Dhaka ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কত যে আপন অথচ অচেনা এক দ্বীনের দাঈ একটি হৃদয়বিদারক জানাজা: জীবনের এক গভীর উপলব্ধী


​জীবন এক অদ্ভুত বিস্ময়। কখনো কখনো এমন কিছু ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়, যা মানুষের হৃদয়ের গভীরতম কোণকে নাড়া দিয়ে যায়, চিন্তার জগতকে এক নতুন দিশা দেয়। সম্প্রতি তেমনই একটি মর্মান্তিক ও আত্মিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। বাংলাদেশ জমঈয়তে সুব্বানে আহলেহাদীছের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমেদ এর ইন্তেকাল এবং তার জানাজার পঠিত দোয়া আমার জীবনের অন্যতম এক ভাবগম্ভীর ও শিক্ষণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।


​মৃত্যুর সংবাদ ও একটি আক্ষেপের সূচনা

​আমাদের প্রাণের সংগঠন জমঈয়তে সুব্বানে আহলেহাদীছ বাংলাদেশ-এর ফেসবুক পেইজে যখন সংগঠনের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের ইন্তেকালের সংবাদটি দেখলাম, তখন মনটা অজান্তেই ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। দ্বীনের একজন নিবেদিতপ্রাণ খাদেম ও দায়ী এভাবে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, যা একজন মুসলিম হিসেবে অত্যন্ত বেদনার।
​তবে বেদনার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল পরবর্তী একটি তথ্য। জানতে পারলাম, দ্বীনের এই ক্ষণজন্মা দায়ী ও মুজাহিদ আলেম আমাদেরই পাশের গ্রাম পাইনশালে জন্মগ্রহণ করেছেন। এত কাছে তাঁর বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও, জীবদ্দশায় কখনো তাঁর সাথে আমার সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়নি। এই আক্ষেপটা মনের ভেতরে এক অব্যক্ত কষ্টের জন্ম দিল—কী এক অবহেলায় বা ব্যস্ততায় এমন একজন গুণী মানুষের সান্নিধ্য থেকে আমি বঞ্চিত রইলাম! বর্তমান সভাপতি আব্দুল হাদি ভাই হোয়াইটএ্যাপে ম্যাসেজ দিয়ে জানালেন সকলকে জানায় অংশগ্রহন করতে।
​জানাজার ময়দান এবং এক পিতার বুকফাটা কান্না জরিত কন্ঠে রব্বে কারিমের কাছে ফরিয়াদ যেন আকাশে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে!
​যেই মানুষটিকে জীবদ্দশায় কখনো দেখিনি, তাঁর জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হলো একেবারে চিরবিদায়ের মুহূর্তে। জানাজার মাঠে যখন উপস্থিত হলাম, পরিবেশটা ছিল চরম শোকাবহ ও থমথমে।
​সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি অপেক্ষা করছিল জানাজার নামাজের ঠিক আগমুহূর্তে। মরহুমের জানাজার নামাজে ইমামতি করেন তাঁরই সম্মানিত পিতা, বিশিষ্ট আলেম মাওলানা আব্দুস সাত্তার। একজন পিতার কাঁধে তাঁর সন্তানের কফিন বহন করার চেয়ে ভারী বোঝা দুনিয়াতে আর কী হতে পারে?
​নামাজ শুরুর আগে ও দোয়ার সময় সেই শোকার্ত পিতা যখন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করছিলেন, সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বার্ধক্যের ভারাক্রান্ত শরীর নিয়ে একজন বাবা নিজের কলিজার টুকরার জন্য দোয়া করছেন—তাঁর সেই ক্রন্দিত ও ভাঙা গলার আওয়াজ উপস্থিত সবার বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাসের জন্ম দিচ্ছিল।


