Dhaka ০৬:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“মহামান্য রাষ্ট্রপতি” পদে ভোট গ্রহণ শেষ –অপেক্ষা ফলাফলের

মোঃ আলফাজ উদ্দিন

সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক।

সংসদের মখমলি কামরায় আজ যে নিয়মতান্ত্রিক ও মর্যাদাপূর্ণ ইতিহাসের মঞ্চায়ন হইলো, তাহাকে কেবলই ‘গণতন্ত্রের মহোৎসব’ বলিলে কম বলা হইবে; ইহা আসলে এক যুগের অবসান এবং অন্য এক সোনালী ভোরের আবাহন। আজ ২০ আগস্ট ২০২৬, দুপুরের কড়া রোদ যখন সংসদের চূড়ায় গিয়া ঠেকিল, ঠিক তখনই শুরু হইলো রাষ্ট্রপ্রধান বাছিয়া নেওয়ার এই গুরুগম্ভীর ও উৎসবমুখর ভোটগ্রহণ। বিকেল পাঁচটায় যখন ঘণ্টা পড়িল, দেখা গেল দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের একঘেয়েমি ও স্থবিরতা ভাঙিয়া মহামান্যদের ব্যালট বাক্স সিলগালা হইয়াছে। এখন কেবল হিসাব-নিকাশ এবং ফলের অপেক্ষা।

বাঙালি চরিত্রের একটা মস্ত বড় গুণ হইল, সে চূড়ান্ত সংকটেও নিজের অধিকার ও সম্মানের প্রশ্নে আপস করিতে জানে না। গত সাড়ে তিন দশক ধরিয়া এই বঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদের চেয়ারখানা লইয়া যে অলিখিত আপসের সিলসিলা চলিতেছিল, আজ তাহা ভাঙিয়া এক সুস্থ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হইলো। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম ব্যালট পেপারে সিল মারিয়া দেশের তেইশতম অভিভাবক বাছিতে হইতেছে। অন্ধকার প্রকোষ্ঠের বন্দিদশা হইতে বাহির হইয়া ভোটের লাইনে দাঁড়াইয়া নিজ হাতে ভাগ্য রচনার এই প্রক্রিয়াকে ইতিহাস নিশ্চিতভাবেই সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রগতির এক গৌরবোজ্জ্বল চিহ্ন বলিয়া রায় দিবে।

এবারের লড়াইয়ের ময়দানখানা যেমন মর্যাদাপূর্ণ, তেমনই কৌতূহল উদ্দীপক। একদিকে রহিয়াছেন দীর্ঘ সংগ্রামের চড়াই-উতরাই পার করা এবং ক্ষমতার অলিন্দে থাকা প্রবীণ প্রাজ্ঞ কাণ্ডারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যিনি বহু ঝড়-তুফান ও আত্মত্যাগের পথ মাড়াইয়া এই পরিণত বয়সে আসিয়া মসনদের সিংহদুয়ারে আসীন হইতে চলিয়াছেন। অন্যদিকে অন্য শিবিরের সায় লইয়া ১১-দলীয় ঐক্যের ঝাণ্ডা হাতে দাঁড়াইয়া আছেন রণক্ষেত্রের বীর ও শৃঙ্খলার কারিগর কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। একজন মসি তথা প্রজ্ঞা ও কলমের রাজনীতির মানুষ, অন্যজন তলোয়ার ও বীরত্বের প্রতীক। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোনো কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির নয়, বরং দুই যোগ্য নেতার রাজনৈতিক শুভবুদ্ধির এক অনন্য নিদর্শন।

সংসদের ৩৪৯ জন খোদাশৈল সদস্যের ভোট দেওয়ার এই দৃশ্যখানা দেখিলে মনে হয়, রাষ্ট্রকে নতুন করিয়া সাজানোর এক মহৎ বিদ্যায়তনিক কর্মযজ্ঞ চলিতেছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজেই প্রথম ভোটখানি বাক্সে ফেলিয়া এই ঐতিহাসিক নাটকের পর্দা তুলিলেন। তাহার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ একে একে দেশের ভাগ্যবিধাতারা আসিয়া অত্যন্ত সংযম ও নিষ্ঠার সহিত নিজেদের গোপন রায় জানাইয়া গেলেন। এই ভোট কেবল এক ব্যক্তির নির্বাচন নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার পক্ষে এক একটি রায়।

সংখ্যার হিসাব কষিতে কোনো জটিল অঙ্কবিশারদ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সংসদের চালচিত্রে ক্ষমতাসীনদের আসনসংখ্যাই বলিয়া দিতেছে, পাল্লা কোনদিকে ভারী। মির্জা ফখরুল সাহেবের মাথায় বিজয়ের মুকুট উঠা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। বঙ্গভবনের ঝাড়বাতিগুলো ইতিমধ্যেই নতুন অভিভাবককে বরণ করিয়া নেওয়ার জন্য সাফ-সুতরো ও আলোকিত করা হইতেছে। আগামীকাল ২১ আগস্ট, শুক্রবারের পড়ন্ত সন্ধ্যায় সেখানে নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের শপথের গৌরবময় বাদ্য বাজিবে।

ক্ষমতার এই মর্যাদাপূর্ণ পালাবদল সাধারণ মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করিয়াছে। রাজউজিরদের এই ভোট ফুরানোর পর, ব্যালটের পেট চিরিয়া যে নামই বাহির হইয়া আসুক না কেন, তাহা দেশের আমজনতার ভাগ্যাকাশে এক নতুন ভোরের বার্তা বহন করিয়া আনিবে—ইহাই এখন কোটি বাঙালির একমাত্র পরম প্রত্যাশা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কোরআনের বিধান বাস্তবায়নে সংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আমির হামজা, টানলেন সোলায়মান (আ.) ও রানি বিলকিসের ঘটনা

