Dhaka ০৭:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টার্গেট কিলিং: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গুপ্ত নেটওয়ার্ক !

একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে ভেসে আসা এই হুমকিসদৃশ বাক্যটি কেবল রাজনৈতিক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা? প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, গোপন ডিজিটাল যোগাযোগ এবং অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ ঘিরে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কথিত ফোনালাপে গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠসদৃশ একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের টিম রেডি, রাজধানীতে রাতে মানুষ ঘুমাতে পারবে না।’ এর ভাষা, কথিত সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত আরও কিছু বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এরপর সময় গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, মাগুরা ও খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কোথাও সাংবাদিককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা, আবার কোথাও অপরাধী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে প্রাণহানি।

একটি হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে। দ্বিতীয়টি কাকতালীয়ও হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দেয়—ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে কি না?

এরই মধ্যে সামনে এসেছে আরও একটি অনুসন্ধানের বিষয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কথিত গোপন যোগাযোগ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অর্থ সংগ্রহ, বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল প্রচারণার অভিযোগ।

কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে কথিত নেটওয়ার্কের কোনো যোগসূত্র আছে কি? রাজনৈতিক হুমকির ভাষ্য কি নিছক বক্তব্য, নাকি এর পেছনে ছিল কোনো সংগঠিত প্রস্তুতি? অর্থের উৎস কোথায়, কারা এর নিয়ন্ত্রক, আর মাঠপর্যায়ে কারা সক্রিয়?

গত ১২ অক্টোবর রাজধানীতে অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগে মামলা হয়েছে।

মামলার এজাহার ও পুলিশের রিমান্ড আবেদনে উঠে এসেছে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের নাম। তদন্তকারীদের দাবি, এসব গ্রুপের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ, যোগাযোগ রক্ষা এবং উসকানিমূলক প্রচারণা পরিচালিত হতো।

গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজে স্থানীয় অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন।

এর আগে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বরও তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি নিরাপত্তা চেয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের রাতে উত্তরাইল বাজারে একটি দোকানের সামনে অবস্থানকালে মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করছে। স্থানীয় অপরাধ, চোরাচালান ও সংশ্লিষ্ট চক্র নিয়ে তাঁর সাংবাদিকতার সঙ্গে হত্যার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশন (আইএফজে) হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।

পরদিন, ১৬ অক্টোবর রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের অলিনগর এলাকায় সশস্ত্র হামলায় নিহত হন যুবদলকর্মী তারেক হোসেন বাপ্পী। এ ঘটনায় তাফসির আলম শাওন নামে আরেক যুবক আহত হন।

পুলিশের ভাষ্য, হামলাকারীরা আগে থেকেই সেখানে অবস্থান নিয়েছিল। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার এবং তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।

১২ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সাঈদ আলী। পুলিশ তাঁকে একাধিক মামলার আসামি ও তালিকাভুক্ত অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করেছে। পুলিশের দাবি, অপরাধী গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

২১ অক্টোবর রাতে একই জেলার সোনারগাঁয়ের চরকিশোরগঞ্জ এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা ফকির জহির রহমানকে। তিনি আড়াইহাজার উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ছিলেন।

ফার্মেসি বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ উঠেছে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ এবং হামলাকারীদের পরিচয় এখনো তদন্তাধীন।

২২ অক্টোবর মাগুরা শহরের বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টারে পাওয়া যায় পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সাখের হোসেনের মরদেহ। তাঁর মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরিবারের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।

একই দিন ভোরে খুলনা নগরের পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় গুলিতে নিহত হন তাওহিদুল ইসলাম তুষার। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি একটি অপরাধী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ১২ অক্টোবর রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁরা হলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা।

রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগে করা মামলায় আদালত তাঁদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ১৬ অক্টোবর তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার এজাহার ও পুলিশের রিমান্ড আবেদনের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার দুই কর্মকর্তার সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের গড়ে তোলা ‘Unity Care’ ও ‘Public Parliament’ নামের দুটি প্ল্যাটফর্মের যোগাযোগ ছিল।