​অশ্রুঝরা দুই চোখ এবং অন্তরের জাগরণ
​মাওলানা আব্দুস সাত্তারের সেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে দোয়া পাঠ শোনার পর আমি আর আমার আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। যাঁকে আমি চিনিই না, যাঁর সাথে জীবনে একটিবারও কথা হয়নি, সেই মানুষটির বিদায়ে এবং তাঁর বাবার বুকফাটা আর্তনাদ দেখে আমার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া সেই অশ্রু শুধু শোকের ছিল না, তা ছিল এক গভীর আত্মিক অনুশোচনা ও পরকালের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার কান্নায় গলে যাওয়া পানির ফোঁটা।
​সেদিন জানাজার প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মনে হলো, সম্পর্ক তো শুধু রক্ত বা সামনাসামনি পরিচয়ের নয়; ঈমান ও আখলাকের বন্ধন মানুষের আত্মাকে কীভাবে এক সুতোয় গেঁথে দেয়, এটি তার এক অনন্য প্রমাণ। একজন দ্বীনের দায়ী দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে দ্বীনের খিদমত করে, অথচ তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল এবং তাঁর বাবার আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ আমাদের শিখিয়ে দিল আসল সফলতা কোথায়।


​শিক্ষা ও সমাপ্তি

​এই ঘটনা আমার মনোজগতে এক গভীর রেখাপাত করেছে। আমরা অনেক সময় দূরের বড় বড় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে মেতে থাকি, অথচ আমাদের আশেপাশেই লুকিয়ে থাকে একেকজন হীরাতুল্য মানুষ, যাঁদের থেকে আমরা দ্বীনের অনেক আলো নিতে পারতাম। জীবদ্দশায় তাঁর সাথে দেখা না হওয়ার আক্ষেপ হয়তো সারাজীবন থেকে যাবে, কিন্তু তাঁর এই চিরবিদায় ও তাঁর বাবার সাব্র (ধৈর্য) আমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেল—আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত যেন দ্বীনের জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত হয়।
​মহান আল্লাহ মরহুমের সকল নেক আমল কবুল করুন, তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পিতা মাওলানা আব্দুস সাত্তারসহ পরিবারবর্গকে এ কঠিন শোক সহ্য করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

মোঃ আব্দুল আজিজ মিয়া (রুবেল)
প্রশিক্ষণ সম্পাদক
জমঈয়ত সুব্বানে আহলেহাদীছ বাংলাদেশ
গাজীপুর জেলা কমিটি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম গ্রেপ্তার

কত যে আপন অথচ অচেনা এক দ্বীনের দাঈ একটি হৃদয়বিদারক জানাজা: জীবনের এক গভীর উপলব্ধী

Update Time : ০৫:১৭:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬


​জীবন এক অদ্ভুত বিস্ময়। কখনো কখনো এমন কিছু ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়, যা মানুষের হৃদয়ের গভীরতম কোণকে নাড়া দিয়ে যায়, চিন্তার জগতকে এক নতুন দিশা দেয়। সম্প্রতি তেমনই একটি মর্মান্তিক ও আত্মিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। বাংলাদেশ জমঈয়তে সুব্বানে আহলেহাদীছের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমেদ এর ইন্তেকাল এবং তার জানাজার পঠিত দোয়া আমার জীবনের অন্যতম এক ভাবগম্ভীর ও শিক্ষণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।


