Dhaka ০৯:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৯ বছরের রহস্যে নতুন মোড়: সালমান শাহ কি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি পরিকল্পিত হত্যার শিকার?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু মৃত্যু শুধু মৃত্যু হয়ে থাকে না। সময়ের সঙ্গে তা রহস্যে পরিণত হয়। চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যু তেমনই এক রহস্য, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহর। প্রথমে ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর একাধিক পর্যায়ে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরিবার সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি।

২৯ বছর পর সেই পুরোনো রহস্যে আসে বড় মোড়। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরদিন, ২১ অক্টোবর, তার মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।

এখন সেই মামলার তদন্তও যেন আরেক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম। ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সর্বশেষ ৩০ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন। এর আগে একাধিকবার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পেছানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় তিন দশক পর যে প্রশ্নটি নতুন করে আদালতের সামনে এসেছে, তার উত্তর পাওয়ার অপেক্ষাও এখনো শেষ হয়নি।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। তখন সালমান শাহ বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকাদের একজন। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি দর্শকের মধ্যে এমন উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন, যা বাংলা সিনেমায় বিরল।

সেদিন নিউ ইস্কাটনের বাসায় তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের পক্ষের বর্তমান মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সালমানের মা নীলা চৌধুরী, বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং পরিবারের সদস্যরা বাসায় গিয়ে তাকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তার শরীরে ও গলায় কিছু দাগ পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ তৈরি করে।

তবে এসব অভিযোগ বর্তমান হত্যা মামলার এজাহারে উত্থাপিত বক্তব্য। এগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত কোনো ঘটনা নয়। মামলার তদন্তেই নির্ধারিত হবে অভিযোগগুলোর আইনগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী।

সালমানকে প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর রমনা থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়।

সালমান শাহর মৃত্যুর পর তদন্ত থেমে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে তদন্তের ধরন বদলেছে। বিচার বিভাগীয় তদন্তও হয়েছে। ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ে। সেই প্রতিবেদনেও মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এরপর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন। পরবর্তী সময়ে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের—পিবিআই—তদন্তেও যায়।

২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেই প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন।

কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ হয়নি।

সালমান শাহর পরিবার পিবিআইয়ের সিদ্ধান্তও মেনে নেয়নি। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিশন করা হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালত আগের অবস্থানকে নতুন করে পর্যালোচনার পথ খুলে দেন এবং অপমৃত্যুর মামলা হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।

২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর রমনা থানায় দায়ের করা মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সামীরা হক, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুসি, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ডেবিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

তদন্তের স্বার্থে মামলার কয়েকজন আসামির বিদেশযাত্রার ওপরও আদালত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর সামীরা হক ও আশরাফুল হক ডনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এর আগে ২৯ অক্টোবর লতিফা হক লুসির দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।

নতুন হত্যা মামলার তদন্ত শুরু হওয়ার পরও প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় কয়েক দফা পেছানো হয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য হলেও তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি। প্রথমে ১৩ জানুয়ারি, পরে ২২ ফেব্রুয়ারি, ৯ এপ্রিল, ১৪ মে, ২৩ জুন এবং সর্বশেষ ৩০ আগস্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

২৩ জুলাই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা ৩০ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। এখন তাই মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দিন ৩০ আগস্ট।

সালমান শাহ মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই।

আগের তদন্তগুলো মূলত তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখেছে। পিবিআইয়ের ২০২০ সালের তদন্তও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। বিপরীতে পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি; তাকে হত্যা করা হয়েছে।

২০২৫ সালে আদালতের আদেশের পর সেই অভিযোগ আর শুধু পারিবারিক দাবি হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এটি একটি আনুষ্ঠানিক হত্যা মামলার তদন্তের বিষয়।

ফলে নতুন তদন্তের সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে।

সালমান শাহ কীভাবে মারা গেলেন?

মৃত্যুর আগে ও পরে ঘটনাস্থলে কারা ছিলেন?

তার শরীরে পাওয়া চিহ্নগুলোর প্রকৃতি কী ছিল?

আগের তদন্তের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নতুন অভিযোগের কোনো মৌলিক বিরোধ আছে কি না?

ঘটনার সঙ্গে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্য ও ভূমিকার মধ্যে কোনো অসঙ্গতি আছে কি না?

এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মৃত্যুটি আত্মহত্যা হলে তার পক্ষে কী প্রমাণ আছে, আর হত্যা হলে হত্যার পক্ষে কী নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নতুন তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করবে।

২৯ বছর পর একটি হত্যার অভিযোগের তদন্ত করা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন। সময়ের সঙ্গে সাক্ষীদের স্মৃতি দুর্বল হতে পারে। কেউ মারা যেতে পারেন। কোনো নথি বা আলামত হারিয়ে যেতে পারে। প্রযুক্তিগত তদন্তের সুযোগও ১৯৯৬ সালে আজকের মতো ছিল না।

তাই নতুন তদন্তের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—পুরোনো নথি, মেডিকেল ও ফরেনসিক তথ্য, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য এবং আগের তদন্ত প্রতিবেদনগুলোকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে নতুন করে মূল্যায়ন করা।

বিশেষ করে আগের তদন্তে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছিল এবং বর্তমান হত্যা মামলায় যে অভিযোগ করা হয়েছে—এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য কোথায়, সেটি স্পষ্ট করা জরুরি।

কারণ নতুন তদন্ত যদি কেবল পুরোনো অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে প্রশ্ন থেকে যাবে। আবার আগের তদন্তের সিদ্ধান্তকে কেবল অস্বীকার করলেও চলবে না। প্রয়োজন এমন প্রমাণ, যা আদালতে যাচাইযোগ্য।

সালমান শাহর জনপ্রিয়তা তার মৃত্যুর রহস্যকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র অভিনেতা ছিলেন না; নব্বইয়ের দশকের একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছিলেন।

তার মৃত্যুর পরও তার চলচ্চিত্র, পোশাক, অভিনয় এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে আলোচনা থামেনি। একই সঙ্গে মৃত্যুর কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা। কিন্তু জনমনে প্রচলিত গল্প আর আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এক বিষয় নয়।

এই পার্থক্যটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু বছর ধরে নানা তত্ত্ব ঘুরেছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সন্দেহ করা হয়েছে। কিন্তু আইনগতভাবে কোনো ব্যক্তিকে হত্যাকারী বলতে হলে আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালতে দিন নির্ধারিত রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা প্রতিবেদন দিলে মামলাটি নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করবে।

তদন্তে যদি অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে মামলাটি অভিযোগপত্রের দিকে এগোতে পারে। আর তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত না হলে তদন্ত প্রতিবেদনে তার প্রতিফলন থাকবে। এরপর আদালত সেই প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট আইনগত বিষয় বিবেচনা করবেন।

অর্থাৎ ৩০ আগস্ট কোনোভাবেই আগাম রায় নয়। এটি তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

তবু দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রায় তিন দশক ধরে যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সালমান শাহর পরিবার ও অসংখ্য ভক্ত, সেই প্রশ্নের আইনগত অনুসন্ধান এখন নতুন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সালমান শাহ চলে গেছেন ১৯৯৬ সালে। কিন্তু তার মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্নটি যায়নি।

একদিকে আছে আগের তদন্তের সিদ্ধান্ত—মৃত্যু আত্মহত্যা। অন্যদিকে আছে পরিবারের দীর্ঘদিনের দাবি—সালমান শাহ হত্যার শিকার।

২০২৫ সালের আদালতের আদেশ সেই দ্বন্দ্বকে আবার বিচারিক কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে এনেছে। ২০২৬ সালে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার অপেক্ষা সেই প্রক্রিয়াকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

এখন প্রয়োজন আবেগ নয়, প্রমাণ। প্রয়োজন গুজব নয়, নথি। প্রয়োজন কাউকে আগে থেকেই অপরাধী বানানো নয়, বরং ঘটনার প্রতিটি স্তর নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা।

কারণ সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের শেষ কথা কোনো জনশ্রুতি হতে পারে না।

শেষ কথা হতে হবে প্রমাণের।

আর সেই প্রমাণ যদি বলে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, সেটিও মেনে নিতে হবে। যদি প্রমাণ করে তাকে হত্যা করা হয়েছিল, তবে হত্যার বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রায় তিন দশক ধরে ঝুলে থাকা এই প্রশ্নের সবচেয়ে ন্যায়সংগত উত্তর একটিই—

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কোরআনের বিধান বাস্তবায়নে সংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আমির হামজা, টানলেন সোলায়মান (আ.) ও রানি বিলকিসের ঘটনা

২৯ বছরের রহস্যে নতুন মোড়: সালমান শাহ কি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি পরিকল্পিত হত্যার শিকার?

