আজ ২৬ জুলাই। পশ্চিম ডগরী আইডিয়াল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও আদর্শ শিক্ষক মরহুম আলহাজ মোহাম্মদ সুরুজ্জামান মাস্টারের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২৩ সালের এই দিনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থী, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকাবাসীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে চিরবিদায় নেন। সময়ের ক্যালেন্ডারে তিনটি বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর গড়ে তোলা শিক্ষা-আদর্শ, কর্মনিষ্ঠা এবং মানবিক মূল্যবোধ আজও সমান উজ্জ্বল হয়ে আছে।
গাজীপুরের শিক্ষা-অঙ্গনে আলহাজ মোহাম্মদ সুরুজ্জামান মাস্টার ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ আলোকবর্তিকা। শিক্ষকতা তাঁর কাছে কেবল জীবিকা নয়, ছিল ইবাদত; ছিল মানুষ গড়ার এক অবিচল সাধনা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একটি বিদ্যালয় শুধু পাঠদান করে না—একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। সেই বিশ্বাসকে হৃদয়ে ধারণ করেই তিনি সারাজীবন শিক্ষা বিস্তারে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
১৯৫৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন মরহুম মো. সৈয়দ আলী। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অধ্যবসায়ী ও জ্ঞানপিপাসু। পিরুজালীতে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভাওয়াল মির্জাপুর হাজী জমির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে এসএসসি এবং তেজগাঁও কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে বহিরাগত পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (বি.এ.) ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষালাভের এই নিরলস প্রয়াসই পরবর্তী জীবনে তাঁকে একজন আদর্শ শিক্ষকে পরিণত করেছিল।
১৯৭৩ সালের ১ মার্চ শাহজাহানপুর রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তী চার দশকেরও বেশি সময় তিনি একের পর এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক—প্রতিটি পদে তিনি রেখে গেছেন নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও সৃজনশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিরুজালী আমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর কর্মময় পদচারণা আজও স্মরণ করেন সহকর্মী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
২০১৪ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও তাঁর পথচলা থেমে থাকেনি। বরং তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, নিজের এলাকার শিশুদের জন্য একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পশ্চিম ডগরী আইডিয়াল স্কুল। প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি বিদ্যালয়টিকে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধের এক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার নিরলস চেষ্টা করেন। বিদ্যালয়ের পাশাপাশি মসজিদ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানও স্থানীয় মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন আদর্শ অভিভাবক। সন্তানদের উচ্চশিক্ষা, নৈতিকতা ও দেশসেবার চেতনায় গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর রেখে যাওয়া এই পারিবারিক উত্তরাধিকার আজও সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে। তিন সন্তানের জনক আলহাজ মো. সুরুজ্জামান মাস্টার তাঁর সন্তানদের উচ্চশিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধে গড়ে তুলেছেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র মো. কামরুজ্জামান ৩০তম বিসিএস (অডিট ও অ্যাকাউন্টস) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে বর্তমানে অ্যাডিশনাল ডেপুটি সিএজি, সিএজি কার্যালয়, ঢাকায় কর্মরত। দ্বিতীয় পুত্র মো. ওয়াহিদুজ্জামান মিলন ডগরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কনিষ্ঠ পুত্র মো. আসাদুজ্জামান সৈকত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড (অনার্স) ও এমএড ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে পশ্চিম ডগরী আইডিয়াল স্কুলের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন
২০২৩ সালের ২৬ জুলাই তাঁর জীবনাবসান হলেও তাঁর কর্মের অবসান হয়নি। একজন সত্যিকারের শিক্ষক মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সাফল্যে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইট-পাথরে, তাঁর বপন করা মূল্যবোধের প্রতিটি বীজে। আলহাজ মোহাম্মদ সুরুজ্জামান মাস্টারও তেমনি একজন শিক্ষক, যাঁর আলোকিত জীবন আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাতে থাকবে।
তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে দৈনিক প্রান্তিক-এর পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র কৃতজ্ঞতা। মহান আল্লাহ তাআলা মরহুম আলহাজ মোহাম্মদ সুরুজ্জামান মাস্টারের সকল গুনাহ মাফ করে তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন,দৈনিক প্রান্তিক। 






















