Dhaka ০৫:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরের দশমহাবিদ্যা মন্দিরে ইসকনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক

যশোরের চাঁচড়া রাজবাড়ীসংলগ্ন ঐতিহাসিক শ্রীশ্রী দশমহাবিদ্যা মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে এক কিশোরীর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ২০১৬ সালে শর্তসাপেক্ষে মন্দিরের সংস্কার ও পূজা-অর্চনায় সহযোগিতার জন্য আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) যুক্ত হলেও ধীরে ধীরে মন্দিরের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাদের প্রভাব বেড়েছে। মন্দির পরিচালনা কমিটির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, দানবাক্স ও অনুদানের অর্থের ব্যবহার এবং মন্দির চত্বরে বসবাসকারী পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগ অবশ্য ইসকনের সংশ্লিষ্টরা অস্বীকার করেছেন।

মন্দির কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্তের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইসকনকে নির্দিষ্ট কিছু শর্তে মন্দিরে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, মন্দিরের মূল পূজা-অর্চনা ও পরিচালনায় তারা হস্তক্ষেপ করবে না এবং তাদের কার্যক্রম নির্দিষ্ট একটি অংশে সীমিত থাকবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সীমারেখা মানা হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।

মন্দির চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেখানে বসবাসকারী ছয়টি পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উঠে এসেছে। মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে কয়েকটি পরিবারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অন্য পরিবারগুলোও উচ্ছেদের আশঙ্কায় রয়েছে।

স্থানীয় সনাতনীদের অভিযোগ, ইসকনের প্রভাব বাড়ার পর সাধারণ ভক্তদের মন্দিরে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ তৈরি হয়েছে। দানবাক্স ও অনুদানের অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়েও মন্দির পরিচালনা কমিটির সঙ্গে মতবিরোধ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং ইসকনের সংশ্লিষ্টরা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।

এর মধ্যেই গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে মন্দির চত্বরে একটি কুটির থেকে ১৭ বছর বয়সী শিপ্রা ঘোষের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ভাতুড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ মন্দির চত্বরে নেওয়া হলে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ দেখা দেয়।

শিপ্রার পরিবারের অভিযোগ, মন্দিরের অধ্যক্ষ অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাস এবং তাঁর সহযোগীদের কাছ থেকে শিপ্রা যৌন হয়রানি, অশালীন আচরণ ও অপমানের শিকার হয়েছিলেন। পরিবারের দাবি, এসব ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তবে ২৭ সেপ্টেম্বর আদালতে করা মামলায় ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। ফলে শিপ্রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং মৃত্যুর সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না—তা তদন্তের বিষয়।

মামলার আসামিরা হলেন—অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাস, সাধন অধিকারী, রাম অধিকারী, অর্জুন দাস, পার্থ দাস, পবিত্র, সঞ্জয় ও রঘু। শিপ্রার ভাই পাপন কুমার ঘোষ বাদী হয়ে যশোরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন।

মামলাটি গ্রহণ করে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জয় পাল যশোর কোতোয়ালি থানায় এ ঘটনায় আগে কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদন আকারে আদালতে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মামলার কোনো আসামি গ্রেপ্তার হননি।

শিপ্রার মৃত্যুর পর মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাসসহ মামলার অভিযুক্তদের প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না বলে মন্দিরসংশ্লিষ্টদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মন্দির সূত্রের দাবি, অপার গোবিন্দ চলে যাওয়ার পর অভয়নগরের রূপ-সনাতন ধাম থেকে কয়েকজন নতুন সাধুকে সেখানে দেখা যাচ্ছে। তাঁদের পরিচয় ও অবস্থান নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তবে অপার গোবিন্দ বর্তমানে কোথায় আছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে শিপ্রার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোর। সংগঠনটির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তদন্তে শিপ্রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, পরিবারের অভিযোগ, মন্দিরের অধ্যক্ষের ভূমিকা এবং মন্দির চত্বরে দীর্ঘদিনের বিরোধসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে শিপ্রা ঘোষের মৃত্যুর ঘটনা এখন শুধু একটি কিশোরীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দিরের পরিচালনা, ইসকনের ভূমিকা, মন্দির চত্বরে বসবাসকারী পরিবারগুলোর উচ্ছেদের অভিযোগ এবং কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কোরআনের বিধান বাস্তবায়নে সংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আমির হামজা, টানলেন সোলায়মান (আ.) ও রানি বিলকিসের ঘটনা

