“পূর্ণিমার চাঁদ স্থির হয়ে থাকবে মধ্য আকাশে। চারদিক থেকে বিবিধ কণ্ঠ ডাকবে—‘আয়, আয়, আয়।’”—হুমায়ূন আহমেদের এই পঙ্ক্তিটি যেন আজ তাঁর জীবন ও সৃষ্টিরই প্রতীক। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর নির্মিত জোছনাভেজা শব্দরাজি, মানুষের গল্প, প্রকৃতির মায়া আর চরিত্রগুলো আজও মধ্য আকাশের পূর্ণিমার চাঁদের মতোই দীপ্তিমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যাঁদের জনপ্রিয়তা ক্ষীণ হয়ে আসে, হুমায়ূন আহমেদ তাঁদের দলে নন। বরং যত সময় গড়িয়েছে, ততই তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা ভাষার এক অনিবার্য সাংস্কৃতিক উপস্থিতি।
আজ ১৯ জুলাই। বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, গীতিকার ও বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীল মানুষ হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে তাঁর নিজের স্বপ্নের ঠিকানা, গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী গ্রামের নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। সেই সমাধি আজ শুধু একটি কবর নয়; বাংলা ভাষার লক্ষ লক্ষ পাঠকের আবেগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক নীরব স্মৃতিস্তম্ভ।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে জন্ম নেওয়া হুমায়ূন আহমেদের শৈশব কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। তাঁর পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমদ ছিলেন একজন সৎ ও সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তিনি শহীদ হন। পিতার এই আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা হুমায়ূনের মনোজগতে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। তাই তাঁর সাহিত্যজুড়ে মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং মানুষের সাহস, বেদনা, আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার মহাকাব্য।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ যে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তা কেবল সাহিত্যিক সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি পাঠক সৃষ্টি করেছেন। বাংলা ভাষায় বই পড়ার যে নতুন সংস্কৃতি আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকে বিস্তার লাভ করে, তার অন্যতম প্রধান কারিগর তিনি। বইমেলায় তাঁর নতুন বই প্রকাশ মানেই ছিল পাঠকের দীর্ঘ সারি। একটি নতুন উপন্যাস প্রকাশের জন্য যে উন্মাদনা সৃষ্টি হতো, তা বাংলা প্রকাশনা জগতে বিরল।
হুমায়ূনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর ভাষা। তিনি কঠিন শব্দে নয়, মানুষের মুখের ভাষায় সাহিত্য লিখেছেন। তাঁর সংলাপ এতটাই স্বাভাবিক যে পাঠক মনে করেন—এ যেন নিজের ঘরের মানুষের কথা। অথচ সেই সাধারণ ভাষার মধ্যেই তিনি গভীর দর্শন, নিঃসঙ্গতা, প্রেম, মৃত্যু, প্রকৃতি এবং মানবিকতার অনন্য শিল্পরূপ নির্মাণ করেছেন।
বাংলা সাহিত্যে হিমু, মিসির আলী ও শুভ্রের মতো চরিত্র সৃষ্টি করে তিনি এক অনন্য জগৎ নির্মাণ করেছেন। হিমু সমাজের প্রচলিত নিয়মের বাইরে দাঁড়িয়ে জীবনকে অন্য চোখে দেখতে শেখায়। মিসির আলী যুক্তি ও মনস্তত্ত্বের আলোয় রহস্য উন্মোচন করেন। শুভ্র মানুষের শুভবোধ, নীরবতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। এই চরিত্রগুলো বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; তারা বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে তাঁর অবদান আরও বিস্ময়কর। “এইসব দিনরাত্রি”, “বহুব্রীহি”, “অয়োময়”, “কোথাও কেউ নেই”—এসব নাটক শুধু জনপ্রিয় হয়নি; মানুষের জীবনযাপনের অংশে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে বাকের ভাই চরিত্রকে ঘিরে যে জনমত সৃষ্টি হয়েছিল, তা বিশ্ব নাট্য ইতিহাসেও বিরল। “বাকের ভাইয়ের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে”—এই স্লোগান দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছিল। নাটকের একটি চরিত্রকে বাঁচানোর দাবিতে মানুষ রাজপথে নেমেছিল। একজন লেখকের কল্পিত চরিত্রের জন্য এমন ভালোবাসা বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।
চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, শ্যামল ছায়া, ঘেটুপুত্র কমলা—প্রতিটি চলচ্চিত্রেই তিনি গল্প বলার এক স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রে বাহুল্য নেই, কৃত্রিমতা নেই; আছে মানুষের জীবন, প্রকৃতি, বেদনা ও স্বপ্নের মিশেল।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্র বাংলাদেশের ইতিহাসকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। “আগুনের পরশমণি” কিংবা “জোছনা ও জননীর গল্প” কেবল যুদ্ধের বিবরণ নয়; এগুলো মানুষের ভাঙা স্বপ্ন, সাহস, ভালোবাসা এবং স্বাধীনতার মূল্য উপলব্ধির দলিল। শহীদ পিতার সন্তান হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি দিয়ে ধারণ করেছিলেন।
প্রকৃতির প্রতি তাঁর প্রেম ছিল কিংবদন্তিতুল্য। গাজীপুরের নুহাশ পল্লী ছিল তাঁর স্বপ্নের রাজ্য। জলপাই, জাম, তেঁতুল, শেফালি, কামিনী, বকুল, লিচুগাছ, পুকুর, সবুজ ঘাস আর জোছনাভেজা রাত—এসবের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সৃষ্টির অনন্ত অনুপ্রেরণা। কার্তিকের পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা নীরবে বসে থাকতেন। তাঁর সাহিত্যেও তাই চাঁদ, বৃষ্টি, কুয়াশা, নদী ও গাছপালা যেন জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতি মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। তাই তাঁর লেখায় শহরের কোলাহলের পাশাপাশি গ্রামবাংলার নীরব সৌন্দর্যও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। নুহাশ পল্লী তাঁর কাছে কেবল বাসস্থান ছিল না; ছিল এক সৃজনভূমি, যেখানে সাহিত্য, শিল্প, প্রকৃতি ও জীবনের সৌন্দর্য একাকার হয়ে গিয়েছিল।
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকে অনেকেই “মধ্যবিত্ত জীবনের মহাকাব্য” বলে অভিহিত করেন। কারণ তিনি সেই মানুষগুলোর গল্প লিখেছেন, যাদের জীবন সাধারণ, কিন্তু অনুভূতি অসাধারণ। সংসারের টানাপোড়েন, ভালোবাসা, অভিমান, অপেক্ষা, স্বপ্ন, মৃত্যু—সবকিছুই তিনি এমনভাবে লিখেছেন, যেন পাঠক নিজের জীবনের আয়না দেখতে পান।
দুই শতাধিক উপন্যাস, অসংখ্য ছোটগল্প, নাটক, চলচ্চিত্র, শিশুতোষ সাহিত্য, বিজ্ঞানভিত্তিক রচনা ও গান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর। তাঁর বইয়ের বিক্রির পরিসংখ্যান যেমন বিস্ময়কর, তেমনি বিস্ময়কর তাঁর পাঠকের বিস্তৃতি। গ্রাম থেকে শহর, কিশোর থেকে প্রবীণ—সব বয়সের মানুষ তাঁর লেখায় নিজেদের খুঁজে পেয়েছেন।
আজ তাঁর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে নুহাশ পল্লীতে আবারও জড়ো হবেন অসংখ্য পাঠক, ভক্ত, শুভানুধ্যায়ী ও সংস্কৃতিকর্মী। কেউ ফুল হাতে, কেউ তাঁর বই হাতে, কেউ আবার নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবেন সেই লিচুতলার সমাধির সামনে। সেখানে কোনো উচ্চকণ্ঠ স্লোগান নেই; আছে গভীর নীরবতা, যা একজন স্রষ্টার প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার ভাষা।
হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু হয়নি—হয়েছে তাঁর দেহের অবসান। তাঁর শব্দ, তাঁর চরিত্র, তাঁর জোছনা, তাঁর বৃষ্টি, তাঁর মানুষের গল্প আজও বেঁচে আছে। নতুন প্রজন্ম যখন প্রথমবারের মতো নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, দেবী, হিমু, মিসির আলী, কিংবা জোছনা ও জননীর গল্প হাতে নেয়, তখন একজন নতুন হুমায়ূন জন্ম নেন সেই পাঠকের হৃদয়ে।
রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ভাষায় যে অল্প কয়েকজন লেখক পাঠকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছেন, হুমায়ূন আহমেদ তাঁদের অন্যতম। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাহিত্য কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন নয়; সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের ভাষা। সেই হৃদয়ের ভাষায় তিনি লিখেছেন হাসি, কান্না, প্রেম, মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা, জোছনা আর মানুষের চিরন্তন বেঁচে থাকার গল্প।
১৪ বছর পরও তাই তাঁর অনুপস্থিতি মানতে পারে না বাংলা ভাষার পাঠকসমাজ। কারণ, একজন সত্যিকারের লেখক কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের চোখে, পাঠকের অশ্রুতে, জোছনাভেজা রাতের নীরবতায় এবং বাংলা ভাষার প্রতিটি স্পন্দনে।
আজ তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে শুধু একটি কথাই উচ্চারণ করা যায়—হুমায়ূন আহমেদ নেই, কিন্তু তাঁর নির্মিত জোছনার রাজ্য আজও অমলিন; বাংলা সাহিত্য যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন মানুষের হৃদয়ে অনির্বাণ আলো হয়ে জ্বলবেন তিনি।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন-সম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক। 






















