Dhaka ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবরুদ্ধ স্বৈরাচার -দমনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ ‘বাংলা ব্লকেড’

জহিরুল ইসলাম-উপসম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক।

১ ও ২ জুলাইয়ের যে স্ফুলিঙ্গ রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছিল, ৩ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যভাগে তা রূপ নেয় এক প্রলয়ংকরী দাবদাহে। স্বৈরাচারের দম্ভ চূর্ণ করতে এই দিনগুলোতে ছাত্র-জনতা প্রবর্তন করে এক নতুন বিপ্লবী হাতিয়ার—‘বাংলা ব্লকেড’। ঢাকার পিচঢালা পথ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মহাসড়ক, সর্বত্র শাসকের বুটের তলাকে অচল করে দিয়েছিল তরুণের অদম্য পদযাত্রা।

দৈনিক প্রান্তিকের বিশেষ আয়োজনে আজ প্রকাশিত হলো মহান জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব।

রক্তিম প্রচ্ছদ: জুলাইয়ের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

১ ও ২ জুলাইয়ের রাজপথ কাঁপানো পদযাত্রার পর, ৩ জুলাইয়ের ভোরের আলো ফুটল এক নতুন প্রতীক্ষা নিয়ে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর তরুণ সারথিরা তখন নির্বাহী বিভাগের টেবিলে কোটা বাতিলের চূড়ান্ত আলটিমেটাম ছুড়ে দিয়েছে। ৪ জুলাই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এজলাস থেকে যখন হাইকোর্টের আদেশের ওপর এক মরীচিকার মতো ‘স্থিতাবস্থা’র ঘোষণা এল, স্বৈরাচারের স্তাবকেরা ভেবেছিল—তরুণেরা বুঝি এবার ঘরে ফিরে যাবে। কিন্তু তারা চিনতে ভুল করেছিল এই প্রজন্মকে। মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে তরুণেরা সেদিন ঘোষণা করল, “এ লড়াই আইনের মারপ্যাঁচের নয়, এ লড়াই ন্যায়ের। রাজপথের ফয়সালাই হবে আমাদের শেষ ইশতেহার।”

৫ এবং ৬ জুলাইয়ের দিনগুলো ছিল আন্দোলনের শরীরজুড়ে এক অদৃশ্য সাংগঠনিক জাল বুনে যাওয়ার দিন। ঢাকা তখন এক শান্ত কিন্তু জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। লোকচক্ষুর আড়ালে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমে, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির করিডোরে আর দেশের প্রত্যন্ত জেলাগুলোর চায়ের দোকানে তৈরি হচ্ছিল লড়াইয়ের নকশা। ৬ জুলাইয়ের কালবৈশাখী রাতের অন্ধকারকে চিরে হঠাৎ জেগে উঠল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া আর সুফিয়া কামাল হল। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন ছাত্রীদের সুতীক্ষ্ণ কণ্ঠের স্লোগান—কোটা না মেধা? মেধা মেধা!” হলের দেয়াল টপকে পিচঢালা রাজপথে আছড়ে পড়ল, তখন গণভবনের অলিন্দে প্রথম ভয়ের ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গিয়েছিল। নারীদের এই অকুতোভয় জাগরণ বুঝিয়ে দিল, এই আন্দোলন আর কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে নেই।

৭ জুলাই দুপুরের সূর্য যখন মধ্যগগনে, তখন বাংলাদেশের বুকে জন্ম নিল এক নতুন বিপ্লবী হাতিয়ার—বাংলা ব্লকেড। এটি কেবল সড়ক অবরোধ ছিল না, এটি ছিল স্বৈরাচারের বুক লক্ষ্য করে ছুড়ে দেওয়া এক চরম অবাধ্যতার তীর।

দেখতে দেখতে শাহবাগ মোড় রূপ নিল এক মানবসমুদ্রে। নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, মহাখালী, প্রগতি সরণি থেকে শুরু করে যাত্রাবাড়ীর প্রতিটি মোড় যেন একেকটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ৮ জুলাই এই ব্লকেড রূপ নিল এক মহাকাব্যে। ঢাকার রাজপথ ছাড়িয়ে তা আছড়ে পড়ল মহাসড়কে। সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সাঁজোয়া যানের সামনে দাঁড়িয়ে গেল জাহাঙ্গীরনগরের অকুতোভয় বুক। কুমিল্লার কোটবাড়ি আর চট্টগ্রামের মহাসড়কে তরুণেরা হাত ধরাধরি করে গড়ে তুলল মুক্তির ব্যারিকেড। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রেললাইনের ওপর বুক পেতে বসে পড়ল, থমকে গেল ট্রেনের চাকা। ঢাকা তখন এক অবরুদ্ধ দ্বীপ, স্বৈরাচারের ক্ষমতার অহংকার যেন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ছটফট করছিল।

