Dhaka ০৭:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শরতের আকাশে বিষাদের সুর, মর্ত্যজুড়ে আবার আসার প্রতীক্ষা

মোঃ আলফাজ উদ্দিন – সম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক।|
২১ অক্টোবর ২০২৬

শরতের আকাশে আজও সাদা মেঘের আনাগোনা। বাতাসে কাশফুলের দোল, দূরে কোথাও ঢাকের শেষ বোল ভেসে আসে। অথচ উৎসবের সেই চেনা কোলাহলে আজ কেমন যেন বিষাদের ছায়া। যে মণ্ডপে কয়েক দিন আগেও ছিল মানুষের পদচারণা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর আরতির আলো, সেখানে আজ বিদায়ের আয়োজন।

সনাতন মন্ডলীদের মা দুর্গা ফিরে যাচ্ছেন কৈলাশে। মর্ত্যের ঘর ছেড়ে দেবী আবার ফিরে যাবেন তাঁর স্বামীগৃহে। ভক্তদের কাছে তিনি কেবল মৃন্ময় প্রতিমা নন; তিনি ঘরের মেয়ে, তিনি উমা। বছর ঘুরে বাপের বাড়িতে আসেন, কয়েকটি দিন আনন্দে কাটান, তারপর আবার ফিরে যান। এই আসা-যাওয়ার মধ্যে বাঙালির চিরচেনা এক পারিবারিক গল্প যেন বারবার নতুন হয়ে ওঠে।

আজ বুধবার, ২১ অক্টোবর, শুভ বিজয়া দশমী। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসব। ছয় দিনের উৎসবের পর মণ্ডপে মণ্ডপে এখন বিদায়ের প্রস্তুতি। আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে এক অদ্ভুত মনখারাপ। দেবীকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকের চোখের কোণে জমেছে জল।

এ বছরের দুর্গোৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পঞ্জিকার এক বিশেষ বিশ্বাস। হিন্দু শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা অনুসারে, এবার দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘটেছে ঘোটক বা ঘোড়ায়। আর বিদায় নিচ্ছেন নৌকায় চড়ে।

লোকবিশ্বাসে দেবীর আগমন ও গমনের বাহনকে ঘিরে রয়েছে নানা ব্যাখ্যা। ঘোটকে আগমনকে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় ছত্রভঙ্গ ও অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে নৌকায় গমনকে মনে করা হয় শস্যবৃদ্ধি, জলবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির শুভসংকেত।

বাংলার মানুষের কাছে নৌকা কেবল যাতায়াতের বাহন নয়। নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের জীবন, জীবিকা ও স্বপ্নের সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক বহু পুরোনো। বর্ষার জলে ভেসে যাওয়া মাঠ, নদীর বুকে জেগে ওঠা চর, কৃষকের অপেক্ষায় থাকা ফসলের জমি—সবকিছুর সঙ্গে নৌকার এক নিবিড় আত্মীয়তা রয়েছে।

তাই দেবীর নৌকায় গমনের বিশ্বাসে ভক্তেরা খুঁজে পান প্রকৃতির কল্যাণের আশ্বাস। তাঁরা কামনা করেন, মাঠে ফলুক সোনালি ধান, নদী-জলাশয় ভরে উঠুক পানিতে, মানুষের ঘরে ফিরে আসুক স্বস্তি ও সমৃদ্ধি। অবশ্য এসব বাহনসংক্রান্ত ব্যাখ্যা ধর্মীয় পঞ্জিকা ও লোকবিশ্বাসের অংশ, ভবিষ্যৎ ঘটনার নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে গাজীপুরের গ্রামাঞ্চলেও এবারের দুর্গোৎসব ঘিরে ছিল উৎসবের আমেজ। কোথাও মন্দির প্রাঙ্গণে আলোকসজ্জা, কোথাও বাঁশ ও কাপড়ের সাজে তৈরি হয়েছে পূজামণ্ডপ। ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ আর মানুষের আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠেছে জনপদ।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে গাজীপুর জেলার পাঁচটি থানা এলাকায় মোট ৩৩৪টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে জয়দেবপুর থানা এলাকায় ২৮টি, কালিয়াকৈরে ১৩৮টি, শ্রীপুরে ৬০টি, কাপাসিয়ায় ৬৫টি এবং কালীগঞ্জে ৪৩টি মণ্ডপ রয়েছে। জেলার সবচেয়ে বেশি পূজামণ্ডপ কালিয়াকৈর থানা এলাকায়।

