শহীদী মার্চ, অসহযোগ আন্দোলন এবং এক দফার চূড়ান্ত ঘোষণা: ২৯ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট
মোঃ আলফাজ উদ্দিন
সম্পাদক, দৈনিক প্রান্তিক
২৯ জুলাই: শহীদদের রক্তের শপথে ‘শহীদী মার্চ’
জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে আন্দোলনের গতি আর কেবল একটি ছাত্র-আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি পরিণত হচ্ছিল সমগ্র জাতির নৈতিক বিদ্রোহে। ডিবি কার্যালয়ে সমন্বয়কদের জিম্মি করে আন্দোলন স্তব্ধ করার যে পরিকল্পনা ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার নিয়েছিল, তা ব্যর্থ হওয়ার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব নতুন কৌশল গ্রহণ করে। ২৯ জুলাই দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ‘শহীদী মার্চ’ কর্মসূচি পালিত হয়। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেট, গাজীপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ—প্রায় প্রতিটি শহরে শহীদদের স্মরণে নীরব মিছিল, কালো ব্যাজ ধারণ এবং গণপ্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
শহীদী মার্চের মূল শক্তি ছিল এর নৈতিক আবেদন। হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র; ছিল শহীদদের ছবি, রক্তমাখা ব্যানার, জাতীয় পতাকা এবং ন্যায়বিচারের দাবি। রাজপথে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে—“রক্তের ঋণ শোধ হবে”, “শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না”, “জবাব চাই, বিচার চাই”। আন্দোলনের এই নতুন রূপে মধ্যবিত্ত, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং অভিভাবকদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমানভাবে বেড়ে যায়। আন্দোলন স্পষ্টতই একটি সর্বজনীন গণআন্দোলনের চরিত্র ধারণ করতে শুরু করে।
৩০ ও ৩১ জুলাই: দমন-পীড়নের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে অসহযোগের বীজ
সরকারি বাহিনীর কঠোর নজরদারি, গণগ্রেপ্তার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মধ্যেও আন্দোলনের কৌশল আরও পরিবর্তিত হতে থাকে। রাজপথের পাশাপাশি কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক পরিসরে শুরু হয় নীরব অসহযোগের প্রস্তুতি। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়। অনেক শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচারের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে নতুন আহ্বান—স্বৈরাচারের অন্যায় নির্দেশ মানা হবে না, অন্যায়ের সঙ্গে সহযোগিতা করা হবে না। নাগরিকদের মধ্যে একটি উপলব্ধি জন্ম নিতে থাকে যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তি কেবল অস্ত্রে নয়; জনগণের সহযোগিতার ওপরও নির্ভরশীল। আর সেই সহযোগিতাই ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করার প্রস্তুতি নিতে থাকে সাধারণ মানুষ।
এ সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিবাদী দেয়ালচিত্র, মোমবাতি প্রজ্বলন, গণদোয়া, শোকসভা এবং প্রতীকী কর্মসূচি আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে। শহীদদের স্মৃতি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রেরণায় পরিণত হয়।
১ আগস্ট: আন্দোলনের রাজনৈতিক বিস্তার
আগস্টের প্রথম দিন থেকেই আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। বিভিন্ন সামাজিক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠন প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও বিভিন্ন দেশে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় আসে।
দেশের ভেতরে মানুষের মধ্যে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠছিল—এটি আর কেবল কোটা সংস্কারের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনা, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকে—“এই লড়াই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের।”
২ আগস্ট: শহীদদের স্মরণে জনসমুদ্র
২ আগস্ট বিভিন্ন স্থানে শহীদদের স্মরণে শোকসভা, দোয়া মাহফিল এবং স্মরণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরিবার হারানোর বেদনা আর জাতির ক্ষোভ একসঙ্গে মিশে আন্দোলনকে আরও আবেগঘন করে তোলে। শহীদদের প্রতিকৃতি হাতে হাজার হাজার মানুষ নীরব অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সরকারের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। আন্দোলনের নেতৃত্ব বারবার শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ওপর গুরুত্বারোপ করে এবং উসকানিতে পা না দেওয়ার আহ্বান জানায়। এই সংযম আন্দোলনের নৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে।
৩ আগস্ট: ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ‘এক দফা’
৩ আগস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন। দীর্ঘ কর্মসূচি, দমন-পীড়ন এবং শতাধিক প্রাণহানির পর আন্দোলনের নেতৃত্ব ঘোষণা করে ‘এক দফা’ দাবি। সেই এক দফার মূল কথা ছিল—স্বৈরাচারী সরকারের পদত্যাগ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে নতুন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথ উন্মুক্ত করা।
এই ঘোষণার মাধ্যমে আন্দোলনের লক্ষ্য সুস্পষ্ট ও একীভূত হয়ে ওঠে। বিচ্ছিন্ন দাবিগুলো একত্রিত হয়ে জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাখো মানুষ এই ঘোষণার প্রতি সমর্থন জানায়। ছাত্র, তরুণ, শ্রমজীবী, পেশাজীবী, নারী, প্রবীণ—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এক কণ্ঠে ঘোষণা করতে থাকেন যে, সংগ্রাম আর পেছনে ফেরার নয়।
রাজপথে তখন নতুন স্লোগানের ঢেউ—“এক দফা, এক দাবি”, “জনতার রায় মানতে হবে”, “বাংলাদেশ জেগেছে”। আন্দোলনের গতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে রাষ্ট্রের দমননীতি আর জনতার মনোবল ভাঙতে সক্ষম হচ্ছিল না।
ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ
২৯ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৌশলগত রূপান্তরের সময়। এই কয়েক দিনে আন্দোলন প্রতিবাদ থেকে প্রতিরোধে, প্রতিরোধ থেকে অসহযোগে এবং অসহযোগ থেকে এক দফার সর্বজনীন রাজনৈতিক দাবিতে উত্তীর্ণ হয়। শহীদদের আত্মত্যাগ আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যেখানে ভয় ধীরে ধীরে পরাজিত হয় এবং আশা জাতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
শহীদী মার্চ মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলেছিল, অসহযোগ আন্দোলন রাষ্ট্রযন্ত্রের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, আর ৩ আগস্টের এক দফা ঘোষণা জাতিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ইতিহাসের গতিপথ তখন আর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ রাখেনি। সামনে অপেক্ষা করছিল আন্দোলনের সবচেয়ে নির্ধারক অধ্যায়—জনতার সর্বাত্মক অভ্যুত্থান।
(চলবে… আগামী পর্বে পড়ুন: ৪ ও ৫ আগস্টের সর্বাত্মক অসহযোগ, গণঅভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার পতনের চূড়ান্ত অধ্যায়।)
মোঃ আলফাজ উদ্দিন সম্পাদক, দৈনিক প্রান্তিক। 




















