Dhaka ০৩:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাম্বার ছন্দে ব্রাজিল, নাকি ভাইকিংদের তাণ্ডব? মেটলাইফে মহারণের অপেক্ষা

একদিকে কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দীর্ঘ ২৪ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটিয়ে হেক্সা জয়ের স্বপ্নে বিভোর ব্রাজিল। অন্যদিকে আর্লিং হ্যালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের হাত ধরে নতুন রূপে আবির্ভূত নরওয়ে—ইউরোপের উদীয়মান শক্তি। প্রায় ২৮ বছর পর বিশ্বমঞ্চে আবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই দল। নিউ জার্সির ঐতিহাসিক মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আজ রোববার রাত ২টায় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে নামবে তারা। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের শৈল্পিক সাম্বা আর আর্লিং হ্যালান্ডের বিধ্বংসী শক্তির এক মনোমুগ্ধকর দ্বৈরথ।

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিপক্ষে নরওয়ের ইতিহাস বেশ সুখকর। আন্তর্জাতিক ফুটবলে চারবার মুখোমুখি হলেও একবারও জয় পায়নি সেলেসাওরা। দুটি ম্যাচে ড্র আর দুটি ম্যাচে জয় নরওয়ের। সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াইটি হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে। গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় ব্রাজিল। এরপর ২০০৬ সালের প্রীতি ম্যাচটি শেষ হয় ১-১ সমতায়। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের বিপক্ষে প্রথম জয় তুলে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে আনচেলত্তির শিষ্যরা।

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এবারের যাত্রাও খুব একটা মসৃণ ছিল না। শেষ ষোলোয় জাপানের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও নাটকীয়ভাবে ২-১ গোলের জয় তুলে নিতে হয়েছে। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণাত্মক কৌশলে দল সাজিয়ে ম্যাচে ফেরান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ক্যাসেমিরোর সমতায় ফেরানো গোলের পর যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির জয়সূচক গোলে বেঁচে যায় ব্রাজিল। তবে শক্তিশালী কাউন্টার অ্যাটাকিং দল নরওয়ের বিপক্ষে একই ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল নেওয়ার সম্ভাবনা কম। ধারণা করা হচ্ছে, ব্রাজিল তাদের পরিচিত ৪-৩-৩ ফরমেশনেই ফিরবে।

তবে ম্যাচের আগে আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা খেলোয়াড়দের ফিটনেস। রাফিনহা ইতোমধ্যে ছিটকে গেছেন। লুকাস পাকেতা ও ক্যাসেমিরোর শারীরিক অবস্থা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। যদিও ক্যাসেমিরোকে মাঠে দেখা যেতে পারে, পাকেতার জায়গায় মাঝমাঠে দানিলো সান্তোসের খেলার সম্ভাবনাই বেশি। আক্রমণে ম্যাথিউস কুনিয়া একাদশে থাকতে পারেন, ফলে জাপানের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করা গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লিকে আবারও বেঞ্চ থেকেই শুরু করতে হতে পারে। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বদলি হিসেবে মাঠে নামতে পারেন নেইমার জুনিয়র। তবে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এই তারকা ইতোমধ্যে চার গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে দলের আক্রমণের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছেন।

অন্যদিকে আইভরি কোস্টকে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করা নরওয়ে এই ম্যাচে তুলনামূলক স্বস্তিতে রয়েছে। ইনজুরি কাটিয়ে ডিফেন্ডার জুলিয়ান রাইয়ারসনের ফেরার সম্ভাবনা দলটিকে আরও শক্তিশালী করবে। তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হ্যালান্ড। অভিষেক বিশ্বকাপেই পাঁচ গোল করে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাঁধে নিঃশ্বাস ফেলছেন। নরওয়ের করা ১০ গোলের অর্ধেকই এসেছে তার পা থেকে। হ্যালান্ডকে সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড ও প্যাট্রিক বার্গ। তবে নরওয়ের দুর্বলতা রক্ষণভাগ। চলতি বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচেই গোল করার পাশাপাশি গোলও হজম করেছে স্টলে সোলবাকেনের দল।

কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও মাঠের লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। বিশেষ নজর থাকবে আর্লিং হ্যালান্ড ও গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের ব্যক্তিগত দ্বৈরথে। একই সঙ্গে মারকুইনহোসকে লক্ষ্য করে নরওয়ের আক্রমণ গড়ে উঠলে ব্রাজিলের রক্ষণে চাপ বাড়তে পারে। কারণ, শারীরিকভাবে শক্তিশালী স্ট্রাইকারদের বিপক্ষে মারকুইনহোসকে অতীতেও কিছুটা ভুগতে দেখা গেছে।

ওডেগার্ড যদি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে দ্রুত হ্যালান্ডকে বল সরবরাহ করতে পারেন, তবে নরওয়ের গতিময় পাল্টা আক্রমণ ব্রাজিলের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলবে। আর যদি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে ‘নরওয়ে-জুজু’ অটুট রেখেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিতে পারে ভাইকিংরা। অন্যদিকে ব্রাজিল চাইবে অতীতের সব আক্ষেপ মুছে নতুন ইতিহাস লিখতে। এখন অপেক্ষা শুধু মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে রাতে—সাম্বার সুর বাজবে, নাকি গর্জে উঠবে ভাইকিংদের রুদ্র তাণ্ডব।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম গ্রেপ্তার

