নিজস্ব প্রতিবেদক-প্রান্তিক।
দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে এলপিজির ঊর্ধ্বমুখী দামে নাভিশ্বাস ওঠা গ্রাহকদের জন্য অবশেষে এলো কিছুটা স্বস্তির খবর। আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য হ্রাসের প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। সেই ধারাবাহিকতায় জুলাই মাসের জন্য ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজির বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৫৭ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। একই সঙ্গে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও প্রতি লিটারে ১৬ টাকা ৫৩ পয়সা কমিয়ে ৭০ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এই মূল্য ২ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন মূল্য ঘোষণা করে বিইআরসি জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর জুলাই মাসের সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস (Saudi CP) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় দেশীয় বাজারেও মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কমিশনের হিসাবে প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫ ধরে প্রতি মেট্রিক টনের গড় সৌদি সিপি ৫৯৩ মার্কিন ডলার বিবেচনায় এনে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন ঘোষণার ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের পাশাপাশি সব ধরনের বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দামও আনুপাতিক হারে কমেছে। ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি এলপিজির নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২৭ টাকা ৩০ পয়সা, যা আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
তবে সরকারি খাতের এলপিজি ব্যবহারকারীদের জন্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ১২ দশমিক ৫০ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য আগের মতোই বহাল রাখা হয়েছে।
চলতি বছরের এলপিজির মূল্যপঞ্জি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে দুই দফায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম মোট ৫৯৯ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। সেই সময় বাড়তি ব্যয়ের চাপ সরাসরি বহন করতে হয়েছিল সাধারণ গ্রাহকদের। পরে জুন মাসে প্রথম দফায় ৫৫ টাকা দাম কমানো হয়। আর জুলাইয়ের নতুন ঘোষণায় আরও ৩৫৭ টাকা কমানোয় জুন ও জুলাই—এই দুই মাসে মোট ৪১২ টাকা মূল্য হ্রাস পেয়েছে। এতে কয়েক মাসের ব্যবধানে এলপিজির বাজারে আবারও স্বস্তির আবহ ফিরেছে।
বিইআরসি জানিয়েছে, নতুন নির্ধারিত মূল্য শুধু বোতলজাত এলপিজির ক্ষেত্রেই নয়, রেটিকুলেটেড এলপিজি ও অটোগ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী উৎপাদক, বোতলজাতকারী, পরিবেশক, ডিলার কিংবা খুচরা বিক্রেতা—কোনো পর্যায়েই নির্ধারিত দামের বেশি মূল্যে এলপিজি বা অটোগ্যাস বিক্রি করা যাবে না। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বাস্তব বাজারের চিত্র নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভোক্তাদের অভিযোগ, বিইআরসি ঘোষিত মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ সংকট কিংবা অতিরিক্ত কমিশনের অজুহাতে অনেক খুচরা বিক্রেতা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করেন। ফলে সরকারি ঘোষণায় দাম কমলেও সেই সুফল সব গ্রাহকের হাতে সমানভাবে পৌঁছায় না।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমার সুবিধা যাতে প্রকৃত অর্থেই সাধারণ ভোক্তার ঘরে পৌঁছে, সে জন্য শুধু মূল্য ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত বাজার তদারকি, কার্যকর নজরদারি এবং কমিশনের নির্ধারিত মূল্য কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ। তাহলেই এলপিজির এই মূল্যহ্রাস সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা হলেও কমাতে বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক-প্রান্তিক। 























