Dhaka ১২:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বন্দী শিবিরের প্রহসন এবং দেয়ালচিত্রের মহাবিপ্লব: ২২ থেকে ২৮ জুলাই

মহান জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিক প্রতিবেদন (পর্ব ৫)

১৮ থেকে ২১ জুলাইয়ের নির্বিচার গণহত্যার পর, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার ভাবল বুলেটের স্তূপ দিয়ে বুঝি তরুণের কণ্ঠরোধ করা গেছে। কিন্তু ভেতরের আগুন নেভেনি তা বুঝতে পেরে ২৪ জুলাই থেকে শুরু হলো এক নতুন ও নোংরা খেলা। আন্দোলনের মূল কাণ্ডারিদের নিষ্ক্রিয় করতে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুনুর রশীদ (ভাতবাবু)-এর নির্দেশে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও গোপন আস্তানা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদারসহ অন্য সমন্বয়কদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে।

বাইরে তখনো কারফিউর থমথমে বুটের শব্দ, আর ভেতরের অন্ধকূপে জিম্মি তরুণদের ওপর চালানো হচ্ছিল প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক নির্যাতন। স্বৈরাচারী সরকার মনে করেছিল, এই কয়েকজন তরুণকে খাঁচায় বন্দী করলেই বুঝি কোটি তরুণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মরে যাবে।


২৬ জুলাই রাতে বাঙালির টেলিভিশনের পর্দায় মঞ্চস্থ হলো ইতিহাসের অন্যতম এক ধিক্কারজনক প্রহসন। ডিবি কার্যালয়ে জিম্মি থাকা সমন্বয়কদের সামনে জোর করে এক বাটি ডাল-ভাত সাজিয়ে ছবি তুলে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এরপর এক লিখিত স্ক্রিপ্ট দিয়ে প্রধান সমন্বয়কদের ক্যামেরার সামনে বলতে বাধ্য করা হয়—“আমাদের দাবি পূরণ হয়েছে, আমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।”


রাজপথে যখন কারফিউর সাঁজোয়া যান টহল দিচ্ছিল, ঠিক তখনই বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এক নতুন ও নান্দনিক যুদ্ধের সূচনা করল। বন্দুকের বিপরীতে তারা হাতে তুলে নিল তুলি, স্প্রে ক্যান আর রঙের কৌটা। ২৭ ও ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে পুরো ঢাকা শহরসহ গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রংপুরের প্রতিটি ল্যাম্পপোস্ট, কালভার্ট আর বহুতল ভবনের দেয়াল রূপ নিল এক একটি অবাধ্যতার ক্যানভাসে।


২২ থেকে ২৮ জুলাইয়ের এই দিনগুলো প্রমাণ করেছিল যে, একটি গণঅভ্যুত্থান যখন আমজনতার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তখন শুধু কয়েকজন নেতাকে বন্দী করে বা টিভি পর্দায় মিথ্যা নাটক সাজিয়ে তাকে থামানো যায় না। ডিবির অন্ধকূপে সমন্বয়কদের জিম্মি করার কাপুরুষতা আর তার জবাবে রাজপথের তরুণদের তুলির টানে দেয়াল রাঙানোর এই মহাবিপ্লব স্বৈরাচারের নৈতিক পরাজয় সম্পূর্ণ করে দিয়েছিল। এই দেয়াল লিখনগুলোই ছিল আসলে ৫ আগস্টের স্বাধীনতার দেয়ালিকা, যা পুরো জাতিকে এক দফার চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম গ্রেপ্তার

বন্দী শিবিরের প্রহসন এবং দেয়ালচিত্রের মহাবিপ্লব: ২২ থেকে ২৮ জুলাই

মহান জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিক প্রতিবেদন (পর্ব ৫)

Update Time : ০২:৫৮:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

১৮ থেকে ২১ জুলাইয়ের নির্বিচার গণহত্যার পর, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার ভাবল বুলেটের স্তূপ দিয়ে বুঝি তরুণের কণ্ঠরোধ করা গেছে। কিন্তু ভেতরের আগুন নেভেনি তা বুঝতে পেরে ২৪ জুলাই থেকে শুরু হলো এক নতুন ও নোংরা খেলা। আন্দোলনের মূল কাণ্ডারিদের নিষ্ক্রিয় করতে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুনুর রশীদ (ভাতবাবু)-এর নির্দেশে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও গোপন আস্তানা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদারসহ অন্য সমন্বয়কদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে।

বাইরে তখনো কারফিউর থমথমে বুটের শব্দ, আর ভেতরের অন্ধকূপে জিম্মি তরুণদের ওপর চালানো হচ্ছিল প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক নির্যাতন। স্বৈরাচারী সরকার মনে করেছিল, এই কয়েকজন তরুণকে খাঁচায় বন্দী করলেই বুঝি কোটি তরুণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মরে যাবে।


২৬ জুলাই রাতে বাঙালির টেলিভিশনের পর্দায় মঞ্চস্থ হলো ইতিহাসের অন্যতম এক ধিক্কারজনক প্রহসন। ডিবি কার্যালয়ে জিম্মি থাকা সমন্বয়কদের সামনে জোর করে এক বাটি ডাল-ভাত সাজিয়ে ছবি তুলে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এরপর এক লিখিত স্ক্রিপ্ট দিয়ে প্রধান সমন্বয়কদের ক্যামেরার সামনে বলতে বাধ্য করা হয়—“আমাদের দাবি পূরণ হয়েছে, আমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।”


রাজপথে যখন কারফিউর সাঁজোয়া যান টহল দিচ্ছিল, ঠিক তখনই বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এক নতুন ও নান্দনিক যুদ্ধের সূচনা করল। বন্দুকের বিপরীতে তারা হাতে তুলে নিল তুলি, স্প্রে ক্যান আর রঙের কৌটা। ২৭ ও ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে পুরো ঢাকা শহরসহ গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রংপুরের প্রতিটি ল্যাম্পপোস্ট, কালভার্ট আর বহুতল ভবনের দেয়াল রূপ নিল এক একটি অবাধ্যতার ক্যানভাসে।


২২ থেকে ২৮ জুলাইয়ের এই দিনগুলো প্রমাণ করেছিল যে, একটি গণঅভ্যুত্থান যখন আমজনতার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তখন শুধু কয়েকজন নেতাকে বন্দী করে বা টিভি পর্দায় মিথ্যা নাটক সাজিয়ে তাকে থামানো যায় না। ডিবির অন্ধকূপে সমন্বয়কদের জিম্মি করার কাপুরুষতা আর তার জবাবে রাজপথের তরুণদের তুলির টানে দেয়াল রাঙানোর এই মহাবিপ্লব স্বৈরাচারের নৈতিক পরাজয় সম্পূর্ণ করে দিয়েছিল। এই দেয়াল লিখনগুলোই ছিল আসলে ৫ আগস্টের স্বাধীনতার দেয়ালিকা, যা পুরো জাতিকে এক দফার চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল।