসন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে একটি নীতিগত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।

কারণ, ক্ষমতার রাজনীতিতে কে জয়ী হলো, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—বাংলাদেশের গণতন্ত্র কতটা নিরাপদ থাকল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে গিয়ে যেন পতিত স্বৈরাচারী শক্তির ফিরে আসার পথ তৈরি না হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

এইচএসসিতে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ; অকৃতকার্য প্রায় ৬ লাখ

আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

Update Time : ০৪:৪৭:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

দেশের রাজনীতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ঘিরে নতুন করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। একে অপরের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ দলটির সঙ্গে গোপন সমঝোতা, রাজনৈতিক সখ্য ও যোগসাজশের অভিযোগ তুলছে দুই পক্ষ। শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও পরস্পরকে দায়ী করার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘আওয়ামী লীগ কার্ড’।

ক্ষমতাসীন বিএনপির অভিযোগ, দেশকে অস্থিতিশীল করতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা দেশের বাইরে থেকে অর্থ সরবরাহ করছেন। দেশের ভেতরে কয়েকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী সেই অর্থ ও ইন্ধনে শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। অন্যদিকে জামায়াতের অভিযোগ, বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে বিএনপি। দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার পথ তৈরি করছে বলেও দাবি তাদের।

তবে দুই পক্ষের এসব গুরুতর অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সত্যিই কি কোনো পক্ষের গোপন রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে, নাকি প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে দলটি এখন পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে?

বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। নির্বাচনের পর বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য সরকারের কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে শুরু থেকেই মতপার্থক্য দেখা দেয়।

পরবর্তী সময়ে জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধী দল সোচ্চার হয়। সরকার গঠনের সাত মাসের মধ্যেই লংমার্চ, বিভাগীয় সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী জোট। এসব কর্মসূচিতে সরকারের নীতির সমালোচনার পাশাপাশি সরকারবিরোধী কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্যও এসেছে।

সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে আর সহযোগিতা না করার ঘোষণা দিয়েছেন। এর পাশাপাশি রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বকেয়া বেতন, মজুরি বৃদ্ধি এবং অন্যান্য শ্রমিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনও জোরালো হয়েছে।

সরকারের অভিযোগ, এসব আন্দোলনের কিছু অংশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে একটি মহল দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। এর পেছনে বিরোধী দলের ইন্ধন রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের মধ্যে যোগসাজশের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে জামায়াতের দাবি, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করে সরকার নিজের ব্যর্থতা আড়াল করতে চাইছে। বিরোধী দলকে চাপে রাখতেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।

গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের পর বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।

দেশের কয়েকটি শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, পলাতক স্বৈরাচারী শক্তি সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে। দেশের ভেতরে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করা কয়েকটি গোষ্ঠী সেই অর্থের সহায়তায় অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে। … এই দুইপক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।’

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত রয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তিনি বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম, অর্থ লেনদেনের বিবরণ কিংবা গোয়েন্দা তথ্যের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করেননি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরদিন ২১ অক্টোবর বুধবার রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশ লেবার পার্টির নতুন কার্যালয় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে পাল্টা অভিযোগ তোলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিএনপি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে। বিএনপি আওয়ামী লীগকে দেশে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

গোলাম পরওয়ারের দাবি, দেশে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও চাঁদাবাজির মতো সমস্যার কারণে শ্রমজীবী মানুষের জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে। অথচ শ্রমিকদের অসন্তোষের দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানো হচ্ছে। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে না দেখে আলোচনার মাধ্যমে তাদের দাবি বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপির বিরুদ্ধে নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করার অভিযোগও তোলেন জামায়াতের এই নেতা।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাজধানীর শান্তিনগরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ শেষে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তিনি অভিযোগ করেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও একটি ‘গুপ্ত দল’ যৌথভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, পরাজিত শক্তি ও ওই দলের আচরণ এবং কথাবার্তায় মিল রয়েছে। অতীতের মতো এখনো তারা বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেওয়ার বক্তব্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তবে রিজভীও তাঁর বক্তব্যে অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি বা বিস্তারিত প্রমাণ জনসমক্ষে তুলে ধরেননি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও দুই দলের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সমর্থন আদায় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার অভিযোগ উঠেছিল।

সে সময় বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির জন্য তদবিরের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কোনো কোনো এলাকায় নির্বাচনী জনসভায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।

নির্বাচনের পর কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার খবর প্রকাশিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতে এসব কার্যালয় খোলার ঘটনাও ঘটে। পরবর্তী সময়ে বিএনপির একাংশের নেতাকর্মী ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিবাদের মুখে কয়েকটি কার্যালয় আবার বন্ধ হয়ে যায়।

এ ছাড়া বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের কয়েকজন কারাবন্দি নেতাকর্মীর জামিনে মুক্তি এবং আত্মগোপনে থাকা কারও কারও প্রকাশ্যে আসার ঘটনাও রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। তবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে দলীয় পর্যায়ে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। জামিনের বিষয়টি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং প্রতিটি ঘটনার নিজস্ব আইনি প্রেক্ষাপট রয়েছে।

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল, কথিত লকডাউন কর্মসূচি, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনার পর দলটির সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে সরকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের তৎপরতা, অর্থায়ন এবং বিভিন্ন আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের ক্ষেত্রে পৃথকভাবে তথ্যপ্রমাণ যাচাই করা জরুরি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্তের প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ অবস্থায় দলটির তৎপরতা মোকাবিলায় সরকারের আইনানুগ পদক্ষেপ যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডেও দায়িত্বশীলতা থাকা জরুরি।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলেছেন। সুতরাং বিষয়টি পরিষ্কার করতে হলে সেই তথ্যের ভিত্তি ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যথাযথ প্রক্রিয়ায় সামনে আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিরোধী দলেরও পাল্টা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।

তাঁর মতে, সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগের রাজনীতি চালিয়ে গেলে পতিত আওয়ামী লীগ সেই রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিতে পারে। এতে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক ফজল মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য কতটা গভীর ও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে এসব বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে দোষারোপের রাজনীতি চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে বিতাড়িত রাজনৈতিক শক্তি। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সংযত হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ইস্যুটি এখন কেবল একটি দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়; এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

একদিকে সরকারের দায়িত্ব, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। অন্যদিকে বিরোধী দলের দায়িত্ব, সরকারের ভুলনীতি ও ব্যর্থতার সমালোচনা করা এবং জনগণের স্বার্থে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা করা। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি শ্রমিক অসন্তোষকে ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক অভিযোগ আর প্রমাণ এক নয়। কোনো দলের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ উঠলে তার পক্ষে তথ্যপ্রমাণ থাকা প্রয়োজন। একইভাবে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলে সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আইনানুগ যাচাইয়ের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যথায় বিএনপি ও জামায়াতের পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সংঘাতের সুযোগে আওয়ামী লীগসহ পতিত রাজনৈতিক শক্তি নতুন করে সংগঠিত হওয়ার রাজনৈতিক পরিসর পেতে পারে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেয়ে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি সুদৃঢ় করা এখন অনেক বেশি জরুরি। কারণ ক্ষমতার পালাবদল রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও জনগণের নিরাপত্তা কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, সরকারের সমালোচনা হবে, বিরোধী দল তার দায়িত্ব পালন করবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যখন পারস্পরিক অবিশ্বাস, দোষারোপ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তখন তার সুযোগ নেয় গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী—দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে যাদের অভিন্ন সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, তাদের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক দূরত্ব কোনোভাবেই দেশের জন্য ইতিবাচক নয়। বিশেষত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দুই পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।

সরকার ও বিরোধী দল যদি একে অপরকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে ব্যস্ত রাখে, তাহলে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার পরিবর্তে তাদেরই পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক বিভাজন যত গভীর হবে, পতিত শক্তির জন্য ততই সুযোগ বাড়বে।

এ কারণে এখন সময় এসেছে পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার। সরকারের উচিত বিরোধী দলের ন্যায্য সমালোচনা ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির প্রতি সহনশীল থাকা। অন্যদিকে বিরোধী দলেরও উচিত রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়া।

বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ন্যূনতম বোঝাপড়া থাকা জরুরি। আওয়ামী লীগের অতীত শাসন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে একটি নীতিগত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।

কারণ, ক্ষমতার রাজনীতিতে কে জয়ী হলো, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—বাংলাদেশের গণতন্ত্র কতটা নিরাপদ থাকল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে গিয়ে যেন পতিত স্বৈরাচারী শক্তির ফিরে আসার পথ তৈরি না হয়।