অন্যদিকে গাজীপুর সদর উপজেলাতেও উৎসবের আয়োজন কম নয়। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এবার সদর উপজেলায় ২৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলার চারটি ইউনিয়ন—মির্জাপুর, ভাওয়ালগড়, পিরুজালী ও বাড়িয়ার বিভিন্ন জনপদে ছড়িয়ে রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয় ও ঐতিহ্যবাহী মন্দির।

গাজীপুর সদর উপজেলার সরকারি মন্দির-সংক্রান্ত পুরোনো তালিকায় মির্জাপুর বাজার কেন্দ্রীয় মন্দির, মির্জাপুর আশ্রম কেন্দ্রীয় মন্দির, পাইনশাইল শ্রী শ্রী লোকনাথ সংঘ, মনিপুর শ্রীচরণ বর্মনের বাড়ির দুর্গামন্দির, মনিপুর মনোরঞ্জনের বাড়ির দুর্গামন্দির, মনিপুর খাসপাড়া দুর্গামন্দির, মনিপুর পশ্চিমপাড়া দেবনাথ বাড়ির দুর্গামন্দির এবং কাতলামারা দুর্গামন্দিরের নাম উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া রুদ্রপুর দুর্গামন্দির, কড়ইতলী দুর্গামন্দির, পিঙ্গাইল দুর্গামন্দির, দীনেশ চন্দ্র দাসের বাড়ির দুর্গামন্দির এবং বড় কয়ের দুর্গামন্দিরের পরিচয়ও সরকারি নথিতে পাওয়া যায়। এসব মন্দিরের কয়েকটি গ্রামীণ জনপদে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের ধারক।

এসব মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় অনুশীলন, সামাজিক যোগাযোগ ও উৎসবের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। দুর্গাপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গণ শুধু পূজার্চনার স্থান থাকে না; হয়ে ওঠে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনকেন্দ্র। তবে সরকারি পুরোনো তালিকায় থাকা সব মন্দিরেই এবার দুর্গাপূজার আয়োজন হয়েছে—এমনটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনও নিয়েছিল বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। ১২ অক্টোবর সদর উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তুতিমূলক সভায় জানানো হয়, ২৮টি মণ্ডপে পুলিশ, আনসার, গ্রাম পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সম্ভাব্য অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনা মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট প্রস্তুত রাখার কথাও জানানো হয়েছিল।

সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে শুরু হয়েছে বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা। পূজা, দেবীবরণ, দর্পণ বিসর্জন—একটির পর একটি আচার সম্পন্ন হচ্ছে শাস্ত্রীয় বিধান মেনে।

এরপর মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় সিঁদুর খেলা। বিবাহিত নারীরা দেবীর কপালে ও পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে তাঁকে বিদায় জানান। পরে একে অপরের মুখে, কপালে সিঁদুর মাখিয়ে দেন। হাসি, উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ।

লাল সিঁদুরের এই আয়োজনের মধ্যে রয়েছে সংসারের মঙ্গলকামনা, দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনের প্রার্থনা এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয় উদ্‌যাপনের ঐতিহ্য। কারও শাড়ির আঁচলে লেগে থাকে সিঁদুর, কারও কপালে ছড়িয়ে পড়ে লাল রঙ। উৎসবের শেষ বেলায় এই রঙ যেন আনন্দের পাশাপাশি বিচ্ছেদেরও এক নীরব ভাষা হয়ে ওঠে।