তদন্তকারীদের দাবি, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হতো।

পুলিশের অভিযোগে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ।

মামলার এজাহার ও পুলিশের রিমান্ড আবেদনে গ্রুপ দুটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে—

১. Bangladesh Awami League Supporters Alpha Number #1

২. BBM Transparency

পুলিশের অভিযোগ, গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা এসব গ্রুপ ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করতেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী প্রচারণা এবং অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এসব তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।

পুলিশের রিমান্ড আবেদনে ‘KalAjkal.com’ নামের একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে উসকানিমূলক কনটেন্ট প্রচারের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু নেতার বিদেশে অবস্থান এবং সেখান থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনার অভিযোগও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশবিষয়ক রাজনৈতিক পরিস্থিতি-সংক্রান্ত তথ্যপত্রে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ঘটনার বিবরণ উদ্ধৃত হয়েছে।

সেখানে গোয়েন্দা পুলিশের বরাতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ভারত থেকে হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবারের মাধ্যমে সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনার নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ সহায়তা পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।

একই তথ্যপত্রে ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আওয়ামী লীগের এক স্থানীয় নেতাকে গ্রেপ্তারের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে চারটি ককটেল উদ্ধারের কথা জানানো হয়।

৭ অক্টোবর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য বেআইনি তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক করেন। তিনি জানান, এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। এসব তথ্যের মধ্য দিয়ে বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেশের ভেতরের যোগাযোগ এবং কথিত অর্থায়নের বিষয়টি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ত্রৈমাসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন দেশের সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসে সারা দেশে ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং অন্তত ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন।

রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর পৃথক ২৩টি হামলায় আরও ১৪ জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় বিএনপির ১০ জন, আওয়ামী লীগের দুজন, জামায়াতের একজন এবং অন্য একটি রাজনৈতিক দলের একজন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ৪২ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

এখানেই শেষ নয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক বিরোধ ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ৫১টি ঘটনায় অন্তত ১৫৩টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

এইচআরএসএসের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক মাসে সারা দেশে অন্তত ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চারজন নিহত এবং ৫২৭ জন আহত হয়েছেন।

১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ ও সংস্থাটির নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এসব তথ্য সংকলন করা হয়েছে।

গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজধানী থেকে সীমান্তবর্তী জেলা, উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল—বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, সশস্ত্র হামলা, হত্যাকাণ্ড, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দলীয় কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং অপরাধী গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বসহ একাধিক কারণ রয়েছে।

সহিংসতার প্রকৃত চিত্র নিরূপণে কেবল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ যথেষ্ট নয়। অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ, নদী-খাল ও পরিত্যক্ত স্থানে লাশ উদ্ধার, হাত-পা বাঁধা মরদেহ এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত ব্যক্তিদের ঘটনাও অপরাধতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের আওতায় আনা প্রয়োজন।

এইচআরএসএসের সেপ্টেম্বরের পর্যবেক্ষণে সারাদেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৬৬টি ঘটনায় ৬৯টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি মরদেহ ছিল বস্তাবন্দি, ২৪টি ঝুলন্ত অবস্থায়, আটটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন এবং ছয়টি গলাকাটা অবস্থায় পাওয়া যায়।

পরিসংখ্যানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে—দেশের সহিংসতার চিত্র একমাত্র কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষের কর্মকাণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের পর তদন্তের পরিধি কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। বরং দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ‘Unity Care’ ও ‘Public Parliament’ নামের প্ল্যাটফর্ম, কথিত অর্থ সংগ্রহ এবং বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলোও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড এবং রাজধানীতে দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার গ্রেপ্তার—দুটি ঘটনাপ্রবাহ আপাতত পাশাপাশি অবস্থান করছে। গোয়েন্দা তদন্তের সামনে তাই কাজটি দ্বিমুখী—একদিকে হত্যাকাণ্ডগুলোর প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা, অন্যদিকে ডিজিটাল যোগাযোগ ও অর্থায়নের সাথে কে কে জড়িত এবং দেশের  ভেতরে কার মাধ্যমে আওয়ামী নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

এইচএসসিতে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ; অকৃতকার্য প্রায় ৬ লাখ

টার্গেট কিলিং: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গুপ্ত নেটওয়ার্ক !

