বন্দী শিবিরের প্রহসন এবং দেয়ালচিত্রের মহাবিপ্লব: ২২ থেকে ২৮ জুলাই
জহিরুল ইসলাম, উপসম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক ।
২২ থেকে ২৪ জুলাই: বুলেটের পর ডিবির অন্ধকূপ এবং রিমান্ডের বিভীষিকা
১৮ থেকে ২১ জুলাইয়ের নির্বিচার গণহত্যার পর, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার ভাবল বুলেটের স্তূপ দিয়ে বুঝি তরুণের কণ্ঠরোধ করা গেছে। কিন্তু ভেতরের আগুন নেভেনি তা বুঝতে পেরে ২৪ জুলাই থেকে শুরু হলো এক নতুন ও নোংরা খেলা। আন্দোলনের মূল কাণ্ডারিদের নিষ্ক্রিয় করতে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুনুর রশীদ (ভাতবাবু)-এর নির্দেশে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও গোপন আস্তানা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদারসহ অন্য সমন্বয়কদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে।
বাইরে তখনো কারফিউর থমথমে বুটের শব্দ, আর ভেতরের অন্ধকূপে জিম্মি তরুণদের ওপর চালানো হচ্ছিল প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক নির্যাতন। স্বৈরাচারী সরকার মনে করেছিল, এই কয়েকজন তরুণকে খাঁচায় বন্দী করলেই বুঝি কোটি তরুণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মরে যাবে।
২৫ ও ২৬ জুলাই: ডিবির জোরপূর্বক ‘প্রত্যাহার নাটক’ এবং জাতির ধিক্কার
২৬ জুলাই রাতে বাঙালির টেলিভিশনের পর্দায় মঞ্চস্থ হলো ইতিহাসের অন্যতম এক ধিক্কারজনক প্রহসন। ডিবি কার্যালয়ে জিম্মি থাকা সমন্বয়কদের সামনে জোর করে এক বাটি ডাল-ভাত সাজিয়ে ছবি তুলে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এরপর এক লিখিত স্ক্রিপ্ট দিয়ে প্রধান সমন্বয়কদের ক্যামেরার সামনে বলতে বাধ্য করা হয়—“আমাদের দাবি পূরণ হয়েছে, আমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।”
কিন্তু স্বৈরাচারের এই চাণক্য চাল বুমেরাং হয়ে আছড়ে পড়ল তাদের নিজেদের ওপরই। স্ক্রিপ্ট পড়ার সময় নাহিদ ইসলামের চোখের ফোলা দাগ আর আসিফ মাহমুদের মুখের ক্লান্তি দেখে বাংলার মানুষ বুঝে নিয়েছিল, এটি বন্দুকের নলের মুখে নেওয়া এক জবরদস্তিমূলক জবানবন্দি। ডিবি প্রধান হারুনুর রশীদের এই ‘ভাত খাওয়ানো ও নাটক’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক তীব্র ট্রল ও ঘৃণার জোয়ার সৃষ্টি করে। রাজপথের তরুণেরা একযোগে স্লোগান তুলল—“ডিবির ভাতের থালায় থুতু দাও, রাজপথের দখল নাও!” জিম্মি সমন্বয়কদের অনুপস্থিতিতেই আন্দোলনের দ্বিতীয় সারির নেতারা ঘোষণা করলেন, বন্দীশালার কোনো বিবৃতি মুক্তিকামী ছাত্রসমাজ মানে না।
২৭ ও ২৮ জুলাই: তুলির টানে প্রতিরোধ এবং ‘দেয়াল লিখনের’ মহাবিপ্লব
রাজপথে যখন কারফিউর সাঁজোয়া যান টহল দিচ্ছিল, ঠিক তখনই বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এক নতুন ও নান্দনিক যুদ্ধের সূচনা করল। বন্দুকের বিপরীতে তারা হাতে তুলে নিল তুলি, স্প্রে ক্যান আর রঙের কৌটা। ২৭ ও ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে পুরো ঢাকা শহরসহ গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রংপুরের প্রতিটি ল্যাম্পপোস্ট, কালভার্ট আর বহুতল ভবনের দেয়াল রূপ নিল এক একটি অবাধ্যতার ক্যানভাসে।
- দেয়ালের ভাষা যখন বুলেটের চেয়েও তীব্র: ঢাকার শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব ও জিপিও এবং গাজীপুরের চান্দনা ও মাওনার ধূসর দেয়ালগুলো রাঙিয়ে তোলা হলো বিপ্লবী সব স্লোগানে। দেয়ালের বুকে ফুটে উঠল—“বিকল্প কে? বিকল্প মেধা!”, “পানি লাগবে কারো, পানি?”, “রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি”, এবং “স্বৈরাচার নিপাত যাক”।
- গ্রাফিতির মহাকাব্য:চারুকলার শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ স্কুল-কলেজের কিশোরেরা রং-তুলি দিয়ে এঁকে ফেলল বীর আবু সাঈদের সেই দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেওয়ার অবিনাশী অবয়ব। অবরুদ্ধ বাংলাদেশের দেয়ালগুলো যেন চিৎকার করে বলতে শুরু করল স্বৈরাচারের পতনের বার্তা। বন্দুক দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ করা গেলেও, দেয়ালের এই অবিনাশী ভাষা বন্ধ করার সাধ্য স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের ছিল না। এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ভেতরের ভয়কে এক লহমায় দূর করে দিল।
২২ থেকে ২৮ জুলাইয়ের এই দিনগুলো প্রমাণ করেছিল যে, একটি গণঅভ্যুত্থান যখন আমজনতার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তখন শুধু কয়েকজন নেতাকে বন্দী করে বা টিভি পর্দায় মিথ্যা নাটক সাজিয়ে তাকে থামানো যায় না। ডিবির অন্ধকূপে সমন্বয়কদের জিম্মি করার কাপুরুষতা আর তার জবাবে রাজপথের তরুণদের তুলির টানে দেয়াল রাঙানোর এই মহাবিপ্লব স্বৈরাচারের নৈতিক পরাজয় সম্পূর্ণ করে দিয়েছিল। এই দেয়াল লিখনগুলোই ছিল আসলে ৫ আগস্টের স্বাধীনতার দেয়ালিকা, যা পুরো জাতিকে এক দফার চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল।
(চলবে… আগামী পর্বে পড়ুন: ২৯ জুলাই থেকে ৩ আগস্টের ‘শহীদী মার্চ’, অসহযোগ আন্দোলন এবং এক দফার চূড়ান্ত ঘোষণা)
জহিরুল ইসলাম, উপসম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক । 




















