ভারতে বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর আন্দোলন এখন কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং তরুণদের এক গণজাগরণে পরিণত হয়েছে। দিল্লির যন্তর-মন্তরে চলমান অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও তরুণ ছুটে আসছেন। তাদের কেউ রাতভর ট্রেন-বাসে ভ্রমণ করে পৌঁছেছেন, আবার কেউ পরিবারের আপত্তির আশঙ্কায় কাউকে কিছু না জানিয়েই বাড়ি ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
সোমবারের ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির পর যন্তর-মন্তরের আন্দোলনস্থলে উঠে এসেছে বহু হৃদয়স্পর্শী গল্প। মুম্বাই, প্রয়াগরাজ, হরিয়ানা, বিহার, উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণদের অনেকেই জানিয়েছেন, পরিবারের বাধা এড়াতে গোপনেই দিল্লিতে এসেছেন। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, এটি শুধু একটি পরীক্ষা বা একটি নিয়োগের প্রশ্ন নয়; বরং ভবিষ্যৎ, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের লড়াই।
প্রয়াগরাজ (সাবেক এলাহাবাদ) থেকে আসা ১৫ বছর বয়সী রাজ চার দিন আগে কাউকে কিছু না জানিয়েই বাড়ি ছেড়ে দিল্লিতে আসে। আন্দোলনস্থলে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে ঠান্ডা পানীয় ও খাবার বিতরণে ব্যস্ত এই কিশোর জানায়, সে কোনো ব্যাগও আনেনি।
রাজের ভাষায়, “আমি ব্যাগ নিয়ে আসিনি, কারণ বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি। পরিবার জানতে পারলে কখনোই আসতে দিত না।”
একই জেলার আরেক তরুণী পরিচয় গোপন রাখতে মুখে মাস্ক ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, তাঁর বাবা, আত্মীয়স্বজন এবং গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ক্ষমতাসীন বিজেপির সমর্থক। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে পারিবারিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়তে হবে বলেই তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না।
মুম্বাই থেকে আসা এক কিশোরীও পরিবারের অমতে ট্রেনে চড়ে একাই দিল্লিতে পৌঁছেছেন। তাঁর দাবি, বাবা-মা পকেটমানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বাড়ি ফিরতে বললেও তিনি নিজের অধিকারের প্রশ্নে আপস করবেন না। প্রয়োজনে কাজ করে নিজের খরচ চালাবেন, তবুও আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াবেন না।
যন্তর-মন্তরের আন্দোলনস্থলে বিপ্লবী ভগত সিং, ড. বি. আর. আম্বেদকর, চন্দ্রশেখর আজাদ, সাবিত্রীবাই ফুলে ও জ্যোতিরাও ফুলের প্রতিকৃতি বহন করতে দেখা গেছে আন্দোলনকারীদের। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন প্রতীক ও স্লোগান ব্যবহার করে তাঁরা বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং জবাবদিহির দাবি তুলছেন।
বিশেষভাবে নজর কেড়েছে ১৯২৯ সালে ভগত সিংয়ের কারাবন্দি অবস্থায় অনশন কর্মসূচির উদ্ধৃতি সম্বলিত একটি ব্যানার। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে—‘বধিরদের শুনতে বাধ্য করাই ছিল উদ্দেশ্য, কাউকে হত্যা করা নয়।’ আন্দোলনকারীদের মতে, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ আজও অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে রয়েছে।
‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে কালো রঙের ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ লেখা টি-শার্ট পরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে মিছিল করেন। তাঁর সঙ্গে হাজারো তরুণ একই স্লোগানে মুখর হয়ে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা করেন। আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৯ বছর বয়সী নিট পরীক্ষার্থী রোহিনী কুমার নামে এক শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। যন্তর-মন্তরে দেয়ালচিত্র আঁকার জন্য পরিচিত রোহিনীকে ২০ জুলাই থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না বলে দাবি করা হয়। পরে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাঁকে নিরাপদে খুঁজে পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, সিলামপুরের ৩৩ বছর বয়সী এক আন্দোলনকারীকে প্রায় এক মাস ধরে অনশন চালিয়ে যাওয়ার পর সোমবার বিকেলে পুলিশ আটক করেছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর বন্ধু রিজওয়ান। আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশি চাপ, ব্যারিকেড ও ধরপাকড়ের মধ্যেও যন্তর-মন্তরের অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
আন্তর্জাতিক ডেক্স-দৈনিক প্রান্তিক। 

