সাম্বার ছন্দে ব্রাজিল, নাকি ভাইকিংদের তাণ্ডব? মেটলাইফে মহারণের অপেক্ষা

Update Time : ০৬:৪৬:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

একদিকে কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দীর্ঘ ২৪ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটিয়ে হেক্সা জয়ের স্বপ্নে বিভোর ব্রাজিল। অন্যদিকে আর্লিং হ্যালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের হাত ধরে নতুন রূপে আবির্ভূত নরওয়ে—ইউরোপের উদীয়মান শক্তি। প্রায় ২৮ বছর পর বিশ্বমঞ্চে আবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই দল। নিউ জার্সির ঐতিহাসিক মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আজ রোববার রাত ২টায় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে নামবে তারা। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের শৈল্পিক সাম্বা আর আর্লিং হ্যালান্ডের বিধ্বংসী শক্তির এক মনোমুগ্ধকর দ্বৈরথ।

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিপক্ষে নরওয়ের ইতিহাস বেশ সুখকর। আন্তর্জাতিক ফুটবলে চারবার মুখোমুখি হলেও একবারও জয় পায়নি সেলেসাওরা। দুটি ম্যাচে ড্র আর দুটি ম্যাচে জয় নরওয়ের। সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াইটি হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে। গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় ব্রাজিল। এরপর ২০০৬ সালের প্রীতি ম্যাচটি শেষ হয় ১-১ সমতায়। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের বিপক্ষে প্রথম জয় তুলে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে আনচেলত্তির শিষ্যরা।

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এবারের যাত্রাও খুব একটা মসৃণ ছিল না। শেষ ষোলোয় জাপানের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও নাটকীয়ভাবে ২-১ গোলের জয় তুলে নিতে হয়েছে। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণাত্মক কৌশলে দল সাজিয়ে ম্যাচে ফেরান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ক্যাসেমিরোর সমতায় ফেরানো গোলের পর যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির জয়সূচক গোলে বেঁচে যায় ব্রাজিল। তবে শক্তিশালী কাউন্টার অ্যাটাকিং দল নরওয়ের বিপক্ষে একই ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল নেওয়ার সম্ভাবনা কম। ধারণা করা হচ্ছে, ব্রাজিল তাদের পরিচিত ৪-৩-৩ ফরমেশনেই ফিরবে।

তবে ম্যাচের আগে আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা খেলোয়াড়দের ফিটনেস। রাফিনহা ইতোমধ্যে ছিটকে গেছেন। লুকাস পাকেতা ও ক্যাসেমিরোর শারীরিক অবস্থা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। যদিও ক্যাসেমিরোকে মাঠে দেখা যেতে পারে, পাকেতার জায়গায় মাঝমাঠে দানিলো সান্তোসের খেলার সম্ভাবনাই বেশি। আক্রমণে ম্যাথিউস কুনিয়া একাদশে থাকতে পারেন, ফলে জাপানের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করা গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লিকে আবারও বেঞ্চ থেকেই শুরু করতে হতে পারে। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বদলি হিসেবে মাঠে নামতে পারেন নেইমার জুনিয়র। তবে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এই তারকা ইতোমধ্যে চার গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে দলের আক্রমণের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছেন।

অন্যদিকে আইভরি কোস্টকে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করা নরওয়ে এই ম্যাচে তুলনামূলক স্বস্তিতে রয়েছে। ইনজুরি কাটিয়ে ডিফেন্ডার জুলিয়ান রাইয়ারসনের ফেরার সম্ভাবনা দলটিকে আরও শক্তিশালী করবে। তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হ্যালান্ড। অভিষেক বিশ্বকাপেই পাঁচ গোল করে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাঁধে নিঃশ্বাস ফেলছেন। নরওয়ের করা ১০ গোলের অর্ধেকই এসেছে তার পা থেকে। হ্যালান্ডকে সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড ও প্যাট্রিক বার্গ। তবে নরওয়ের দুর্বলতা রক্ষণভাগ। চলতি বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচেই গোল করার পাশাপাশি গোলও হজম করেছে স্টলে সোলবাকেনের দল।

কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও মাঠের লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। বিশেষ নজর থাকবে আর্লিং হ্যালান্ড ও গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের ব্যক্তিগত দ্বৈরথে। একই সঙ্গে মারকুইনহোসকে লক্ষ্য করে নরওয়ের আক্রমণ গড়ে উঠলে ব্রাজিলের রক্ষণে চাপ বাড়তে পারে। কারণ, শারীরিকভাবে শক্তিশালী স্ট্রাইকারদের বিপক্ষে মারকুইনহোসকে অতীতেও কিছুটা ভুগতে দেখা গেছে।

ওডেগার্ড যদি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে দ্রুত হ্যালান্ডকে বল সরবরাহ করতে পারেন, তবে নরওয়ের গতিময় পাল্টা আক্রমণ ব্রাজিলের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলবে। আর যদি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে ‘নরওয়ে-জুজু’ অটুট রেখেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিতে পারে ভাইকিংরা। অন্যদিকে ব্রাজিল চাইবে অতীতের সব আক্ষেপ মুছে নতুন ইতিহাস লিখতে। এখন অপেক্ষা শুধু মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে রাতে—সাম্বার সুর বাজবে, নাকি গর্জে উঠবে ভাইকিংদের রুদ্র তাণ্ডব।