ঢাকা, ২৯ জুলাই, ২০২৬ ।। ২০১৮ সালে কক্সবাজারের টেকনাফে পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তৎকালীন র্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) মিফতাহ উদ্দিন আহমেদকে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। গত সোমবার (২৭ জুলাই) রাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তাকে ঢাকা সেনানিবাসে সামরিক হেফাজতে নেওয়া হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: ২০১৮ সালের সেই কালো রাত
২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের নোয়াখালিয়া পাড়া এলাকায় র্যাবের একটি কথিত মাদকবিরোধী অভিযান চলে। ওই অভিযানে তৎকালীন র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং টানা ১২ বছর উপজেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্বে থাকা মো. একরামুল হক নিহত হন। তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একে একটি ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’ হিসেবে দাবি করলেও পরবর্তীতে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এটি ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করা হয়।
অডিও ফাঁসের সেই নির্মম সত্য
একরামুল হক নিহত হওয়ার পর তার স্ত্রী আয়েশা বেগম একটি সংবাদ সম্মেলন করেন এবং কয়েকটি কল রেকর্ড বা অডিও ক্লিপ প্রকাশ করেন। অডিওতে শোনা যায়, র্যাবের হেফাজতে থাকা অবস্থায় একরামুল তার পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই লাইভ ফোনে তার ওপর গুলির শব্দ, বন্দুকের ট্রিগার টানার আওয়াজ এবং এক ব্যক্তির গোঙানি শুনতে পান তার স্ত্রী ও সন্তানরা। এই নির্মম অডিও রেকর্ডটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় ওঠে, যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আসল চিত্র উন্মোচন করে দেয়।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
এই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার জেরে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং এর ৭ জন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের পাশাপাশি তৎকালীন লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদের নামও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার ফলে তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়。
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আইসিটিতে মামলা
২০১৮ সালে এই ঘটনা ঘটলেও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো ফৌজদারি মামলা বা আইনি প্রক্রিয়া সচল করা সম্ভব হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে মানবাধিকার নিশ্চিতের অংশ হিসেবে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ দেওয়া হয়।
গত রোববার (২৬ জুলাই, ২০২৬) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন একরামুল হক হত্যাকাণ্ডকে “মানবতাবিরোধী অপরাধ” হিসেবে গণ্য করে ট্রাইব্যুনাল-২-এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে। এই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদির ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বা সূক্ষ্ম পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তিনি একরামুলের সম্পত্তিও দখল করেন। মামলায় অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং বেনজীর আহমেদ।
যেভাবে হেফাজতে নেওয়া হলো মিফতাহকে
আইসিটির বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এর পরপরই সামরিক বাহিনী সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বরিশাল সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। সেখান থেকে এনে ঢাকা সেনানিবাসের ‘স্বপ্নচূড়া-১’ ভবনের ৫১৬ নম্বর কক্ষ থেকে সহকারী অ্যাডজুট্যান্ট ও কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেলের মাধ্যমে রাত ১০টা ৩৯ মিনিটে তাকে সেনা সদর দপ্তরের ‘ওল্ড মেসে’ (লগ এরিয়া) স্থানান্তর করে সামরিক হেফাজতে নেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে জানানো হয়েছে যে, নাগরিকদের জানমাল রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বর্তমানে মিফতাহ উদ্দিন আহমেদকে প্রচলিত আইনের আওতায় এনে পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার প্রস্তুতি চলছে
মোঃ আলফাজ উদ্দিন,সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক। 


















