ক্রীড়া প্রতিবেদক, দৈনিক প্রান্তিক
ঢাকা, ২৯ মে ২০২৬:
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞ ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’ শুরু হতে আর মাত্র ১৩ দিন বাকি। আগামী ১১ জুন (বাংলাদেশ সময় ১২ জুন রাত ০১:০০ টা) মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়াম-এ স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা-র উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠবে এই বৈশ্বিক আসরের।
বাংলাদেশ দল এই টুর্নামেন্টে না থাকলেও, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বরাবরের মতোই পুরো বাংলাদেশে শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা ও টানটান উত্তেজনা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম-অঞ্চল—সবখানেই এখন কেবলই ফুটবল জ্বর, পাড়া-মহল্লায় পতাকার যুদ্ধ ও রঙের ছোঁয়া।
বিশ্বকাপের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, দেশের আকাশ ততই নীল-সাদা কিংবা হলুদ-সবুজে ছেয়ে যাচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও বগুড়াসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে চলছে জার্সি ও পতাকা বিক্রির ধুম। সমর্থকেরা নিজেদের প্রিয় দল আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি কিংবা পর্তুগাল-এর সমর্থনে বাড়ির ছাদ, দেয়াল এবং রাস্তা রাঙিয়ে তুলছেন।
চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—সব বয়সী মানুষের আড্ডার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু এখন আসন্ন বিশ্বকাপ। এবারের বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ হতে যাচ্ছে বড় পর্দায় খেলা দেখার যৌথ আয়োজন। দেশের বিভিন্ন ক্লাব, মোড় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে প্রজেক্টর ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সাউন্ড সিস্টেম প্রস্তুত করা হচ্ছে।
স্থানীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সূত্র অনুযায়ী, ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা আরও বাড়িয়ে দিতে এবার বিশ্বকাপের আয়োজক তিন দেশজুড়ে ১৩টি বড় অফিসিয়াল ‘ফ্যান জোন’ বা ‘ফিফা ফ্যান ফেস্টিভ্যাল’ প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আটটি শহর—আটলান্টার সেন্টেনিয়াল অলিম্পিক পার্ক, বোস্টনের সিটি হল স্কয়ার, ডালাসের ফেয়ার পার্ক, হিউস্টনের ডালাস স্ট্রিট ডাউনটাউন, কানসাস সিটির ন্যাশনাল ডব্লিউডব্লিউআই মেমোরিয়াল, লস অ্যাঞ্জেলেস মেমোরিয়াল কলিসিয়াম, মায়ামির বেফ্রন্ট পার্ক এবং ফিলাডেলফিয়ার লেমন হিল পার্কে ফ্যান জোন স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া কানাডার টরন্টোর ফোর্ট ইয়র্ক ও ভ্যাঙ্কুভারের হেস্টিংস পার্ক এবং মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটির জোকালো স্কয়ার, গুয়াদালাহারার জোনা সেন্ট্রো ও মনতেরের পার্কে বিশাল পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন থাকছে। যেখানে হাজারো সমর্থক একসঙ্গে স্টেডিয়ামের আমেজে খেলা উপভোগ করতে পারবেন।
উচ্চ মূল্যের কারণে বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে শুরুতে বড় ধরনের শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনেও উঠে আসে। তবে শেষ মুহূর্তে এসে বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য মিলেছে বড় স্বস্তির খবর। সিঙ্গাপুরভিত্তিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের চুক্তি বাতিল করেছে ফিফা। এর ফলে বাংলাদেশের শীর্ষ ক্রীড়া চ্যানেল ‘টি স্পোর্টস’ এবং বেশ কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সরাসরি ফিফার সঙ্গে কম মূল্যে স্বত্ব কেনার আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দূরদর্শন বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-তেও খেলা দেখানোর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে, যার ফলে কোটি কোটি দর্শকের ঘরে বসেই খেলা দেখার অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কেটে যাচ্ছে।
ভার্চুয়াল দুনিয়ায়ও এখন মেসি-নেইমার ভক্তদের মাঠ গরম। ফেসবুক, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামে বাংলাদেশি ফুটবল ভক্তদের ট্রল, তর্ক-যুদ্ধ এবং প্রিয় খেলোয়াড়দের নিয়ে পোস্টের সংখ্যা আকাশচুম্বী। বিশেষ করে লিওনেল মেসি-র এটিই শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে এবং নেইমার জুনিয়র-এর ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা নিয়ে সমর্থকদের মাঝে চলছে তুমুল বিশ্লেষণ।
সব মিলিয়ে, ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ম্যাচগুলো বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী গভীর রাতে কিংবা ভোরে অনুষ্ঠিত হলেও, সময়সূচি কোনো বাধাই হতে পারছে না দেশের ফুটবলপাগল মানুষের কাছে। আর মাত্র ১৩ দিনের অপেক্ষা, এরপরই এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পুরো বাংলাদেশ মেতে উঠবে বিশ্ব ফুটবলের এই চরম উন্মাদনায়।
ক্রীড়া প্রতিবেদক 














