Dhaka ০৬:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পিচ্চি রাজা পালাননি, প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়

গাজীপুর প্রতিনিধি:দৈনিক প্রান্তিক।

‘পিচ্চি রাজা’ প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাননি—তাকে পুলিশই প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে অপেক্ষমাণ একটি প্রাইভেটকারে তুলে দিয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় তিনি শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে দৌড়ে পালিয়েছেন—এমন একটি ঘটনা সাজানো হয় বলে জানিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি)।

ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পর পুলিশের তদন্তে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে জানানো হয়েছিল, ঢাকার আদালত থেকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফেরার পথে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় প্রিজন ভ্যান থামিয়ে পিচ্চি রাজাকে শৌচাগারে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তিনি দৌড়ে পালিয়ে যান। সেই ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল।তদন্তে ওই প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনার বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জিএমপির তদন্ত অনুযায়ী, ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলা জজ আদালত থেকে ৩০ আসামিকে নিয়ে প্রিজন ভ্যানটি কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের দিকে ফিরছিল। পথে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছে ভ্যানটি থামানো হয়।

সেখানে প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস চালক নায়েক কামাল হোসেনের কাছ থেকে ভ্যানের চাবি নেন। এরপর পিচ্চি রাজা ও আরেক হাজতি খাইরুল বাশারকে ভ্যান থেকে নামানো হয়। খাইরুল বাশারকে চালকের পাশের আসনে বসানো হলেও পিচ্চি রাজাকে আর ভ্যানে তোলা হয়নি।

পুলিশের তদন্তে বলা হয়েছে, সেখানে আগে থেকেই একটি প্রাইভেটকার অপেক্ষা করছিল। এসআই প্রবীর কুমার পিচ্চি রাজাকে ওই গাড়িতে তুলে দিতে সহায়তা করেন। এরপর তিনি প্রিজন ভ্যানে ফিরে না গিয়ে পরে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় গিয়ে আবার ভ্যানের সঙ্গে যুক্ত হন।

এরপরই তৈরি করা হয় পিচ্চি রাজার ‘পালিয়ে যাওয়ার’ গল্প—এমনটাই জানিয়েছে জিএমপি।

তদন্তের পর প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজেও তাঁতীবাজার এলাকায় প্রিজন ভ্যান থামিয়ে কয়েকজনকে নামানোর দৃশ্য পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, পিচ্চি রাজা ও আরেক হাজতিকে ভ্যান থেকে নামানোর পর তিনি একটি অপেক্ষমাণ গাড়িতে চলে যান। পরে প্রিজন ভ্যানটি তাঁকে ছাড়াই গন্তব্যের দিকে যায়।

জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারের ভাষ্য অনুযায়ী, পিচ্চি রাজাকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে ৬০ হাজার টাকা উদ্ধারের কথাও পুলিশ জানিয়েছে। তবে ওই অর্থের সঙ্গে পিচ্চি রাজাকে ছেড়ে দেওয়ার সরাসরি সম্পর্ক কী—তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন এবং পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আগে দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিল পুলিশ।

পরে গাজীপুরের আদালত গ্রেপ্তার তিনজনের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্ত কর্মকর্তারা তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পিচ্চি রাজাকে ছেড়ে দেওয়ার পেছনে আর কারা জড়িত এবং কী কারণে তাঁকে পুলিশি হেফাজত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখছেন।

ঘটনার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে এখানেই। প্রথমে যে ঘটনাটি ছিল—‘পিচ্চি রাজা প্রিজন ভ্যান থেকে দৌড়ে পালিয়েছেন’, তদন্তের পর পুলিশের ভাষ্য দাঁড়িয়েছে—‘পিচ্চি রাজাকে প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকারে তুলে দেওয়া হয়েছে।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

এইচএসসিতে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ; অকৃতকার্য প্রায় ৬ লাখ

পিচ্চি রাজা পালাননি, প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়

Update Time : ০২:৩২:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

গাজীপুর প্রতিনিধি:দৈনিক প্রান্তিক।

‘পিচ্চি রাজা’ প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাননি—তাকে পুলিশই প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে অপেক্ষমাণ একটি প্রাইভেটকারে তুলে দিয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় তিনি শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে দৌড়ে পালিয়েছেন—এমন একটি ঘটনা সাজানো হয় বলে জানিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি)।

ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পর পুলিশের তদন্তে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে জানানো হয়েছিল, ঢাকার আদালত থেকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফেরার পথে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় প্রিজন ভ্যান থামিয়ে পিচ্চি রাজাকে শৌচাগারে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তিনি দৌড়ে পালিয়ে যান। সেই ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল।তদন্তে ওই প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনার বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জিএমপির তদন্ত অনুযায়ী, ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলা জজ আদালত থেকে ৩০ আসামিকে নিয়ে প্রিজন ভ্যানটি কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের দিকে ফিরছিল। পথে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছে ভ্যানটি থামানো হয়।

সেখানে প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস চালক নায়েক কামাল হোসেনের কাছ থেকে ভ্যানের চাবি নেন। এরপর পিচ্চি রাজা ও আরেক হাজতি খাইরুল বাশারকে ভ্যান থেকে নামানো হয়। খাইরুল বাশারকে চালকের পাশের আসনে বসানো হলেও পিচ্চি রাজাকে আর ভ্যানে তোলা হয়নি।

পুলিশের তদন্তে বলা হয়েছে, সেখানে আগে থেকেই একটি প্রাইভেটকার অপেক্ষা করছিল। এসআই প্রবীর কুমার পিচ্চি রাজাকে ওই গাড়িতে তুলে দিতে সহায়তা করেন। এরপর তিনি প্রিজন ভ্যানে ফিরে না গিয়ে পরে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় গিয়ে আবার ভ্যানের সঙ্গে যুক্ত হন।

এরপরই তৈরি করা হয় পিচ্চি রাজার ‘পালিয়ে যাওয়ার’ গল্প—এমনটাই জানিয়েছে জিএমপি।

তদন্তের পর প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজেও তাঁতীবাজার এলাকায় প্রিজন ভ্যান থামিয়ে কয়েকজনকে নামানোর দৃশ্য পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, পিচ্চি রাজা ও আরেক হাজতিকে ভ্যান থেকে নামানোর পর তিনি একটি অপেক্ষমাণ গাড়িতে চলে যান। পরে প্রিজন ভ্যানটি তাঁকে ছাড়াই গন্তব্যের দিকে যায়।

জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারের ভাষ্য অনুযায়ী, পিচ্চি রাজাকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে ৬০ হাজার টাকা উদ্ধারের কথাও পুলিশ জানিয়েছে। তবে ওই অর্থের সঙ্গে পিচ্চি রাজাকে ছেড়ে দেওয়ার সরাসরি সম্পর্ক কী—তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন এবং পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আগে দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিল পুলিশ।

পরে গাজীপুরের আদালত গ্রেপ্তার তিনজনের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্ত কর্মকর্তারা তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পিচ্চি রাজাকে ছেড়ে দেওয়ার পেছনে আর কারা জড়িত এবং কী কারণে তাঁকে পুলিশি হেফাজত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখছেন।

ঘটনার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে এখানেই। প্রথমে যে ঘটনাটি ছিল—‘পিচ্চি রাজা প্রিজন ভ্যান থেকে দৌড়ে পালিয়েছেন’, তদন্তের পর পুলিশের ভাষ্য দাঁড়িয়েছে—‘পিচ্চি রাজাকে প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকারে তুলে দেওয়া হয়েছে।’