বাঙালির জীবনে বিদায়ের এমন দৃশ্য নতুন নয়। মেয়ের বিয়ের পর পিতৃগৃহ থেকে বিদায়, দূরদেশে কাজের সন্ধানে যাওয়া সন্তানের প্রস্থান কিংবা বহুদিন পর বাড়ি ফেরা প্রিয়জনের আবার চলে যাওয়া—প্রতিটি বিদায়ের মধ্যেই থাকে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমীও যেন সেই চিরন্তন অনুভূতিরই এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রকাশ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামলেই শুরু হবে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ থেকে শোভাযাত্রা বের হবে। ঢাকার ওয়াইজঘাট ও পোস্তগোলাসহ নির্ধারিত নদী ও জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

নদীর ঘাটে তখন জমবে মানুষের ভিড়। ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারিত হবে বিদায়ের মন্ত্র। প্রতিমা ধীরে ধীরে জলের দিকে এগিয়ে যাবে। যে প্রতিমাকে ঘিরে কয়েক দিন ধরে এত আয়োজন, এত আলো, এত মানুষের সমাগম—একসময় সেই প্রতিমাই নদীর জলে বিলীন হবে।

কিন্তু বিসর্জন কি সত্যিই বিদায়?

ভক্তের বিশ্বাসে মাটির প্রতিমা জলে মিশে যায়, কিন্তু দেবী থেকে যান হৃদয়ের অন্তঃপুরে। তাই প্রতিমা বিসর্জনের মুহূর্তে কারও চোখে জল আসে, কেউ দুহাত জোড় করে প্রণাম করেন, কেউবা নীরবে তাকিয়ে থাকেন নদীর দিকে। তাঁদের কণ্ঠে তখন একটিই আকুতি—‘আসছে বছর আবার হবে।’

এই একটি বাক্যের মধ্যে কত মানুষের কত আশা জমা থাকে! আগামী বছরের অপেক্ষা, আবার মণ্ডপ সাজানোর স্বপ্ন, আবার ঢাকের শব্দে ঘুম ভাঙার আকাঙ্ক্ষা। বিসর্জনের জল তাই কেবল একটি উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করে না; একই সঙ্গে নতুন করে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিও বহন করে।

দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এর রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। এই কয়েকটি দিনে পরিচিত-অপরিচিত মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক। মণ্ডপ হয়ে ওঠে মানুষের মিলনস্থল। ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়েও অনেকে একে অপরের উৎসবে অংশ নেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

এ বছরের দুর্গোৎসবও সেই মিলন ও সম্প্রীতির প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হচ্ছে। বিজয়া দশমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হিন্দু সম্প্রদায়সহ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। উৎসবের শেষ আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে প্রতিমা বিসর্জনের পর বিভিন্ন মণ্ডপে শান্তিজল গ্রহণ, মিষ্টিমুখ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন রয়েছে।

দেবীর কাছে ভক্তদের প্রার্থনা—পৃথিবী থেকে দূর হোক অশান্তি, মানুষের জীবন থেকে মুছে যাক হিংসা ও বিদ্বেষ। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়, সত্য ও মানবিকতা। ধর্ম-বর্ণের ভিন্নতা যেন মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

সন্ধ্যা নামবে। নদীর জল ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসবে। ঘাটের ভিড় একসময় কমে যাবে। ঢাকের শেষ শব্দটুকুও মিলিয়ে যাবে দূরের কোনো জনপদে। মণ্ডপের আলো নিভে গেলে পড়ে থাকবে কিছু ফুল, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সিঁদুর আর উৎসবের স্মৃতি।

কিন্তু মানুষের অপেক্ষা শেষ হবে না। আবার শরৎ আসবে। আকাশে ভেসে বেড়াবে সাদা মেঘ, মাঠের ধারে ফুটবে কাশফুল। কোনো এক ভোরে আবার শোনা যাবে ঢাকের আওয়াজ। মর্ত্যের ঘরে ফিরে আসবেন উমা।

আজ তাই বিদায়ের দিন হলেও এ বিদায়ের মধ্যে চিরবিচ্ছেদের বেদনা নেই। আছে ফিরে আসার প্রত্যয়, আছে নতুন দিনের স্বপ্ন।

নদীর জলে ভেসে যাক প্রতিমা, মানুষের হৃদয়ে থেকে যাক দেবীর মঙ্গলবার্তা। শুভ বিজয়া।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

এইচএসসিতে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ; অকৃতকার্য প্রায় ৬ লাখ