​মৃত্যুর সংবাদ ও একটি আক্ষেপের সূচনা

​আমাদের প্রাণের সংগঠন জমঈয়তে সুব্বানে আহলেহাদীছ বাংলাদেশ-এর ফেসবুক পেইজে যখন সংগঠনের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের ইন্তেকালের সংবাদটি দেখলাম, তখন মনটা অজান্তেই ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। দ্বীনের একজন নিবেদিতপ্রাণ খাদেম ও দায়ী এভাবে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, যা একজন মুসলিম হিসেবে অত্যন্ত বেদনার।
​তবে বেদনার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল পরবর্তী একটি তথ্য। জানতে পারলাম, দ্বীনের এই ক্ষণজন্মা দায়ী ও মুজাহিদ আলেম আমাদেরই পাশের গ্রাম পাইনশালে জন্মগ্রহণ করেছেন। এত কাছে তাঁর বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও, জীবদ্দশায় কখনো তাঁর সাথে আমার সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়নি। এই আক্ষেপটা মনের ভেতরে এক অব্যক্ত কষ্টের জন্ম দিল—কী এক অবহেলায় বা ব্যস্ততায় এমন একজন গুণী মানুষের সান্নিধ্য থেকে আমি বঞ্চিত রইলাম! বর্তমান সভাপতি আব্দুল হাদি ভাই হোয়াইটএ্যাপে ম্যাসেজ দিয়ে জানালেন সকলকে জানায় অংশগ্রহন করতে।
​জানাজার ময়দান এবং এক পিতার বুকফাটা কান্না জরিত কন্ঠে রব্বে কারিমের কাছে ফরিয়াদ যেন আকাশে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে!
​যেই মানুষটিকে জীবদ্দশায় কখনো দেখিনি, তাঁর জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হলো একেবারে চিরবিদায়ের মুহূর্তে। জানাজার মাঠে যখন উপস্থিত হলাম, পরিবেশটা ছিল চরম শোকাবহ ও থমথমে।
​সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি অপেক্ষা করছিল জানাজার নামাজের ঠিক আগমুহূর্তে। মরহুমের জানাজার নামাজে ইমামতি করেন তাঁরই সম্মানিত পিতা, বিশিষ্ট আলেম মাওলানা আব্দুস সাত্তার। একজন পিতার কাঁধে তাঁর সন্তানের কফিন বহন করার চেয়ে ভারী বোঝা দুনিয়াতে আর কী হতে পারে?
​নামাজ শুরুর আগে ও দোয়ার সময় সেই শোকার্ত পিতা যখন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করছিলেন, সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বার্ধক্যের ভারাক্রান্ত শরীর নিয়ে একজন বাবা নিজের কলিজার টুকরার জন্য দোয়া করছেন—তাঁর সেই ক্রন্দিত ও ভাঙা গলার আওয়াজ উপস্থিত সবার বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাসের জন্ম দিচ্ছিল।


​অশ্রুঝরা দুই চোখ এবং অন্তরের জাগরণ
​মাওলানা আব্দুস সাত্তারের সেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে দোয়া পাঠ শোনার পর আমি আর আমার আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। যাঁকে আমি চিনিই না, যাঁর সাথে জীবনে একটিবারও কথা হয়নি, সেই মানুষটির বিদায়ে এবং তাঁর বাবার বুকফাটা আর্তনাদ দেখে আমার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া সেই অশ্রু শুধু শোকের ছিল না, তা ছিল এক গভীর আত্মিক অনুশোচনা ও পরকালের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার কান্নায় গলে যাওয়া পানির ফোঁটা।
​সেদিন জানাজার প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মনে হলো, সম্পর্ক তো শুধু রক্ত বা সামনাসামনি পরিচয়ের নয়; ঈমান ও আখলাকের বন্ধন মানুষের আত্মাকে কীভাবে এক সুতোয় গেঁথে দেয়, এটি তার এক অনন্য প্রমাণ। একজন দ্বীনের দায়ী দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে দ্বীনের খিদমত করে, অথচ তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল এবং তাঁর বাবার আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ আমাদের শিখিয়ে দিল আসল সফলতা কোথায়।


​শিক্ষা ও সমাপ্তি

​এই ঘটনা আমার মনোজগতে এক গভীর রেখাপাত করেছে। আমরা অনেক সময় দূরের বড় বড় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে মেতে থাকি, অথচ আমাদের আশেপাশেই লুকিয়ে থাকে একেকজন হীরাতুল্য মানুষ, যাঁদের থেকে আমরা দ্বীনের অনেক আলো নিতে পারতাম। জীবদ্দশায় তাঁর সাথে দেখা না হওয়ার আক্ষেপ হয়তো সারাজীবন থেকে যাবে, কিন্তু তাঁর এই চিরবিদায় ও তাঁর বাবার সাব্র (ধৈর্য) আমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেল—আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত যেন দ্বীনের জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত হয়।
​মহান আল্লাহ মরহুমের সকল নেক আমল কবুল করুন, তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পিতা মাওলানা আব্দুস সাত্তারসহ পরিবারবর্গকে এ কঠিন শোক সহ্য করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

মোঃ আব্দুল আজিজ মিয়া (রুবেল)
প্রশিক্ষণ সম্পাদক
জমঈয়ত সুব্বানে আহলেহাদীছ বাংলাদেশ
গাজীপুর জেলা কমিটি।