ঢাকা, ২৫ জুলাই ২০২৬: দেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম কেলেঙ্কারি হিসেবে চিহ্নিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ ও শেয়ার জালিয়াতির ঘটনায় উঠে এসেছে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ‘জেএমসি বিল্ডার্স’-এর নাম । আজ ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এই সংক্রান্ত একটি চাঞ্চল্যকর ও বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে । প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব, বেনামি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জনগনের আমানতের বিশাল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মো. সাহাবুদ্দিন বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘জেএমসি বিল্ডার্স’-এর মনোনীত পরিচালক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকে প্রবেশ করেন । পরবর্তীতে তিনি ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী দায়িত্ব লাভ করেন । ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন । অভিযোগ রয়েছে, এই দীর্ঘ সময়কালে তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে নামে-বেনামে বিশাল অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের পথ সুগম করেছিলেন ।
বেনামি প্রতিষ্ঠান ও ঋণের নামে অর্থ পাচার
বিএফআইইউ-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদকালে ইসলামী ব্যাংক থেকে জেএমসি বিল্ডার্সসহ মোট ২৪টি বেনামি, ভুঁইফোড় ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয় । ব্যাংকিং বিধিমালা তোয়াক্কা না করে, কোনো প্রকার উপযুক্ত জামানত ছাড়াই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় করা হয়েছিল । বর্তমানে এই ঋণের সিংহভাগই খেলাপি হয়ে পড়েছে এবং অর্থ আদায়ের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, যা ব্যাংকিং ভাষায় অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
শেয়ার জালিয়াতি ও এস আলম সংযোগ
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রেও চরম জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ভুয়া ও কাগুজে ঋণের মাধ্যমে অর্থ তুলে এনে তা দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনা হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূলত এস আলম গ্রুপ এবং মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর স্বার্থসংশ্লিষ্ট চক্র ব্যাংকটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কুক্ষিগত করে । জেএমসি বিল্ডার্স কাগজে-কলমে আলাদা সত্তা হলেও এটি মূলত এস আলমের মালিকানাধীন এবং মো. সাহাবুদ্দিন ছিলেন এর মূল অংশীদার ও প্রতিনিধি ।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী পদক্ষেপ
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে আজ এই প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয় । আদালত বিএফআইইউ-এর এই প্রতিবেদনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়েছেন। এই বিশাল আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতির নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে এবং অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে পুরো বিষয়টি আরও বিশদভাবে তদন্ত করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । আগামী বুধবার এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে, যেখানে দুদকের প্রাথমিক পদক্ষেপ ও অগ্রগতির বিষয়ে আদালতকে অবহিত করা হতে পারে ।
নিজস্ব প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক। 





















