একদিকে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর স্পেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ‘এটার্নাল ব্রাইডস্মেইড’ তকমা ঝেড়ে ইতিহাস গড়তে মরিয়া বেলজিয়াম। দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের এই লড়াইয়ে আজ শুক্রবার ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচটি। জয়ী দল সেমিফাইনালে খেলবে ফ্রান্স ও মরক্কোর মধ্যকার বিজয়ীর বিপক্ষে।
বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে। গ্রুপ ‘এইচ’-এর শীর্ষস্থান অধিকার করার পর তারা নকআউট পর্বে অস্ট্রিয়াকে সহজেই বিদায় করে। এরপর শেষ ষোলোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে। মিকেল মেরিনোর শেষ মুহূর্তের গোলে জয় তুলে নিয়ে উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালের পরাজয়ের প্রতিশোধও সম্পূর্ণ করে ‘লা রোজা’।
এই বিশ্বকাপে স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগ। টুর্নামেন্টে এখনও পর্যন্ত একটি গোলও হজম করেনি তারা। টানা ছয়টি বিশ্বকাপ ম্যাচে ক্লিন শিট রেখে নতুন ইতিহাস গড়েছে স্প্যানিশরা, যা সময়ের হিসেবে টানা ১০ ঘণ্টারও বেশি গোল না খাওয়ার রেকর্ড। দে লা ফুয়েন্তের দল বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করার যে কৌশল অনুসরণ করছে, সেটিই তাদের অন্যতম বড় অস্ত্র।
অন্যদিকে, কাতার বিশ্বকাপের হতাশার পর অনেকেই ভেবেছিলেন বেলজিয়ামের ‘সোনালি প্রজন্ম’-এর অধ্যায় শেষ। কিন্তু রুডি গার্সিয়ার অধীনে নতুন রূপে ফিরে এসেছে রেড ডেভিলরা। টানা ১৮ ম্যাচে অপরাজিত থাকা বেলজিয়াম গ্রুপ পর্ব শেষে নাটকীয়ভাবে সেনেগালকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে ওঠে। এরপর স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়। চার্লস ডি কেটেলিয়ারের জোড়া গোল এবং হান্স ভানাকেনের দারুণ নৈপুণ্যে সেই ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দেয় তারা।
রুডি গার্সিয়া অবশ্য স্পেনকে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দল হিসেবে স্বীকার করলেও বিশ্বাস করেন, তার দল আক্রমণভাগের ধার দিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত গোল করার দিক থেকে বেলজিয়াম অন্যতম সফল দল। ফলে স্পেনের দুর্ভেদ্য রক্ষণ আর বেলজিয়ামের দ্রুতগতির আক্রমণের সংঘর্ষই হতে যাচ্ছে এই ম্যাচের মূল আকর্ষণ।
দল নির্বাচনেও রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। স্পেনের শিবিরে নিকো উইলিয়ামসের ফিটনেস নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি, রদ্রি ও মিকেল মেরিনোকে ঘিরেই সাজানো হবে মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগ। অন্যদিকে বেলজিয়ামের জন্য বড় ধাক্কা আমাদু ওনানার অনুপস্থিতি। চোটের কারণে তিনি ছিটকে যাওয়ায় মাঝমাঠে নিকোলাস রাসকিন কিংবা হান্স ভানাকেনের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়তে পারে। কেভিন ডি ব্রুইনা শুরুর একাদশে ফিরতে পারেন বলেও জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিসংখ্যানও স্পেনের পক্ষেই কথা বলছে। ১৯৮০ সালের পর দুই দলের শেষ ১১ দেখায় বেলজিয়াম কোনো জয় পায়নি; স্পেন জিতেছে ৯টি ম্যাচ। তবে বিশ্বকাপে দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে হিসাব সমান—উভয়েরই একটি করে জয় রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে স্পেনকে বিদায় করার স্মৃতি এখনও বেলজিয়ামের অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
ফুটবলবিশ্বের দৃষ্টি এখন লস অ্যাঞ্জেলেসের দিকে। একদিকে বলের নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাসিং ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণে ভর করে এগিয়ে চলা স্পেন; অন্যদিকে গতি, কাউন্টার অ্যাটাক এবং সৃজনশীল আক্রমণে ভরসা রাখা বেলজিয়াম। রক্ষণশক্তির ইস্পাতদুর্গ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, নাকি রেড ডেভিলদের আক্রমণের ঝড় তা ভেঙে দেবে—এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আজ রাতের মহারণেই।
স্পোর্টস ডেক্স-দৈনিক প্রান্তিক। 
