শরতের আকাশে বিষাদের সুর, মর্ত্যজুড়ে আবার আসার প্রতীক্ষা

Update Time : ০৬:২৬:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

মোঃ আলফাজ উদ্দিন – সম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক।|
২১ অক্টোবর ২০২৬

শরতের আকাশে আজও সাদা মেঘের আনাগোনা। বাতাসে কাশফুলের দোল, দূরে কোথাও ঢাকের শেষ বোল ভেসে আসে। অথচ উৎসবের সেই চেনা কোলাহলে আজ কেমন যেন বিষাদের ছায়া। যে মণ্ডপে কয়েক দিন আগেও ছিল মানুষের পদচারণা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর আরতির আলো, সেখানে আজ বিদায়ের আয়োজন।

সনাতন মন্ডলীদের মা দুর্গা ফিরে যাচ্ছেন কৈলাশে। মর্ত্যের ঘর ছেড়ে দেবী আবার ফিরে যাবেন তাঁর স্বামীগৃহে। ভক্তদের কাছে তিনি কেবল মৃন্ময় প্রতিমা নন; তিনি ঘরের মেয়ে, তিনি উমা। বছর ঘুরে বাপের বাড়িতে আসেন, কয়েকটি দিন আনন্দে কাটান, তারপর আবার ফিরে যান। এই আসা-যাওয়ার মধ্যে বাঙালির চিরচেনা এক পারিবারিক গল্প যেন বারবার নতুন হয়ে ওঠে।

আজ বুধবার, ২১ অক্টোবর, শুভ বিজয়া দশমী। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসব। ছয় দিনের উৎসবের পর মণ্ডপে মণ্ডপে এখন বিদায়ের প্রস্তুতি। আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে এক অদ্ভুত মনখারাপ। দেবীকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকের চোখের কোণে জমেছে জল।

এ বছরের দুর্গোৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পঞ্জিকার এক বিশেষ বিশ্বাস। হিন্দু শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা অনুসারে, এবার দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘটেছে ঘোটক বা ঘোড়ায়। আর বিদায় নিচ্ছেন নৌকায় চড়ে।

লোকবিশ্বাসে দেবীর আগমন ও গমনের বাহনকে ঘিরে রয়েছে নানা ব্যাখ্যা। ঘোটকে আগমনকে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় ছত্রভঙ্গ ও অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে নৌকায় গমনকে মনে করা হয় শস্যবৃদ্ধি, জলবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির শুভসংকেত।

বাংলার মানুষের কাছে নৌকা কেবল যাতায়াতের বাহন নয়। নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের জীবন, জীবিকা ও স্বপ্নের সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক বহু পুরোনো। বর্ষার জলে ভেসে যাওয়া মাঠ, নদীর বুকে জেগে ওঠা চর, কৃষকের অপেক্ষায় থাকা ফসলের জমি—সবকিছুর সঙ্গে নৌকার এক নিবিড় আত্মীয়তা রয়েছে।

তাই দেবীর নৌকায় গমনের বিশ্বাসে ভক্তেরা খুঁজে পান প্রকৃতির কল্যাণের আশ্বাস। তাঁরা কামনা করেন, মাঠে ফলুক সোনালি ধান, নদী-জলাশয় ভরে উঠুক পানিতে, মানুষের ঘরে ফিরে আসুক স্বস্তি ও সমৃদ্ধি। অবশ্য এসব বাহনসংক্রান্ত ব্যাখ্যা ধর্মীয় পঞ্জিকা ও লোকবিশ্বাসের অংশ, ভবিষ্যৎ ঘটনার নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে গাজীপুরের গ্রামাঞ্চলেও এবারের দুর্গোৎসব ঘিরে ছিল উৎসবের আমেজ। কোথাও মন্দির প্রাঙ্গণে আলোকসজ্জা, কোথাও বাঁশ ও কাপড়ের সাজে তৈরি হয়েছে পূজামণ্ডপ। ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ আর মানুষের আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠেছে জনপদ।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে গাজীপুর জেলার পাঁচটি থানা এলাকায় মোট ৩৩৪টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে জয়দেবপুর থানা এলাকায় ২৮টি, কালিয়াকৈরে ১৩৮টি, শ্রীপুরে ৬০টি, কাপাসিয়ায় ৬৫টি এবং কালীগঞ্জে ৪৩টি মণ্ডপ রয়েছে। জেলার সবচেয়ে বেশি পূজামণ্ডপ কালিয়াকৈর থানা এলাকায়।