“মহামান্য রাষ্ট্রপতি” পদে ভোট গ্রহণ শেষ –অপেক্ষা ফলাফলের

Update Time : ১১:২৯:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

মোঃ আলফাজ উদ্দিন

সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক।

সংসদের মখমলি কামরায় আজ যে নিয়মতান্ত্রিক ও মর্যাদাপূর্ণ ইতিহাসের মঞ্চায়ন হইলো, তাহাকে কেবলই ‘গণতন্ত্রের মহোৎসব’ বলিলে কম বলা হইবে; ইহা আসলে এক যুগের অবসান এবং অন্য এক সোনালী ভোরের আবাহন। আজ ২০ আগস্ট ২০২৬, দুপুরের কড়া রোদ যখন সংসদের চূড়ায় গিয়া ঠেকিল, ঠিক তখনই শুরু হইলো রাষ্ট্রপ্রধান বাছিয়া নেওয়ার এই গুরুগম্ভীর ও উৎসবমুখর ভোটগ্রহণ। বিকেল পাঁচটায় যখন ঘণ্টা পড়িল, দেখা গেল দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের একঘেয়েমি ও স্থবিরতা ভাঙিয়া মহামান্যদের ব্যালট বাক্স সিলগালা হইয়াছে। এখন কেবল হিসাব-নিকাশ এবং ফলের অপেক্ষা।

বাঙালি চরিত্রের একটা মস্ত বড় গুণ হইল, সে চূড়ান্ত সংকটেও নিজের অধিকার ও সম্মানের প্রশ্নে আপস করিতে জানে না। গত সাড়ে তিন দশক ধরিয়া এই বঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদের চেয়ারখানা লইয়া যে অলিখিত আপসের সিলসিলা চলিতেছিল, আজ তাহা ভাঙিয়া এক সুস্থ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হইলো। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম ব্যালট পেপারে সিল মারিয়া দেশের তেইশতম অভিভাবক বাছিতে হইতেছে। অন্ধকার প্রকোষ্ঠের বন্দিদশা হইতে বাহির হইয়া ভোটের লাইনে দাঁড়াইয়া নিজ হাতে ভাগ্য রচনার এই প্রক্রিয়াকে ইতিহাস নিশ্চিতভাবেই সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রগতির এক গৌরবোজ্জ্বল চিহ্ন বলিয়া রায় দিবে।

এবারের লড়াইয়ের ময়দানখানা যেমন মর্যাদাপূর্ণ, তেমনই কৌতূহল উদ্দীপক। একদিকে রহিয়াছেন দীর্ঘ সংগ্রামের চড়াই-উতরাই পার করা এবং ক্ষমতার অলিন্দে থাকা প্রবীণ প্রাজ্ঞ কাণ্ডারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যিনি বহু ঝড়-তুফান ও আত্মত্যাগের পথ মাড়াইয়া এই পরিণত বয়সে আসিয়া মসনদের সিংহদুয়ারে আসীন হইতে চলিয়াছেন। অন্যদিকে অন্য শিবিরের সায় লইয়া ১১-দলীয় ঐক্যের ঝাণ্ডা হাতে দাঁড়াইয়া আছেন রণক্ষেত্রের বীর ও শৃঙ্খলার কারিগর কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। একজন মসি তথা প্রজ্ঞা ও কলমের রাজনীতির মানুষ, অন্যজন তলোয়ার ও বীরত্বের প্রতীক। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোনো কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির নয়, বরং দুই যোগ্য নেতার রাজনৈতিক শুভবুদ্ধির এক অনন্য নিদর্শন।

সংসদের ৩৪৯ জন খোদাশৈল সদস্যের ভোট দেওয়ার এই দৃশ্যখানা দেখিলে মনে হয়, রাষ্ট্রকে নতুন করিয়া সাজানোর এক মহৎ বিদ্যায়তনিক কর্মযজ্ঞ চলিতেছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজেই প্রথম ভোটখানি বাক্সে ফেলিয়া এই ঐতিহাসিক নাটকের পর্দা তুলিলেন। তাহার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ একে একে দেশের ভাগ্যবিধাতারা আসিয়া অত্যন্ত সংযম ও নিষ্ঠার সহিত নিজেদের গোপন রায় জানাইয়া গেলেন। এই ভোট কেবল এক ব্যক্তির নির্বাচন নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার পক্ষে এক একটি রায়।

সংখ্যার হিসাব কষিতে কোনো জটিল অঙ্কবিশারদ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সংসদের চালচিত্রে ক্ষমতাসীনদের আসনসংখ্যাই বলিয়া দিতেছে, পাল্লা কোনদিকে ভারী। মির্জা ফখরুল সাহেবের মাথায় বিজয়ের মুকুট উঠা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। বঙ্গভবনের ঝাড়বাতিগুলো ইতিমধ্যেই নতুন অভিভাবককে বরণ করিয়া নেওয়ার জন্য সাফ-সুতরো ও আলোকিত করা হইতেছে। আগামীকাল ২১ আগস্ট, শুক্রবারের পড়ন্ত সন্ধ্যায় সেখানে নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের শপথের গৌরবময় বাদ্য বাজিবে।

ক্ষমতার এই মর্যাদাপূর্ণ পালাবদল সাধারণ মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করিয়াছে। রাজউজিরদের এই ভোট ফুরানোর পর, ব্যালটের পেট চিরিয়া যে নামই বাহির হইয়া আসুক না কেন, তাহা দেশের আমজনতার ভাগ্যাকাশে এক নতুন ভোরের বার্তা বহন করিয়া আনিবে—ইহাই এখন কোটি বাঙালির একমাত্র পরম প্রত্যাশা।