Dhaka ০৬:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রামপুরায় ২৮ হত্যা: স্বামীর রক্তাক্ত মরদেহের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন লাকি বেগম

নিজস্ব প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক।
১৫ অক্টোবর ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে স্বামীকে হারানোর বর্ণনা দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী লাকি বেগম। স্বামীর হত্যার বিচার দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চাই।’

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেন তিনি। বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চার আসামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ষোড়শ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন লাকি বেগম।

জবানবন্দিতে তিনি জানান, তাঁর বর্তমান বয়স ৩৮ বছর। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁর স্বামী ইসমাইল হোসেন অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

লাকি বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে তাঁর স্বামী অটোরিকশা নিয়ে বাসা থেকে বের হন। মাগরিবের নামাজের সময় ছেলের এক বন্ধু এসে তাঁদের জানায়, রামপুরার ডেলটা কেয়ার হাসপাতালের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর স্বামী মারা গেছেন।

খবরটি শুনে তিনি ও তাঁর ছেলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখতে পান, এক প্রতিবেশী ভ্যানে করে তাঁর স্বামীর মরদেহ বাসায় নিয়ে এসেছেন। মরদেহের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর স্বামীর মাথায় গুলি লেগেছিল। মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে মগজ বেরিয়ে এসেছিল। শরীরের বিভিন্ন অংশ রক্তাক্ত ছিল।

তিনি জানান, মরদেহের মাথায় ব্যান্ডেজ করানোর জন্য তাঁরা বেটার লাইফ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে তাঁর দেবর অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন।

লাকি বেগম আরও বলেন, গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথে পুলিশ ও বিজিবি তাঁদের নানাভাবে হয়রানি করে এবং অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখে। এ সময় তাঁরা স্বামী দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বলে জানালে অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন ২০ জুলাই গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে স্বামীর মরদেহ দাফন করেন তাঁরা।

স্বামীর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ও সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে তিনি জানতে পারেন, পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জবানবন্দিতে তিনি রাফাত, রেদোয়ান, রাশেদুল ও মশিউর নামের চারজনের বিরুদ্ধে তাঁর স্বামীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ করেন।

স্বামীর মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন লাকি বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে স্বামীর হত্যার বিচার দাবি করেন।

এদিকে, রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় বৃহস্পতিবার লাকি বেগমের সাক্ষ্যসহ ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৮ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

এইচএসসিতে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ; অকৃতকার্য প্রায় ৬ লাখ

রামপুরায় ২৮ হত্যা: স্বামীর রক্তাক্ত মরদেহের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন লাকি বেগম

Update Time : ০৩:৫৭:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক।
১৫ অক্টোবর ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে স্বামীকে হারানোর বর্ণনা দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী লাকি বেগম। স্বামীর হত্যার বিচার দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চাই।’

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেন তিনি। বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চার আসামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ষোড়শ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন লাকি বেগম।

জবানবন্দিতে তিনি জানান, তাঁর বর্তমান বয়স ৩৮ বছর। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁর স্বামী ইসমাইল হোসেন অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

লাকি বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে তাঁর স্বামী অটোরিকশা নিয়ে বাসা থেকে বের হন। মাগরিবের নামাজের সময় ছেলের এক বন্ধু এসে তাঁদের জানায়, রামপুরার ডেলটা কেয়ার হাসপাতালের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর স্বামী মারা গেছেন।

খবরটি শুনে তিনি ও তাঁর ছেলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখতে পান, এক প্রতিবেশী ভ্যানে করে তাঁর স্বামীর মরদেহ বাসায় নিয়ে এসেছেন। মরদেহের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর স্বামীর মাথায় গুলি লেগেছিল। মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে মগজ বেরিয়ে এসেছিল। শরীরের বিভিন্ন অংশ রক্তাক্ত ছিল।

তিনি জানান, মরদেহের মাথায় ব্যান্ডেজ করানোর জন্য তাঁরা বেটার লাইফ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে তাঁর দেবর অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন।

লাকি বেগম আরও বলেন, গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথে পুলিশ ও বিজিবি তাঁদের নানাভাবে হয়রানি করে এবং অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখে। এ সময় তাঁরা স্বামী দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বলে জানালে অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন ২০ জুলাই গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে স্বামীর মরদেহ দাফন করেন তাঁরা।

স্বামীর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ও সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে তিনি জানতে পারেন, পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জবানবন্দিতে তিনি রাফাত, রেদোয়ান, রাশেদুল ও মশিউর নামের চারজনের বিরুদ্ধে তাঁর স্বামীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ করেন।

স্বামীর মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন লাকি বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে স্বামীর হত্যার বিচার দাবি করেন।

এদিকে, রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় বৃহস্পতিবার লাকি বেগমের সাক্ষ্যসহ ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৮ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।