Update Time : ১০:১২:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু মৃত্যু শুধু মৃত্যু হয়ে থাকে না। সময়ের সঙ্গে তা রহস্যে পরিণত হয়। চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যু তেমনই এক রহস্য, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহর। প্রথমে ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর একাধিক পর্যায়ে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরিবার সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি।

২৯ বছর পর সেই পুরোনো রহস্যে আসে বড় মোড়। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরদিন, ২১ অক্টোবর, তার মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।

এখন সেই মামলার তদন্তও যেন আরেক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম। ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সর্বশেষ ৩০ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন। এর আগে একাধিকবার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পেছানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় তিন দশক পর যে প্রশ্নটি নতুন করে আদালতের সামনে এসেছে, তার উত্তর পাওয়ার অপেক্ষাও এখনো শেষ হয়নি।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। তখন সালমান শাহ বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকাদের একজন। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি দর্শকের মধ্যে এমন উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন, যা বাংলা সিনেমায় বিরল।

সেদিন নিউ ইস্কাটনের বাসায় তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের পক্ষের বর্তমান মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সালমানের মা নীলা চৌধুরী, বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং পরিবারের সদস্যরা বাসায় গিয়ে তাকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তার শরীরে ও গলায় কিছু দাগ পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ তৈরি করে।

তবে এসব অভিযোগ বর্তমান হত্যা মামলার এজাহারে উত্থাপিত বক্তব্য। এগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত কোনো ঘটনা নয়। মামলার তদন্তেই নির্ধারিত হবে অভিযোগগুলোর আইনগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী।

সালমানকে প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর রমনা থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়।

সালমান শাহর মৃত্যুর পর তদন্ত থেমে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে তদন্তের ধরন বদলেছে। বিচার বিভাগীয় তদন্তও হয়েছে। ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ে। সেই প্রতিবেদনেও মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এরপর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন। পরবর্তী সময়ে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের—পিবিআই—তদন্তেও যায়।

২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেই প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন।

কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ হয়নি।

সালমান শাহর পরিবার পিবিআইয়ের সিদ্ধান্তও মেনে নেয়নি। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিশন করা হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালত আগের অবস্থানকে নতুন করে পর্যালোচনার পথ খুলে দেন এবং অপমৃত্যুর মামলা হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।

২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর রমনা থানায় দায়ের করা মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সামীরা হক, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুসি, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ডেবিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

তদন্তের স্বার্থে মামলার কয়েকজন আসামির বিদেশযাত্রার ওপরও আদালত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর সামীরা হক ও আশরাফুল হক ডনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এর আগে ২৯ অক্টোবর লতিফা হক লুসির দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।

নতুন হত্যা মামলার তদন্ত শুরু হওয়ার পরও প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় কয়েক দফা পেছানো হয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য হলেও তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি। প্রথমে ১৩ জানুয়ারি, পরে ২২ ফেব্রুয়ারি, ৯ এপ্রিল, ১৪ মে, ২৩ জুন এবং সর্বশেষ ৩০ আগস্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

২৩ জুলাই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা ৩০ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। এখন তাই মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দিন ৩০ আগস্ট।

সালমান শাহ মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই।

আগের তদন্তগুলো মূলত তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখেছে। পিবিআইয়ের ২০২০ সালের তদন্তও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। বিপরীতে পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি; তাকে হত্যা করা হয়েছে।

২০২৫ সালে আদালতের আদেশের পর সেই অভিযোগ আর শুধু পারিবারিক দাবি হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এটি একটি আনুষ্ঠানিক হত্যা মামলার তদন্তের বিষয়।

ফলে নতুন তদন্তের সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে।

সালমান শাহ কীভাবে মারা গেলেন?

মৃত্যুর আগে ও পরে ঘটনাস্থলে কারা ছিলেন?

তার শরীরে পাওয়া চিহ্নগুলোর প্রকৃতি কী ছিল?

আগের তদন্তের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নতুন অভিযোগের কোনো মৌলিক বিরোধ আছে কি না?