৯ ও ১০ জুলাইয়ের আকাশে যেন রক্তের লাল আভা দেখা দিল। অহংকারে অন্ধ, সিংহাসন হারানোর ভয়ে কম্পমান স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা বুঝতে পেরেছিল, এই তরুণদের বুক স্রেফ হুমকিতে কাঁপানো যাবে না। তাই সে লেলিয়ে দিল তার পোষা ‘হেলমেট ও লাঠি বাহিনী’কে (ছাত্রলীগ)।

১০ জুলাই রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে যখন ছাত্রীরা ব্যানার ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন ইতিহাসের সবচেয়ে কাপুরুষোচিত দৃশ্যটি মঞ্চস্থ হলো। পুলিশের নীরব প্রশ্রয়ে ছাত্রলীগের গুন্ডারা লাঠি আর রড নিয়ে চড়াও হলো সেই অকুতোভয় বোনদের ওপর। বাতাসে উড়ল ছেঁড়া ওড়না, পিচঢালা রাজপথে প্রথম ঝরল তরুণের পবিত্র রক্তবিন্দু। একই সাথে রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে চলল টিয়ার শেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের তাণ্ডব। কিন্তু স্বৈরাচারী বুলেটের চেয়েও তীব্র ছিল তরুণের জেদ। রক্তে রাঙানো শরীর নিয়ে হসপিটালের বেডে শুয়েও তারা গেয়ে উঠল মুক্তির গান।

৩ থেকে ১০ জুলাইয়ের এই রক্তঝরা, ঘামঝরা দিনগুলো প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, এই লড়াই আর কেবল চাকরির কোটা সংস্কারের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই। ‘বাংলা ব্লকেড’ ছিল স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে এদেশের আমজনতার সামগ্রিক বিদ্রোহের এক নান্দনিক ও রূঢ় বহিঃপ্রকাশ। ৭ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে রাজপথে ঝরে পড়া প্রতিটি রক্তবিন্দু হয়ে উঠেছিল এক একটি অক্ষয় বীজ। এই রক্তই পরবর্তী সময়ে আবু সাঈদ আর মুগ্ধদের আত্মত্যাগের অগ্নিপথ তৈরি করেছিল, যা ৫ আগস্টের মহাবিজয়কে ত্বরান্বিত করে এই জনপদকে স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত করেছিল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম গ্রেপ্তার

অবরুদ্ধ স্বৈরাচার -দমনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ ‘বাংলা ব্লকেড’

Update Time : ০৫:০৯:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

জহিরুল ইসলাম-উপসম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক।

১ ও ২ জুলাইয়ের যে স্ফুলিঙ্গ রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছিল, ৩ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যভাগে তা রূপ নেয় এক প্রলয়ংকরী দাবদাহে। স্বৈরাচারের দম্ভ চূর্ণ করতে এই দিনগুলোতে ছাত্র-জনতা প্রবর্তন করে এক নতুন বিপ্লবী হাতিয়ার—‘বাংলা ব্লকেড’। ঢাকার পিচঢালা পথ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মহাসড়ক, সর্বত্র শাসকের বুটের তলাকে অচল করে দিয়েছিল তরুণের অদম্য পদযাত্রা।

দৈনিক প্রান্তিকের বিশেষ আয়োজনে আজ প্রকাশিত হলো মহান জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব।

রক্তিম প্রচ্ছদ: জুলাইয়ের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

১ ও ২ জুলাইয়ের রাজপথ কাঁপানো পদযাত্রার পর, ৩ জুলাইয়ের ভোরের আলো ফুটল এক নতুন প্রতীক্ষা নিয়ে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর তরুণ সারথিরা তখন নির্বাহী বিভাগের টেবিলে কোটা বাতিলের চূড়ান্ত আলটিমেটাম ছুড়ে দিয়েছে। ৪ জুলাই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এজলাস থেকে যখন হাইকোর্টের আদেশের ওপর এক মরীচিকার মতো ‘স্থিতাবস্থা’র ঘোষণা এল, স্বৈরাচারের স্তাবকেরা ভেবেছিল—তরুণেরা বুঝি এবার ঘরে ফিরে যাবে। কিন্তু তারা চিনতে ভুল করেছিল এই প্রজন্মকে। মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে তরুণেরা সেদিন ঘোষণা করল, “এ লড়াই আইনের মারপ্যাঁচের নয়, এ লড়াই ন্যায়ের। রাজপথের ফয়সালাই হবে আমাদের শেষ ইশতেহার।”