যশোরের দশমহাবিদ্যা মন্দিরে ইসকনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক

Update Time : ০৭:৩০:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

যশোরের চাঁচড়া রাজবাড়ীসংলগ্ন ঐতিহাসিক শ্রীশ্রী দশমহাবিদ্যা মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে এক কিশোরীর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ২০১৬ সালে শর্তসাপেক্ষে মন্দিরের সংস্কার ও পূজা-অর্চনায় সহযোগিতার জন্য আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) যুক্ত হলেও ধীরে ধীরে মন্দিরের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাদের প্রভাব বেড়েছে। মন্দির পরিচালনা কমিটির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, দানবাক্স ও অনুদানের অর্থের ব্যবহার এবং মন্দির চত্বরে বসবাসকারী পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগ অবশ্য ইসকনের সংশ্লিষ্টরা অস্বীকার করেছেন।

মন্দির কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্তের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইসকনকে নির্দিষ্ট কিছু শর্তে মন্দিরে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, মন্দিরের মূল পূজা-অর্চনা ও পরিচালনায় তারা হস্তক্ষেপ করবে না এবং তাদের কার্যক্রম নির্দিষ্ট একটি অংশে সীমিত থাকবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সীমারেখা মানা হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।

মন্দির চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেখানে বসবাসকারী ছয়টি পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উঠে এসেছে। মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে কয়েকটি পরিবারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অন্য পরিবারগুলোও উচ্ছেদের আশঙ্কায় রয়েছে।

স্থানীয় সনাতনীদের অভিযোগ, ইসকনের প্রভাব বাড়ার পর সাধারণ ভক্তদের মন্দিরে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ তৈরি হয়েছে। দানবাক্স ও অনুদানের অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়েও মন্দির পরিচালনা কমিটির সঙ্গে মতবিরোধ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং ইসকনের সংশ্লিষ্টরা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।

এর মধ্যেই গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে মন্দির চত্বরে একটি কুটির থেকে ১৭ বছর বয়সী শিপ্রা ঘোষের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ভাতুড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ মন্দির চত্বরে নেওয়া হলে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ দেখা দেয়।

শিপ্রার পরিবারের অভিযোগ, মন্দিরের অধ্যক্ষ অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাস এবং তাঁর সহযোগীদের কাছ থেকে শিপ্রা যৌন হয়রানি, অশালীন আচরণ ও অপমানের শিকার হয়েছিলেন। পরিবারের দাবি, এসব ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তবে ২৭ সেপ্টেম্বর আদালতে করা মামলায় ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। ফলে শিপ্রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং মৃত্যুর সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না—তা তদন্তের বিষয়।

মামলার আসামিরা হলেন—অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাস, সাধন অধিকারী, রাম অধিকারী, অর্জুন দাস, পার্থ দাস, পবিত্র, সঞ্জয় ও রঘু। শিপ্রার ভাই পাপন কুমার ঘোষ বাদী হয়ে যশোরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন।

মামলাটি গ্রহণ করে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জয় পাল যশোর কোতোয়ালি থানায় এ ঘটনায় আগে কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদন আকারে আদালতে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মামলার কোনো আসামি গ্রেপ্তার হননি।

শিপ্রার মৃত্যুর পর মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাসসহ মামলার অভিযুক্তদের প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না বলে মন্দিরসংশ্লিষ্টদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মন্দির সূত্রের দাবি, অপার গোবিন্দ চলে যাওয়ার পর অভয়নগরের রূপ-সনাতন ধাম থেকে কয়েকজন নতুন সাধুকে সেখানে দেখা যাচ্ছে। তাঁদের পরিচয় ও অবস্থান নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তবে অপার গোবিন্দ বর্তমানে কোথায় আছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে শিপ্রার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোর। সংগঠনটির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তদন্তে শিপ্রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, পরিবারের অভিযোগ, মন্দিরের অধ্যক্ষের ভূমিকা এবং মন্দির চত্বরে দীর্ঘদিনের বিরোধসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে শিপ্রা ঘোষের মৃত্যুর ঘটনা এখন শুধু একটি কিশোরীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দিরের পরিচালনা, ইসকনের ভূমিকা, মন্দির চত্বরে বসবাসকারী পরিবারগুলোর উচ্ছেদের অভিযোগ এবং কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।