অন্যদিকে গাজীপুর সদর উপজেলাতেও উৎসবের আয়োজন কম নয়। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এবার সদর উপজেলায় ২৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলার চারটি ইউনিয়ন—মির্জাপুর, ভাওয়ালগড়, পিরুজালী ও বাড়িয়ার বিভিন্ন জনপদে ছড়িয়ে রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয় ও ঐতিহ্যবাহী মন্দির।

গাজীপুর সদর উপজেলার সরকারি মন্দির-সংক্রান্ত পুরোনো তালিকায় মির্জাপুর বাজার কেন্দ্রীয় মন্দির, মির্জাপুর আশ্রম কেন্দ্রীয় মন্দির, পাইনশাইল শ্রী শ্রী লোকনাথ সংঘ, মনিপুর শ্রীচরণ বর্মনের বাড়ির দুর্গামন্দির, মনিপুর মনোরঞ্জনের বাড়ির দুর্গামন্দির, মনিপুর খাসপাড়া দুর্গামন্দির, মনিপুর পশ্চিমপাড়া দেবনাথ বাড়ির দুর্গামন্দির এবং কাতলামারা দুর্গামন্দিরের নাম উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া রুদ্রপুর দুর্গামন্দির, কড়ইতলী দুর্গামন্দির, পিঙ্গাইল দুর্গামন্দির, দীনেশ চন্দ্র দাসের বাড়ির দুর্গামন্দির এবং বড় কয়ের দুর্গামন্দিরের পরিচয়ও সরকারি নথিতে পাওয়া যায়। এসব মন্দিরের কয়েকটি গ্রামীণ জনপদে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের ধারক।

এসব মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় অনুশীলন, সামাজিক যোগাযোগ ও উৎসবের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। দুর্গাপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গণ শুধু পূজার্চনার স্থান থাকে না; হয়ে ওঠে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনকেন্দ্র। তবে সরকারি পুরোনো তালিকায় থাকা সব মন্দিরেই এবার দুর্গাপূজার আয়োজন হয়েছে—এমনটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনও নিয়েছিল বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। ১২ অক্টোবর সদর উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তুতিমূলক সভায় জানানো হয়, ২৮টি মণ্ডপে পুলিশ, আনসার, গ্রাম পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সম্ভাব্য অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনা মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট প্রস্তুত রাখার কথাও জানানো হয়েছিল।

সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে শুরু হয়েছে বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা। পূজা, দেবীবরণ, দর্পণ বিসর্জন—একটির পর একটি আচার সম্পন্ন হচ্ছে শাস্ত্রীয় বিধান মেনে।

এরপর মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় সিঁদুর খেলা। বিবাহিত নারীরা দেবীর কপালে ও পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে তাঁকে বিদায় জানান। পরে একে অপরের মুখে, কপালে সিঁদুর মাখিয়ে দেন। হাসি, উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ।

লাল সিঁদুরের এই আয়োজনের মধ্যে রয়েছে সংসারের মঙ্গলকামনা, দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনের প্রার্থনা এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয় উদ্‌যাপনের ঐতিহ্য। কারও শাড়ির আঁচলে লেগে থাকে সিঁদুর, কারও কপালে ছড়িয়ে পড়ে লাল রঙ। উৎসবের শেষ বেলায় এই রঙ যেন আনন্দের পাশাপাশি বিচ্ছেদেরও এক নীরব ভাষা হয়ে ওঠে।

বাঙালির জীবনে বিদায়ের এমন দৃশ্য নতুন নয়। মেয়ের বিয়ের পর পিতৃগৃহ থেকে বিদায়, দূরদেশে কাজের সন্ধানে যাওয়া সন্তানের প্রস্থান কিংবা বহুদিন পর বাড়ি ফেরা প্রিয়জনের আবার চলে যাওয়া—প্রতিটি বিদায়ের মধ্যেই থাকে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমীও যেন সেই চিরন্তন অনুভূতিরই এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রকাশ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামলেই শুরু হবে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ থেকে শোভাযাত্রা বের হবে। ঢাকার ওয়াইজঘাট ও পোস্তগোলাসহ নির্ধারিত নদী ও জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

নদীর ঘাটে তখন জমবে মানুষের ভিড়। ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারিত হবে বিদায়ের মন্ত্র। প্রতিমা ধীরে ধীরে জলের দিকে এগিয়ে যাবে। যে প্রতিমাকে ঘিরে কয়েক দিন ধরে এত আয়োজন, এত আলো, এত মানুষের সমাগম—একসময় সেই প্রতিমাই নদীর জলে বিলীন হবে।

কিন্তু বিসর্জন কি সত্যিই বিদায়?

ভক্তের বিশ্বাসে মাটির প্রতিমা জলে মিশে যায়, কিন্তু দেবী থেকে যান হৃদয়ের অন্তঃপুরে। তাই প্রতিমা বিসর্জনের মুহূর্তে কারও চোখে জল আসে, কেউ দুহাত জোড় করে প্রণাম করেন, কেউবা নীরবে তাকিয়ে থাকেন নদীর দিকে। তাঁদের কণ্ঠে তখন একটিই আকুতি—‘আসছে বছর আবার হবে।’

এই একটি বাক্যের মধ্যে কত মানুষের কত আশা জমা থাকে! আগামী বছরের অপেক্ষা, আবার মণ্ডপ সাজানোর স্বপ্ন, আবার ঢাকের শব্দে ঘুম ভাঙার আকাঙ্ক্ষা। বিসর্জনের জল তাই কেবল একটি উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করে না; একই সঙ্গে নতুন করে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিও বহন করে।

দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এর রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। এই কয়েকটি দিনে পরিচিত-অপরিচিত মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক। মণ্ডপ হয়ে ওঠে মানুষের মিলনস্থল। ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়েও অনেকে একে অপরের উৎসবে অংশ নেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

এ বছরের দুর্গোৎসবও সেই মিলন ও সম্প্রীতির প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হচ্ছে। বিজয়া দশমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হিন্দু সম্প্রদায়সহ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। উৎসবের শেষ আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে প্রতিমা বিসর্জনের পর বিভিন্ন মণ্ডপে শান্তিজল গ্রহণ, মিষ্টিমুখ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন রয়েছে।

দেবীর কাছে ভক্তদের প্রার্থনা—পৃথিবী থেকে দূর হোক অশান্তি, মানুষের জীবন থেকে মুছে যাক হিংসা ও বিদ্বেষ। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়, সত্য ও মানবিকতা। ধর্ম-বর্ণের ভিন্নতা যেন মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

সন্ধ্যা নামবে। নদীর জল ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসবে। ঘাটের ভিড় একসময় কমে যাবে। ঢাকের শেষ শব্দটুকুও মিলিয়ে যাবে দূরের কোনো জনপদে। মণ্ডপের আলো নিভে গেলে পড়ে থাকবে কিছু ফুল, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সিঁদুর আর উৎসবের স্মৃতি।

কিন্তু মানুষের অপেক্ষা শেষ হবে না। আবার শরৎ আসবে। আকাশে ভেসে বেড়াবে সাদা মেঘ, মাঠের ধারে ফুটবে কাশফুল। কোনো এক ভোরে আবার শোনা যাবে ঢাকের আওয়াজ। মর্ত্যের ঘরে ফিরে আসবেন উমা।

আজ তাই বিদায়ের দিন হলেও এ বিদায়ের মধ্যে চিরবিচ্ছেদের বেদনা নেই। আছে ফিরে আসার প্রত্যয়, আছে নতুন দিনের স্বপ্ন।

নদীর জলে ভেসে যাক প্রতিমা, মানুষের হৃদয়ে থেকে যাক দেবীর মঙ্গলবার্তা। শুভ বিজয়া।