৫ এবং ৬ জুলাইয়ের দিনগুলো ছিল আন্দোলনের শরীরজুড়ে এক অদৃশ্য সাংগঠনিক জাল বুনে যাওয়ার দিন। ঢাকা তখন এক শান্ত কিন্তু জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। লোকচক্ষুর আড়ালে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমে, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির করিডোরে আর দেশের প্রত্যন্ত জেলাগুলোর চায়ের দোকানে তৈরি হচ্ছিল লড়াইয়ের নকশা। ৬ জুলাইয়ের কালবৈশাখী রাতের অন্ধকারকে চিরে হঠাৎ জেগে উঠল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া আর সুফিয়া কামাল হল। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন ছাত্রীদের সুতীক্ষ্ণ কণ্ঠের স্লোগান—কোটা না মেধা? মেধা মেধা!” হলের দেয়াল টপকে পিচঢালা রাজপথে আছড়ে পড়ল, তখন গণভবনের অলিন্দে প্রথম ভয়ের ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গিয়েছিল। নারীদের এই অকুতোভয় জাগরণ বুঝিয়ে দিল, এই আন্দোলন আর কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে নেই।

৭ জুলাই দুপুরের সূর্য যখন মধ্যগগনে, তখন বাংলাদেশের বুকে জন্ম নিল এক নতুন বিপ্লবী হাতিয়ার—বাংলা ব্লকেড। এটি কেবল সড়ক অবরোধ ছিল না, এটি ছিল স্বৈরাচারের বুক লক্ষ্য করে ছুড়ে দেওয়া এক চরম অবাধ্যতার তীর।

দেখতে দেখতে শাহবাগ মোড় রূপ নিল এক মানবসমুদ্রে। নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, মহাখালী, প্রগতি সরণি থেকে শুরু করে যাত্রাবাড়ীর প্রতিটি মোড় যেন একেকটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ৮ জুলাই এই ব্লকেড রূপ নিল এক মহাকাব্যে। ঢাকার রাজপথ ছাড়িয়ে তা আছড়ে পড়ল মহাসড়কে। সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সাঁজোয়া যানের সামনে দাঁড়িয়ে গেল জাহাঙ্গীরনগরের অকুতোভয় বুক। কুমিল্লার কোটবাড়ি আর চট্টগ্রামের মহাসড়কে তরুণেরা হাত ধরাধরি করে গড়ে তুলল মুক্তির ব্যারিকেড। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রেললাইনের ওপর বুক পেতে বসে পড়ল, থমকে গেল ট্রেনের চাকা। ঢাকা তখন এক অবরুদ্ধ দ্বীপ, স্বৈরাচারের ক্ষমতার অহংকার যেন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ছটফট করছিল।

৯ ও ১০ জুলাইয়ের আকাশে যেন রক্তের লাল আভা দেখা দিল। অহংকারে অন্ধ, সিংহাসন হারানোর ভয়ে কম্পমান স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা বুঝতে পেরেছিল, এই তরুণদের বুক স্রেফ হুমকিতে কাঁপানো যাবে না। তাই সে লেলিয়ে দিল তার পোষা ‘হেলমেট ও লাঠি বাহিনী’কে (ছাত্রলীগ)।

১০ জুলাই রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে যখন ছাত্রীরা ব্যানার ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন ইতিহাসের সবচেয়ে কাপুরুষোচিত দৃশ্যটি মঞ্চস্থ হলো। পুলিশের নীরব প্রশ্রয়ে ছাত্রলীগের গুন্ডারা লাঠি আর রড নিয়ে চড়াও হলো সেই অকুতোভয় বোনদের ওপর। বাতাসে উড়ল ছেঁড়া ওড়না, পিচঢালা রাজপথে প্রথম ঝরল তরুণের পবিত্র রক্তবিন্দু। একই সাথে রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে চলল টিয়ার শেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের তাণ্ডব। কিন্তু স্বৈরাচারী বুলেটের চেয়েও তীব্র ছিল তরুণের জেদ। রক্তে রাঙানো শরীর নিয়ে হসপিটালের বেডে শুয়েও তারা গেয়ে উঠল মুক্তির গান।

৩ থেকে ১০ জুলাইয়ের এই রক্তঝরা, ঘামঝরা দিনগুলো প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, এই লড়াই আর কেবল চাকরির কোটা সংস্কারের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই। ‘বাংলা ব্লকেড’ ছিল স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে এদেশের আমজনতার সামগ্রিক বিদ্রোহের এক নান্দনিক ও রূঢ় বহিঃপ্রকাশ। ৭ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে রাজপথে ঝরে পড়া প্রতিটি রক্তবিন্দু হয়ে উঠেছিল এক একটি অক্ষয় বীজ। এই রক্তই পরবর্তী সময়ে আবু সাঈদ আর মুগ্ধদের আত্মত্যাগের অগ্নিপথ তৈরি করেছিল, যা ৫ আগস্টের মহাবিজয়কে ত্বরান্বিত করে এই জনপদকে স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত করেছিল।