Dhaka ০২:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদরাসা শিক্ষকদের বেতন না ছাড়ায় দুর্ভোগ

ইএফটি জটিলতায় ঝুলে আছে মে মাসের বেতন, সংসদে ক্ষোভ; দ্রুত সমাধানের আশ্বাস সরকারের

জহিরুল ইসলাম, উপসম্পাদক, দৈনিক প্রান্তিক | ১৮ জুন ২০২৬

দেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাদরাসাগুলোর হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী মে মাসের বেতন-ভাতা না পেয়ে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। সাধারণত প্রতি মাসের শুরুতেই বেতনের সরকারি অংশ ছাড় করা হলেও জুন মাসের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও মে মাসের বেতন হাতে না আসায় পরিবার চালানো, বাসাভাড়া পরিশোধ, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ বহন এবং চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা। ঈদুল আজহার আগে বেতন পাওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তাও পূরণ হয়নি।

মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বেতন প্রদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে ধীরে ধীরে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় তথ্য যাচাই, ব্যাংক হিসাব সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত কিছু জটিলতার কারণে মে মাসের বেতন ছাড়ে বিলম্ব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সমস্যাগুলো সমাধানের কাজ চলছে এবং দ্রুত বেতন ছাড়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। গত ১৬ জুন সংসদে রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীন অভিযোগ করেন, জুন মাসের ১৬ তারিখেও মাদরাসার শিক্ষকরা বেতন পাননি। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষক আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন; কেউ কেউ পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ও বহন করতে পারছেন না। সংসদে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

শিক্ষক নেতারা বলছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য বেতনই একমাত্র নির্ভরতার উৎস। সময়মতো বেতন না পেলে তাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন অবিলম্বে মে মাসের বেতন-ভাতা ছাড় এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

তাদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার কথা বলা হলেও বাস্তবে বেতন প্রদানের ক্ষেত্রে এখনও নানা প্রশাসনিক জটিলতা রয়ে গেছে। ফলে প্রায়ই শিক্ষক-কর্মচারীদের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের মাদরাসাগুলোতে কর্মরত শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতার সরকারি অংশ গত ৪ মে ছাড় করা হয়েছিল এবং শিক্ষকরা তখন নিয়মিতভাবে বেতন উত্তোলন করতে পেরেছিলেন। এর আগে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও অন্যান্য মাসের বেতনও নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি সময়ে ছাড় হয়েছিল। কিন্তু মে মাসের বেতন নিয়ে এবার অস্বাভাবিক বিলম্ব দেখা দিয়েছে, যা শিক্ষক সমাজে উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ইএফটি ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে বেতন সরাসরি শিক্ষকদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে যাবে। এতে মধ্যবর্তী জটিলতা কমবে এবং ভবিষ্যতে বেতন প্রদানে বিলম্বের সম্ভাবনাও অনেকাংশে হ্রাস পাবে। তবে শিক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পাশাপাশি বর্তমানে আটকে থাকা বেতন দ্রুত ছাড় করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় কয়েক লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এবং এই খাতের শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শিক্ষা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত বেতন প্রদান ব্যাহত হলে শিক্ষকদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত বেতন পরিশোধের পাশাপাশি বেতন ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও স্থায়ী কাঠামোর আওতায় আনার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম গ্রেপ্তার

মাদরাসা শিক্ষকদের বেতন না ছাড়ায় দুর্ভোগ

Update Time : ০৪:১৮:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

ইএফটি জটিলতায় ঝুলে আছে মে মাসের বেতন, সংসদে ক্ষোভ; দ্রুত সমাধানের আশ্বাস সরকারের

জহিরুল ইসলাম, উপসম্পাদক, দৈনিক প্রান্তিক | ১৮ জুন ২০২৬

দেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাদরাসাগুলোর হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী মে মাসের বেতন-ভাতা না পেয়ে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। সাধারণত প্রতি মাসের শুরুতেই বেতনের সরকারি অংশ ছাড় করা হলেও জুন মাসের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও মে মাসের বেতন হাতে না আসায় পরিবার চালানো, বাসাভাড়া পরিশোধ, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ বহন এবং চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা। ঈদুল আজহার আগে বেতন পাওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তাও পূরণ হয়নি।

মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বেতন প্রদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে ধীরে ধীরে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় তথ্য যাচাই, ব্যাংক হিসাব সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত কিছু জটিলতার কারণে মে মাসের বেতন ছাড়ে বিলম্ব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সমস্যাগুলো সমাধানের কাজ চলছে এবং দ্রুত বেতন ছাড়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। গত ১৬ জুন সংসদে রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীন অভিযোগ করেন, জুন মাসের ১৬ তারিখেও মাদরাসার শিক্ষকরা বেতন পাননি। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষক আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন; কেউ কেউ পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ও বহন করতে পারছেন না। সংসদে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

শিক্ষক নেতারা বলছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য বেতনই একমাত্র নির্ভরতার উৎস। সময়মতো বেতন না পেলে তাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন অবিলম্বে মে মাসের বেতন-ভাতা ছাড় এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

তাদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার কথা বলা হলেও বাস্তবে বেতন প্রদানের ক্ষেত্রে এখনও নানা প্রশাসনিক জটিলতা রয়ে গেছে। ফলে প্রায়ই শিক্ষক-কর্মচারীদের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের মাদরাসাগুলোতে কর্মরত শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতার সরকারি অংশ গত ৪ মে ছাড় করা হয়েছিল এবং শিক্ষকরা তখন নিয়মিতভাবে বেতন উত্তোলন করতে পেরেছিলেন। এর আগে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও অন্যান্য মাসের বেতনও নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি সময়ে ছাড় হয়েছিল। কিন্তু মে মাসের বেতন নিয়ে এবার অস্বাভাবিক বিলম্ব দেখা দিয়েছে, যা শিক্ষক সমাজে উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ইএফটি ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে বেতন সরাসরি শিক্ষকদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে যাবে। এতে মধ্যবর্তী জটিলতা কমবে এবং ভবিষ্যতে বেতন প্রদানে বিলম্বের সম্ভাবনাও অনেকাংশে হ্রাস পাবে। তবে শিক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পাশাপাশি বর্তমানে আটকে থাকা বেতন দ্রুত ছাড় করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় কয়েক লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এবং এই খাতের শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শিক্ষা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত বেতন প্রদান ব্যাহত হলে শিক্ষকদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত বেতন পরিশোধের পাশাপাশি বেতন ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও স্থায়ী কাঠামোর আওতায় আনার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।