২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ, দুদকের তদন্ত চলছে
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণে দুর্নীতি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয়েছে পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে। এ মামলায় তার সঙ্গে আসামি রয়েছেন আরও ১৯ জন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, দুর্নীতি, প্রতারণা এবং প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের অর্থ লুট ও আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পারস্পরিক যোগসাজশে ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের নামে ইসলামী ব্যাংকের ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৩টি শেয়ার অধিগ্রহণ করা হয়। এসব শেয়ারের মূল্য প্রায় ২৫১ কোটি টাকা।
মামলাটি করেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির প্রধান শাখার সিনিয়র অফিসার মো. আবদুচ ছামাদ। ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে তৎকালীন বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজের আদালতে তিনি এ মামলা দায়ের করেন। আদালত ওই দিন বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে মামলাটি আমলে নেন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
মামলার বাদী আবদুচ ছামাদ জানান, বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য থাকলেও দুদক প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। পরে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীর আগামী ১১ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য করেছেন।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি
মামলার এজাহারে ১২ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন-এর নাম। সেখানে তাকে এস আলম ও আবদুল ওয়াহেদের যোগসাজশে নির্বাচিত পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথমদিকে এ আসামি পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। আদালতের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরাও বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি।
তবে মামলার বাদী আবদুচ ছামাদ জানিয়েছেন, এজাহারে উল্লেখিত মো. শাহাবুদ্দিনই পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “মামলার এজাহারে ১২ নম্বর আসামি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু রাষ্ট্রপতি কি না, তা আমার জানা নেই। আমি ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী হিসেবে মামলা দায়ের করেছি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে তালিকা দিয়েছে, তার ভিত্তিতেই মামলা করা হয়েছে।”
৮ লাখ টাকার মূলধনের কোম্পানির ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড ইসলামী ব্যাংকের ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৩টি শেয়ার অধিগ্রহণ করে, যা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ৪ দশমিক ৮১৬০ শতাংশ। এসব শেয়ারের মূল্য প্রায় ২৫১ কোটি টাকা।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের অনুমোদিত মূলধন ছিল ৫০ কোটি টাকা হলেও পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ৮ লাখ টাকা। এত কম মূলধনের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণ আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মামলায় দাবি করা হয়েছে, আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পারস্পরিক যোগসাজশে এবং একই উদ্দেশ্যে জনগণের অর্থ ব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এ লেনদেন সম্পন্ন করেছেন।
এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
এজাহারে আরও বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মোট ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করেছে ২৪টি শেয়ারহোল্ডার কোম্পানি। এসব কোম্পানির অনেকগুলোই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, শেয়ার স্থানান্তরের প্রক্রিয়া, অর্থের উৎস এবং ক্রয়-বিক্রয়ের তারিখ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শেয়ার বিক্রি ও ক্রয়ের কার্যক্রম একই দিনে সম্পন্ন হয়েছে। এতে ধারণা করা হয়, পুরো প্রক্রিয়াটি পূর্বপরিকল্পিত ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ, এর মালিকপক্ষ, সংশ্লিষ্ট ২৪টি কোম্পানি এবং তাদের মনোনীত পরিচালকেরা সম্মিলিতভাবে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশল গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন এবং বিনিয়োগের আড়ালে ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অন্য আসামিরা
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াহেদ, চেয়ারম্যান মিস মিরফাত আরা বেগম, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম), ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন, আরাস্ত খান, অধ্যাপক মো. নাজমুল হাসান, আবু সাইদ মোহাম্মদ কাশেম, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সৈয়দ আবু আসাদ, মো. কামরুল হোসেন, আহসান আলম, অধ্যাপক ডা. মো. সেলিম উদ্দিন, শওকত হোসেন, খুরশিদ-উল-আলম, অধ্যাপক ডা. কাজী শহীদুল আলম, মেজর জেনারেল (অব.) ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন, জামাল মোস্তফা চৌধুরী এবং অধ্যাপক ডা. মো. সিরাজুল করিম।
মামলা দায়েরের পর আদালত পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ছাড়া অন্য আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
তবে অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
বিশেষ প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক। 


