ঘটনার সঙ্গে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্য ও ভূমিকার মধ্যে কোনো অসঙ্গতি আছে কি না?

এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মৃত্যুটি আত্মহত্যা হলে তার পক্ষে কী প্রমাণ আছে, আর হত্যা হলে হত্যার পক্ষে কী নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নতুন তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করবে।

২৯ বছর পর একটি হত্যার অভিযোগের তদন্ত করা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন। সময়ের সঙ্গে সাক্ষীদের স্মৃতি দুর্বল হতে পারে। কেউ মারা যেতে পারেন। কোনো নথি বা আলামত হারিয়ে যেতে পারে। প্রযুক্তিগত তদন্তের সুযোগও ১৯৯৬ সালে আজকের মতো ছিল না।

তাই নতুন তদন্তের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—পুরোনো নথি, মেডিকেল ও ফরেনসিক তথ্য, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য এবং আগের তদন্ত প্রতিবেদনগুলোকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে নতুন করে মূল্যায়ন করা।

বিশেষ করে আগের তদন্তে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছিল এবং বর্তমান হত্যা মামলায় যে অভিযোগ করা হয়েছে—এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য কোথায়, সেটি স্পষ্ট করা জরুরি।

কারণ নতুন তদন্ত যদি কেবল পুরোনো অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে প্রশ্ন থেকে যাবে। আবার আগের তদন্তের সিদ্ধান্তকে কেবল অস্বীকার করলেও চলবে না। প্রয়োজন এমন প্রমাণ, যা আদালতে যাচাইযোগ্য।

সালমান শাহর জনপ্রিয়তা তার মৃত্যুর রহস্যকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র অভিনেতা ছিলেন না; নব্বইয়ের দশকের একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছিলেন।

তার মৃত্যুর পরও তার চলচ্চিত্র, পোশাক, অভিনয় এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে আলোচনা থামেনি। একই সঙ্গে মৃত্যুর কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা। কিন্তু জনমনে প্রচলিত গল্প আর আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এক বিষয় নয়।

এই পার্থক্যটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু বছর ধরে নানা তত্ত্ব ঘুরেছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সন্দেহ করা হয়েছে। কিন্তু আইনগতভাবে কোনো ব্যক্তিকে হত্যাকারী বলতে হলে আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালতে দিন নির্ধারিত রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা প্রতিবেদন দিলে মামলাটি নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করবে।

তদন্তে যদি অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে মামলাটি অভিযোগপত্রের দিকে এগোতে পারে। আর তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত না হলে তদন্ত প্রতিবেদনে তার প্রতিফলন থাকবে। এরপর আদালত সেই প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট আইনগত বিষয় বিবেচনা করবেন।

অর্থাৎ ৩০ আগস্ট কোনোভাবেই আগাম রায় নয়। এটি তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

তবু দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রায় তিন দশক ধরে যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সালমান শাহর পরিবার ও অসংখ্য ভক্ত, সেই প্রশ্নের আইনগত অনুসন্ধান এখন নতুন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সালমান শাহ চলে গেছেন ১৯৯৬ সালে। কিন্তু তার মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্নটি যায়নি।

একদিকে আছে আগের তদন্তের সিদ্ধান্ত—মৃত্যু আত্মহত্যা। অন্যদিকে আছে পরিবারের দীর্ঘদিনের দাবি—সালমান শাহ হত্যার শিকার।

২০২৫ সালের আদালতের আদেশ সেই দ্বন্দ্বকে আবার বিচারিক কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে এনেছে। ২০২৬ সালে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার অপেক্ষা সেই প্রক্রিয়াকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

এখন প্রয়োজন আবেগ নয়, প্রমাণ। প্রয়োজন গুজব নয়, নথি। প্রয়োজন কাউকে আগে থেকেই অপরাধী বানানো নয়, বরং ঘটনার প্রতিটি স্তর নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা।

কারণ সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের শেষ কথা কোনো জনশ্রুতি হতে পারে না।

শেষ কথা হতে হবে প্রমাণের।

আর সেই প্রমাণ যদি বলে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, সেটিও মেনে নিতে হবে। যদি প্রমাণ করে তাকে হত্যা করা হয়েছিল, তবে হত্যার বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রায় তিন দশক ধরে ঝুলে থাকা এই প্রশ্নের সবচেয়ে ন্যায়সংগত উত্তর একটিই—