Dhaka ০৩:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হৃদস্পন্দন থমকে যাওয়া চার মিনিট: মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে বেলজিয়ামের বিশ্বকাপের মহাকাব্য

মোঃ রওশন আলী -বিশেষ প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক।

ঘড়ির কাঁটায় তখন ৮৫ মিনিট। স্টেডিয়ামের বিশাল স্কোরবোর্ডে ভেসে উঠছে এক নির্মম বাস্তবতা—বেলজিয়াম ০, সেনেগাল ২। গ্যালারির লাল জার্সিধারী সমর্থকদের মুখে গভীর হতাশা। কোথাও এক শিশুর অঝোর কান্না, কোথাও দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে থাকা এক প্রবীণ সমর্থক। মনে হচ্ছিল, আর কয়েক মিনিট পরই শেষ হয়ে যাবে একটি প্রজন্মের বিশ্বকাপ-স্বপ্ন।

কিন্তু ফুটবল এমনই এক খেলা, যেখানে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো গল্পই শেষ হয় না।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর নাটকীয় লড়াইয়ে সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখাল বেলজিয়াম। নির্ধারিত সময়ের শেষ চার মিনিটে দুই গোল করে ম্যাচে ফিরে এসে অতিরিক্ত সময়ের অন্তিম মুহূর্তে জয়সূচক গোল আদায় করে ৩-২ ব্যবধানে সেনেগালকে হারিয়ে ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখল ইউরোপের দলটি।

ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য ছিল সেনেগালের। আফ্রিকার প্রতিনিধিরা গতি, শক্তি ও আক্রমণাত্মক ফুটবলে বারবার বিপর্যস্ত করে তুলেছিল বেলজিয়ামের রক্ষণভাগকে। ২৫ মিনিটে হাবিব দিয়ার দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে প্রথম গোল করে সেনেগালকে এগিয়ে দেন। বিরতির পরপরই ইসমাইলা সার ব্যবধান দ্বিগুণ করলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে যায় আফ্রিকান দলটির হাতে।

সময় গড়াতে থাকে। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত বেলজিয়ামের খেলায় ফেরার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না। মাঠে খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় ফুটে উঠছিল পরাজয়ের ছায়া, আর গ্যালারিতে সেনেগালের সমর্থকেরা উৎসবে মেতে উঠেছিলেন। অন্যদিকে বেলজিয়ামের সমর্থকদের চোখে তখন কেবল হতাশা।

এরপরই শুরু হয় সেই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের কাহিনি।

৮৬ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা রোমেলু লুকাকু যেন একাই ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেন। তাঁর শক্তিশালী শটে ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ২-১। তখনও অনেকেই ভেবেছিলেন, এটি হয়তো শুধুই সম্মানরক্ষার গোল।

কিন্তু তিন মিনিট পরই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।

ডান প্রান্ত থেকে আসা নিখুঁত ক্রসে আকাশে ভেসে উঠে অধিনায়ক ইউরি টিলেমান্স হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন। স্কোরলাইন ২-২। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে গ্যালারিতে কান্নার সুর ছিল, সেখানে তখন বিস্ফোরিত হয় উল্লাসের ঢেউ। হতাশায় ভেঙে পড়া হাজারো সমর্থক নতুন করে বিশ্বাস করতে শুরু করেন—ফুটবলে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

অতঃপর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ক্লান্তি তখন দুই দলের শরীরেই স্পষ্ট, কিন্তু জয়ের আকাঙ্ক্ষা একটুও কমেনি। যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি পেনাল্টি শুটআউটের দিকেই এগোচ্ছে, ঠিক তখনই আসে শেষ নাটকীয় মোড়।

১২৫তম মিনিটে সেনেগালের বক্সে ফাউলের ঘটনায় পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। মুহূর্তেই নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। পেনাল্টি স্পটে দাঁড়ান ইউরি টিলেমান্স। অসীম স্নায়ুচাপ উপেক্ষা করে ঠান্ডা মাথায় তিনি বল জালে পাঠিয়ে দেন। সেই গোলই নিশ্চিত করে বেলজিয়ামের ৩-২ ব্যবধানের অবিশ্বাস্য জয়।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ফুটে ওঠে ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম অথচ সবচেয়ে সুন্দর দুই বিপরীত ছবি। সেনেগালের খেলোয়াড়েরা হতাশায় মাঠেই লুটিয়ে পড়েন; নিশ্চিত জয় শেষ মুহূর্তে হারিয়ে যাওয়ার বেদনা তাদের স্তব্ধ করে দেয়। অন্যদিকে বেলজিয়ামের খেলোয়াড়েরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আবেগে ভেঙে পড়েন। সেই অশ্রু ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার আনন্দের, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস হারিয়ে না ফেলার পুরস্কারের।

এই জয় শুধু নকআউট পর্বে টিকে থাকার গল্প নয়; এটি ফুটবলের অনিশ্চয়তা, মানসিক দৃঢ়তা এবং শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার এক অনন্য প্রতীক। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত যে দলটি বিদায়ের প্রহর গুনছিল, মাত্র চার মিনিটের বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তনে তারাই লিখে ফেলল বিশ্বকাপের স্মরণীয় এক মহাকাব্য।

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলোর স্কোরলাইন সময়ের সঙ্গে মুছে যায়, কিন্তু গল্প থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বেলজিয়াম–সেনেগালের এই রুদ্ধশ্বাস লড়াই নিঃসন্দেহে সেই বিরল ম্যাচগুলোর একটি—যেখানে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে শুধু একটি দল নয়, জয়ী হয়েছে আশা, বিশ্বাস এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার অদম্য মানসিকতা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম গ্রেপ্তার

