‘এজলাসে গণমাধ্যমকে বাধা সংবিধান ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী’—সাংবাদিক নেতারা
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এজলাসসহ হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বিচারকক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়াকে সংবিধান ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক নেতারা। অবিলম্বে গণমাধ্যমকর্মীদের নির্বিঘ্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে আইন, বিচার, সংবিধান ও মানবাধিকারবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ) আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচিতে সাংবাদিক নেতারা এসব কথা বলেন।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, গত ৭ জানুয়ারি থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এজলাস এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বেঞ্চে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বিচারাধীন মামলার শুনানি সরাসরি পর্যবেক্ষণ, আদালতের বক্তব্য ও আদেশের তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ এবং সঠিকভাবে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। এর আগে এলআরএফ গত ১৯ জানুয়ারি রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির কাছে আপিল বিভাগে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছিল। পরে বিষয়টি সমাধান না হওয়ায় আবারও প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এমন প্রতিবন্ধকতা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তার ভাষ্য, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের জানার সুযোগ নিশ্চিত করা। আদালতের কার্যক্রমও সেই জনস্বার্থের অংশ।
নুরুল কবীর বলেন, অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময়ে বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি হলে সংবাদমাধ্যম বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু সেই সংবাদমাধ্যম যখন সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে জানানোর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে, তখন বিচার বিভাগের নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তিনি আরও বলেন, প্রকাশ্য আদালতে বিচারকার্য পরিচালনার যে নীতি রয়েছে, তার সঙ্গে গণমাধ্যমের উপস্থিতির বিষয়টি নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তাই সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার বিষয়ে প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
নুরুল কবীর জানান, বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ চাওয়া হলেও তারা এখনো সাক্ষাতের সুযোগ পাননি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধান বিচারপতিসহ সংশ্লিষ্ট বিচারপতিরা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেবেন।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, মানুষ অধিকারবঞ্চিত হলে শেষ আশ্রয় হিসেবে আদালতের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে সেটি উদ্বেগের বিষয়।
তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না হলে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবেন তারা। প্রধান বিচারপতির প্রতি তথ্যপ্রবাহ ও সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন প্রশ্ন তোলেন, বিচারকক্ষে এমন কী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা জনগণ জানতে পারবে না। সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ফলে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিচার বিভাগের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকদের কাজের স্বাধীনতা ও আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা না হলে সেই বিতর্ক আরও গভীর হতে পারে।
আবু সালেহ আকন বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা দেওয়া হলে তারা তা মেনে নেবেন না। প্রয়োজনে সাংবাদিক সংগঠনগুলো এলআরএফের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি পালন করবে। সরকারকেও সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এলআরএফের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ, রিপোর্টার্স অ্যাগেইনস্ট করাপশনের সভাপতি শাফি উদ্দীন আহমদ, রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির সভাপতি কাজী এমাদ উদ্দীন জেবেল, এলআরএফের সাবেক সভাপতি ও ইত্তেফাক-এর নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন, আরটিভির হেড অব নিউজ ও ডিআরইউর সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন, এলআরএফের সাবেক সভাপতি এম বদি-উজ-জামান, আশুতোষ সরকার, ওয়াকিল আহমেদ হিরন, শামীমা আক্তার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান, দিদারুল আলম, সিনিয়র সদস্য শংকর মৈত্র ও সাজেদুল হকসহ সাংবাদিক নেতারা।
সমাপনী বক্তব্যে এলআরএফের সভাপতি মুহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, সাংবাদিকদের এজলাসে প্রবেশের অধিকার দ্রুত নিশ্চিত করা না হলে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিনি আপিল বিভাগের বিচারকক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন এলআরএফের সাধারণ সম্পাদক আরাফাত মুন্না। কর্মসূচিতে ফোরামের সহসভাপতি আবু সালেহ রনি, যুগ্ম সম্পাদক তানভীর আহমেদ, অর্থ সম্পাদক মনজুর হোসাইন, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ আল আমীন, দপ্তর সম্পাদক মাহমুদুল আলম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জাহিদুল বাশার, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌসী মানু, কার্যনির্বাহী সদস্য আসাদুর রহমান, এস এম নূর মোহাম্মদ ও রেজাউল করিমসহ দুই শতাধিক সাংবাদিক অংশ নেন।
প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে এলআরএফ এর আগেও প্রধান বিচারপতির কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছিল। সংগঠনটির বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকরা প্রকাশ্য আদালতে উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি ও রায় সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ করে আসছেন। সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে সেই ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটছে এবং বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভুল ও তাৎক্ষণিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা । 























