জহিরুল ইসলাম,উপসম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক।
ঢাকা,২৪ আগস্ট,২০২৬: রায় তো নয়, যেন এক খেয়ালি জাদুকরের তাসের টেক্কা ছড়ানো—একটি খুনের দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ১৬টা জলজ্যান্ত মানুষের ঘাড়ে এক কোপে ঝুলে গেল একই দড়ি! ফেনীর সোনাগাজীর সেই বহুলালোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় আইনি চুলচেরা বিশ্লেষণ না করে, অপরাধের ওজন না মেপে, এমন ঢালাও ফাঁসির হুকুম দেওয়া তৎকালীন বিচারক মামুনুর রশিদের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন হাইকোর্ট। আজ ২৪ আগস্ট ২০২৬, সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই নজিরবিহীন ও চাবুকের মতো কড়া রায় ঘোষণা করেন। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ওই বিচারককে অবিলম্বে এজলাস থেকে টেনে নামিয়ে বিচারিক ক্ষমতা থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে ওএসডি (বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে রাখতে হবে।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর যখন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ জন আসামির সবাইকে একসঙ্গে ফাঁসি কাঠে ঝোলানোর ফরমান শুনিয়েছিল, তখন চারদিকে হাততালি পড়েছিল বটে, কিন্তু আইনের চোখে সেই হাততালি যে কত বড় ফাঁকি, আজ তা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। হাইকোর্ট আজ গভীর ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ আর অপরাধের খতিয়ানে কার কী ভূমিকা ছিল, তা বিন্দুমাত্র খতিয়ে না দেখে সবাইকে একসঙ্গে যমদুয়ারে পাঠানোর এই হুকুম স্রেফ একটা ‘বাড়াবাড়ি’। এই অবিবেচকের মতো রায় সংশ্লিষ্ট ১৬টি পরিবারের ওপর যে কী তীব্র মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে, তার দায় বিচারক এড়াতে পারেন না। ওই বিচারকের ভেতরে সঠিক বিচারিক মানসিকতা ও পেশাদার দক্ষতার ন্যূনতম বালাই ছিল না বলেও আদালত পর্যবেক্ষণ দেন।
দীর্ঘ সাত বছর ধরে ঝুলে থাকা ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে উচ্চ আদালত আজ নিম্ন আদালতের সেই আবেগী ও ফাঁপা রায়কে ওলটপালট করে দিয়েছেন। ১৬ জনের ঢালাও ফাঁসি ভেঙে মাত্র ২ জনের সাজা বহাল রাখা হয়েছে। এই দুজন হলেন—ঘটনার মূল চক্রী, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন কামাতুর অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং তার প্রধান সহযোগী শাহাদাত হোসেন শামীম। এদের পাপের ঘড়া এতটাই পূর্ণ যে আইনের সুক্ষ্মতম ছাঁকনিতেও এদের পার পাওয়ার পথ ছিল না।
বাকিদের ক্ষেত্রে রায় নেমে এসেছে এক ভিন্ন বাস্তবতায়। উম্মে সুলতানা পপি, মোহাম্মদ নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেন জাবেদ ও ইফতেখার হোসেন রানা—এই চারজনের ফাঁসির দড়ি আলগা করে সাজা কমিয়ে আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বাকি ১০ জনের ক্ষেত্রে। পর্যাপ্ত ও অকাট্য প্রমাণের অভাব, আর নিম্ন আদালতের হুজুগে বিচার ব্যবস্থার কারণে মামলার বাকি ১০ আসামিকে পুরোপুরি বেকসুর খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই খালাস পাওয়া ১০ জনের মধ্যে আছেন স্থানীয় রাজনীতির দাপুটে খেলোয়াড়, আওয়ামী লীগের তৎকালীন উপজেলা সভাপতি রুহুল আমিন এবং পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম।
২০১৯ সালের এপ্রিলে সোনাগাজীর মাদ্রাসার ছাদে পরীক্ষা দিতে যাওয়া নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সেই বীভৎস দৃশ্য দেশজুড়ে যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছিল, নিম্ন আদালতের বিচারক সম্ভবত সেই আগুনের তাপেই নিজের বিচারিক কাণ্ডজ্ঞান পুড়িয়ে ছাই করেছিলেন। পৈশাচিক খুনের বিচার অবশ্যই কাম্য, কিন্তু বিচারকের চেয়ারে বসে আইনের তোয়াক্কা না করে স্রেফ লোকদেখানো সস্তা হাততালির জন্য সবাইকে একসঙ্গে ফাঁসি দেওয়া যে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ, হাইকোর্টের আজকের এই চাবুক মারা রায় তারই এক অমোঘ দলিল হয়ে থাকবে।
জহিরুল ইসলাম,উপসম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক। 




