হৃদস্পন্দন থমকে যাওয়া চার মিনিট: মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে বেলজিয়ামের বিশ্বকাপের মহাকাব্য

Update Time : ০৫:২২:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

মোঃ রওশন আলী -বিশেষ প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক।

ঘড়ির কাঁটায় তখন ৮৫ মিনিট। স্টেডিয়ামের বিশাল স্কোরবোর্ডে ভেসে উঠছে এক নির্মম বাস্তবতা—বেলজিয়াম ০, সেনেগাল ২। গ্যালারির লাল জার্সিধারী সমর্থকদের মুখে গভীর হতাশা। কোথাও এক শিশুর অঝোর কান্না, কোথাও দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে থাকা এক প্রবীণ সমর্থক। মনে হচ্ছিল, আর কয়েক মিনিট পরই শেষ হয়ে যাবে একটি প্রজন্মের বিশ্বকাপ-স্বপ্ন।

কিন্তু ফুটবল এমনই এক খেলা, যেখানে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো গল্পই শেষ হয় না।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর নাটকীয় লড়াইয়ে সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখাল বেলজিয়াম। নির্ধারিত সময়ের শেষ চার মিনিটে দুই গোল করে ম্যাচে ফিরে এসে অতিরিক্ত সময়ের অন্তিম মুহূর্তে জয়সূচক গোল আদায় করে ৩-২ ব্যবধানে সেনেগালকে হারিয়ে ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখল ইউরোপের দলটি।

ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য ছিল সেনেগালের। আফ্রিকার প্রতিনিধিরা গতি, শক্তি ও আক্রমণাত্মক ফুটবলে বারবার বিপর্যস্ত করে তুলেছিল বেলজিয়ামের রক্ষণভাগকে। ২৫ মিনিটে হাবিব দিয়ার দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে প্রথম গোল করে সেনেগালকে এগিয়ে দেন। বিরতির পরপরই ইসমাইলা সার ব্যবধান দ্বিগুণ করলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে যায় আফ্রিকান দলটির হাতে।

সময় গড়াতে থাকে। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত বেলজিয়ামের খেলায় ফেরার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না। মাঠে খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় ফুটে উঠছিল পরাজয়ের ছায়া, আর গ্যালারিতে সেনেগালের সমর্থকেরা উৎসবে মেতে উঠেছিলেন। অন্যদিকে বেলজিয়ামের সমর্থকদের চোখে তখন কেবল হতাশা।

এরপরই শুরু হয় সেই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের কাহিনি।

৮৬ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা রোমেলু লুকাকু যেন একাই ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেন। তাঁর শক্তিশালী শটে ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ২-১। তখনও অনেকেই ভেবেছিলেন, এটি হয়তো শুধুই সম্মানরক্ষার গোল।

কিন্তু তিন মিনিট পরই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।

ডান প্রান্ত থেকে আসা নিখুঁত ক্রসে আকাশে ভেসে উঠে অধিনায়ক ইউরি টিলেমান্স হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন। স্কোরলাইন ২-২। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে গ্যালারিতে কান্নার সুর ছিল, সেখানে তখন বিস্ফোরিত হয় উল্লাসের ঢেউ। হতাশায় ভেঙে পড়া হাজারো সমর্থক নতুন করে বিশ্বাস করতে শুরু করেন—ফুটবলে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

অতঃপর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ক্লান্তি তখন দুই দলের শরীরেই স্পষ্ট, কিন্তু জয়ের আকাঙ্ক্ষা একটুও কমেনি। যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি পেনাল্টি শুটআউটের দিকেই এগোচ্ছে, ঠিক তখনই আসে শেষ নাটকীয় মোড়।

১২৫তম মিনিটে সেনেগালের বক্সে ফাউলের ঘটনায় পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। মুহূর্তেই নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। পেনাল্টি স্পটে দাঁড়ান ইউরি টিলেমান্স। অসীম স্নায়ুচাপ উপেক্ষা করে ঠান্ডা মাথায় তিনি বল জালে পাঠিয়ে দেন। সেই গোলই নিশ্চিত করে বেলজিয়ামের ৩-২ ব্যবধানের অবিশ্বাস্য জয়।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ফুটে ওঠে ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম অথচ সবচেয়ে সুন্দর দুই বিপরীত ছবি। সেনেগালের খেলোয়াড়েরা হতাশায় মাঠেই লুটিয়ে পড়েন; নিশ্চিত জয় শেষ মুহূর্তে হারিয়ে যাওয়ার বেদনা তাদের স্তব্ধ করে দেয়। অন্যদিকে বেলজিয়ামের খেলোয়াড়েরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আবেগে ভেঙে পড়েন। সেই অশ্রু ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার আনন্দের, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস হারিয়ে না ফেলার পুরস্কারের।

এই জয় শুধু নকআউট পর্বে টিকে থাকার গল্প নয়; এটি ফুটবলের অনিশ্চয়তা, মানসিক দৃঢ়তা এবং শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার এক অনন্য প্রতীক। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত যে দলটি বিদায়ের প্রহর গুনছিল, মাত্র চার মিনিটের বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তনে তারাই লিখে ফেলল বিশ্বকাপের স্মরণীয় এক মহাকাব্য।

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলোর স্কোরলাইন সময়ের সঙ্গে মুছে যায়, কিন্তু গল্প থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বেলজিয়াম–সেনেগালের এই রুদ্ধশ্বাস লড়াই নিঃসন্দেহে সেই বিরল ম্যাচগুলোর একটি—যেখানে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে শুধু একটি দল নয়, জয়ী হয়েছে আশা, বিশ্বাস এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার অদম্য মানসিকতা।