Dhaka ০১:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩ শর্তে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স পুনর্বহাল: চালু হলো সব চিকিৎসাসেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
দীর্ঘ দেড় মাস বন্ধ থাকার পর অবশেষে শর্তসাপেক্ষে লাইসেন্স ফিরে পেয়েছে রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল. স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ তিনটি সুনির্দিষ্ট শর্ত প্রতিপালনের অঙ্গীকারে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করেছে। গত সোমবার (২৭ জুলাই, ২০২৬) এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়। আদেশ জারির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বহির্বিভাগ, অন্তঃবিভাগ এবং জরুরি বিভাগসহ সব ধরনের নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পুরোদমে চালু করেছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও লাইসেন্স বাতিল

চলতি বছরের মে মাসে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ থেকে ৪ দিন বয়সী ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় তীব্র জনঅসন্তোষ তৈরি হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে পোস্ট-অপারেটিভ রুমে অন-ডিউটি চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, নার্স ও কর্মীদের চরম অবহেলা এবং ৭০০ শয্যার হাসপাতালের তুলনায় দুর্বল অবকাঠামোগত ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায়। এই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১১ জুন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়।

আপিল, পুনর্বিবেচনা ও নতুন তদন্ত

লাইসেন্স বাতিলের পর দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষ ৭০০ শয্যার এই হাসপাতালটি চালুর দাবি জানায়। এর প্রেক্ষিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের অবকাঠামোগত ও আইসিইউর (ICU) ত্রুটি সংস্কার করে পুনর্বিবেচনার জন্য ২৪ জুন আপিল আবেদন দাখিল করে।

আবেদনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের নতুন তদন্ত কমিটিকে সরেজমিনে পরিদর্শনের নির্দেশ দেয়। গত ১৬ জুলাই তদন্ত কমিটি হাসপাতালটি পরিদর্শন করে এবং তাদের সংস্কার কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এই প্রতিবেদনের আলোকেই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে লাইসেন্স বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

পুনর্বহালের ৩টি বাধ্যতামূলক শর্ত

সরকারের পক্ষ থেকে আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে যে ৩টি শর্তে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো:

অর্ডিন্যান্স প্রতিপালন: হাসপাতালটিকে ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’-এর সমস্ত আইনি দিক ও নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

অন-ডিউটি জনবল নিয়োগ: লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী হাসপাতালে সার্বক্ষণিক প্রয়োজনীয় সংখ্যক অন-ডিউটি চিকিৎসক এবং নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া অনতিবিলম্বে সম্পন্ন করতে হবে।
আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি: ভবিষ্যতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাইসেন্সের যেকোনো শর্ত বা নিয়ম ভঙ্গ করলে সরকার যেকোনো সময় আইন অনুযায়ী সরাসরি লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে।

    হাসপাতাল ও সেবাগ্রহীতাদের প্রতিক্রিয়া: লাইসেন্স ফিরে পাওয়ার পর আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের কোম্পানি বিষয়ক পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল জানান, সরকারি আদেশ পাওয়ার পরপরই হাসপাতালের সব বিভাগের সেবা আগের মতো সচল করা হয়েছে। হাসপাতাল বন্ধ থাকায় প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি এবং শত শত দেশি ও বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল, যা এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।

    প্রথম দিনেই হাসপাতালের বহির্বিভাগে শত শত সাধারণ রোগী স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা নিতে ভিড় করেন এবং হাসপাতালের এই প্রত্যাবর্তনে স্বস্তি প্রকাশ করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেশের প্রচলিত আইন এবং সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখতে শতভাগ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।

    Tag :

    Write Your Comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Save Your Email and Others Information

    About Author Information

    Popular Post

    ৩ শর্তে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স পুনর্বহাল: চালু হলো সব চিকিৎসাসেবা

    ৩ শর্তে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স পুনর্বহাল: চালু হলো সব চিকিৎসাসেবা

    Update Time : ০৬:১৩:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

    নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
    দীর্ঘ দেড় মাস বন্ধ থাকার পর অবশেষে শর্তসাপেক্ষে লাইসেন্স ফিরে পেয়েছে রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল. স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ তিনটি সুনির্দিষ্ট শর্ত প্রতিপালনের অঙ্গীকারে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করেছে। গত সোমবার (২৭ জুলাই, ২০২৬) এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়। আদেশ জারির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বহির্বিভাগ, অন্তঃবিভাগ এবং জরুরি বিভাগসহ সব ধরনের নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পুরোদমে চালু করেছে।

    ঘটনার প্রেক্ষাপট ও লাইসেন্স বাতিল

    চলতি বছরের মে মাসে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ থেকে ৪ দিন বয়সী ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় তীব্র জনঅসন্তোষ তৈরি হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে পোস্ট-অপারেটিভ রুমে অন-ডিউটি চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, নার্স ও কর্মীদের চরম অবহেলা এবং ৭০০ শয্যার হাসপাতালের তুলনায় দুর্বল অবকাঠামোগত ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায়। এই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১১ জুন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়।

    আপিল, পুনর্বিবেচনা ও নতুন তদন্ত

    লাইসেন্স বাতিলের পর দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষ ৭০০ শয্যার এই হাসপাতালটি চালুর দাবি জানায়। এর প্রেক্ষিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের অবকাঠামোগত ও আইসিইউর (ICU) ত্রুটি সংস্কার করে পুনর্বিবেচনার জন্য ২৪ জুন আপিল আবেদন দাখিল করে।

    আবেদনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের নতুন তদন্ত কমিটিকে সরেজমিনে পরিদর্শনের নির্দেশ দেয়। গত ১৬ জুলাই তদন্ত কমিটি হাসপাতালটি পরিদর্শন করে এবং তাদের সংস্কার কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এই প্রতিবেদনের আলোকেই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে লাইসেন্স বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

    পুনর্বহালের ৩টি বাধ্যতামূলক শর্ত

    সরকারের পক্ষ থেকে আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে যে ৩টি শর্তে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো:

    অর্ডিন্যান্স প্রতিপালন: হাসপাতালটিকে ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’-এর সমস্ত আইনি দিক ও নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

    অন-ডিউটি জনবল নিয়োগ: লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী হাসপাতালে সার্বক্ষণিক প্রয়োজনীয় সংখ্যক অন-ডিউটি চিকিৎসক এবং নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া অনতিবিলম্বে সম্পন্ন করতে হবে।
    আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি: ভবিষ্যতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাইসেন্সের যেকোনো শর্ত বা নিয়ম ভঙ্গ করলে সরকার যেকোনো সময় আইন অনুযায়ী সরাসরি লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে।

      হাসপাতাল ও সেবাগ্রহীতাদের প্রতিক্রিয়া: লাইসেন্স ফিরে পাওয়ার পর আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের কোম্পানি বিষয়ক পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল জানান, সরকারি আদেশ পাওয়ার পরপরই হাসপাতালের সব বিভাগের সেবা আগের মতো সচল করা হয়েছে। হাসপাতাল বন্ধ থাকায় প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি এবং শত শত দেশি ও বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল, যা এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।

      প্রথম দিনেই হাসপাতালের বহির্বিভাগে শত শত সাধারণ রোগী স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা নিতে ভিড় করেন এবং হাসপাতালের এই প্রত্যাবর্তনে স্বস্তি প্রকাশ করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেশের প্রচলিত আইন এবং সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখতে শতভাগ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।