Update Time : ১১:০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে ভেসে আসা এই হুমকিসদৃশ বাক্যটি কেবল রাজনৈতিক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা? প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, গোপন ডিজিটাল যোগাযোগ এবং অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ ঘিরে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কথিত ফোনালাপে গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠসদৃশ একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের টিম রেডি, রাজধানীতে রাতে মানুষ ঘুমাতে পারবে না।’ এর ভাষা, কথিত সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত আরও কিছু বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এরপর সময় গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, মাগুরা ও খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কোথাও সাংবাদিককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা, আবার কোথাও অপরাধী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে প্রাণহানি।

একটি হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে। দ্বিতীয়টি কাকতালীয়ও হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দেয়—ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে কি না?

এরই মধ্যে সামনে এসেছে আরও একটি অনুসন্ধানের বিষয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কথিত গোপন যোগাযোগ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অর্থ সংগ্রহ, বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল প্রচারণার অভিযোগ।

কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে কথিত নেটওয়ার্কের কোনো যোগসূত্র আছে কি? রাজনৈতিক হুমকির ভাষ্য কি নিছক বক্তব্য, নাকি এর পেছনে ছিল কোনো সংগঠিত প্রস্তুতি? অর্থের উৎস কোথায়, কারা এর নিয়ন্ত্রক, আর মাঠপর্যায়ে কারা সক্রিয়?

গত ১২ অক্টোবর রাজধানীতে অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগে মামলা হয়েছে।

মামলার এজাহার ও পুলিশের রিমান্ড আবেদনে উঠে এসেছে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের নাম। তদন্তকারীদের দাবি, এসব গ্রুপের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ, যোগাযোগ রক্ষা এবং উসকানিমূলক প্রচারণা পরিচালিত হতো।

গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজে স্থানীয় অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন।

এর আগে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বরও তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি নিরাপত্তা চেয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের রাতে উত্তরাইল বাজারে একটি দোকানের সামনে অবস্থানকালে মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করছে। স্থানীয় অপরাধ, চোরাচালান ও সংশ্লিষ্ট চক্র নিয়ে তাঁর সাংবাদিকতার সঙ্গে হত্যার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশন (আইএফজে) হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।

পরদিন, ১৬ অক্টোবর রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের অলিনগর এলাকায় সশস্ত্র হামলায় নিহত হন যুবদলকর্মী তারেক হোসেন বাপ্পী। এ ঘটনায় তাফসির আলম শাওন নামে আরেক যুবক আহত হন।

পুলিশের ভাষ্য, হামলাকারীরা আগে থেকেই সেখানে অবস্থান নিয়েছিল। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার এবং তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।

১২ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সাঈদ আলী। পুলিশ তাঁকে একাধিক মামলার আসামি ও তালিকাভুক্ত অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করেছে। পুলিশের দাবি, অপরাধী গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

২১ অক্টোবর রাতে একই জেলার সোনারগাঁয়ের চরকিশোরগঞ্জ এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা ফকির জহির রহমানকে। তিনি আড়াইহাজার উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ছিলেন।

ফার্মেসি বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ উঠেছে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ এবং হামলাকারীদের পরিচয় এখনো তদন্তাধীন।

২২ অক্টোবর মাগুরা শহরের বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টারে পাওয়া যায় পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সাখের হোসেনের মরদেহ। তাঁর মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরিবারের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।

একই দিন ভোরে খুলনা নগরের পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় গুলিতে নিহত হন তাওহিদুল ইসলাম তুষার। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি একটি অপরাধী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ১২ অক্টোবর রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁরা হলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা।

রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগে করা মামলায় আদালত তাঁদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ১৬ অক্টোবর তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার এজাহার ও পুলিশের রিমান্ড আবেদনের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার দুই কর্মকর্তার সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের গড়ে তোলা ‘Unity Care’ ও ‘Public Parliament’ নামের দুটি প্ল্যাটফর্মের যোগাযোগ ছিল।

তদন্তকারীদের দাবি, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হতো।

পুলিশের অভিযোগে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ।

মামলার এজাহার ও পুলিশের রিমান্ড আবেদনে গ্রুপ দুটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে—

১. Bangladesh Awami League Supporters Alpha Number #1

২. BBM Transparency

পুলিশের অভিযোগ, গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা এসব গ্রুপ ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করতেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী প্রচারণা এবং অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এসব তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।

পুলিশের রিমান্ড আবেদনে ‘KalAjkal.com’ নামের একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে উসকানিমূলক কনটেন্ট প্রচারের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু নেতার বিদেশে অবস্থান এবং সেখান থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনার অভিযোগও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশবিষয়ক রাজনৈতিক পরিস্থিতি-সংক্রান্ত তথ্যপত্রে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ঘটনার বিবরণ উদ্ধৃত হয়েছে।

সেখানে গোয়েন্দা পুলিশের বরাতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ভারত থেকে হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবারের মাধ্যমে সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনার নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ সহায়তা পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।

একই তথ্যপত্রে ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আওয়ামী লীগের এক স্থানীয় নেতাকে গ্রেপ্তারের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে চারটি ককটেল উদ্ধারের কথা জানানো হয়।

৭ অক্টোবর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য বেআইনি তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক করেন। তিনি জানান, এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। এসব তথ্যের মধ্য দিয়ে বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেশের ভেতরের যোগাযোগ এবং কথিত অর্থায়নের বিষয়টি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ত্রৈমাসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন দেশের সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসে সারা দেশে ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং অন্তত ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন।

রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর পৃথক ২৩টি হামলায় আরও ১৪ জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় বিএনপির ১০ জন, আওয়ামী লীগের দুজন, জামায়াতের একজন এবং অন্য একটি রাজনৈতিক দলের একজন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ৪২ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

এখানেই শেষ নয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক বিরোধ ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ৫১টি ঘটনায় অন্তত ১৫৩টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

এইচআরএসএসের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক মাসে সারা দেশে অন্তত ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চারজন নিহত এবং ৫২৭ জন আহত হয়েছেন।

১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ ও সংস্থাটির নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এসব তথ্য সংকলন করা হয়েছে।

গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজধানী থেকে সীমান্তবর্তী জেলা, উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল—বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, সশস্ত্র হামলা, হত্যাকাণ্ড, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দলীয় কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং অপরাধী গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বসহ একাধিক কারণ রয়েছে।

সহিংসতার প্রকৃত চিত্র নিরূপণে কেবল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ যথেষ্ট নয়। অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ, নদী-খাল ও পরিত্যক্ত স্থানে লাশ উদ্ধার, হাত-পা বাঁধা মরদেহ এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত ব্যক্তিদের ঘটনাও অপরাধতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের আওতায় আনা প্রয়োজন।

এইচআরএসএসের সেপ্টেম্বরের পর্যবেক্ষণে সারাদেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৬৬টি ঘটনায় ৬৯টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি মরদেহ ছিল বস্তাবন্দি, ২৪টি ঝুলন্ত অবস্থায়, আটটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন এবং ছয়টি গলাকাটা অবস্থায় পাওয়া যায়।

পরিসংখ্যানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে—দেশের সহিংসতার চিত্র একমাত্র কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষের কর্মকাণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের পর তদন্তের পরিধি কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। বরং দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ‘Unity Care’ ও ‘Public Parliament’ নামের প্ল্যাটফর্ম, কথিত অর্থ সংগ্রহ এবং বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলোও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড এবং রাজধানীতে দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার গ্রেপ্তার—দুটি ঘটনাপ্রবাহ আপাতত পাশাপাশি অবস্থান করছে। গোয়েন্দা তদন্তের সামনে তাই কাজটি দ্বিমুখী—একদিকে হত্যাকাণ্ডগুলোর প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা, অন্যদিকে ডিজিটাল যোগাযোগ ও অর্থায়নের সাথে কে কে জড়িত এবং দেশের  ভেতরে কার মাধ্যমে আওয়ামী নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে ।