বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ তৈরি করে। বিদ্যুৎ বিল বাড়লে তার অভিঘাত শুধু একটি পরিবারের মাসিক বাজেটেই পড়ে না; বাড়ে উৎপাদন ব্যয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ, শিল্পের ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও। ফলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে নাগরিক অসন্তোষ স্বাভাবিক এবং গণতান্ত্রিক সমাজে সেই অসন্তোষ প্রকাশের অধিকারও মানুষের রয়েছে।
কিন্তু প্রতিবাদের নামে প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়াকে উদ্দেশ করে গালিগালাজ, ব্যক্তিগত বিষোদগার কিংবা অসংলগ্ন বক্তব্য কোনোভাবেই কার্যকর প্রতিবাদের বিকল্প হতে পারে না। গ্রহণযোগ্যও নয়।
সম্প্রতি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় “সিফাত” যে ভাষা ও ভঙ্গিতে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন, তাতে মূল সমস্যাটিই আড়ালে পড়ে গেছে। কতটা ধৃষ্টতা! কতটা বেয়াদবি! অর্থাৎ, সিফাতের ভাইরাল হওয়া ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের ভিডিওটি এতটাই বেপরোয়া ও অশালীন যে, এর কারণে একটি ন্যায্য প্রতিকারের বিষয়ও দেশের নাগরিক সমাজ এড়িয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুতের দাম কেন বাড়ানো হলো, এর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা কী, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার কোথায় সংকট, ভর্তুকির পরিমাণ কত, মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ওপর কী ধরনের চাপ পড়বে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের পরিবর্তে যদি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে ব্যক্তিগত গালিগালাজ, তাহলে সেটি প্রতিবাদকে শক্তিশালী করে না; বরং দুর্বল ভিত্তিহীন করে।
গালিগালাজ কোনো রাজনৈতিক যুক্তি নয়।
একজন সরকারপ্রধানের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করা যায়, এমনকি সেই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ ভুল, জনস্বার্থবিরোধী কিংবা অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক বলেও অভিহিত করা যায়। কিন্তু সমালোচনার শক্তি নির্ভর করে তার যুক্তি, তথ্য ও প্রমাণের ওপর—কণ্ঠের উচ্চতা কিংবা ব্যবহৃত অশালীন শব্দের ওপর নয়।
সিফাতের প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই। তিনি যদি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে চান, তাহলে তাকে প্রথমে বলতে হবে—মূল্য কত বেড়েছে, কেন বেড়েছে, কোন শ্রেণির গ্রাহক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সরকার চাইলে কোন বিকল্প পথে এই মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে পারত। তাকে বিদ্যুৎ খাতের অপচয়, সিস্টেম লস, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি আমদানি, চুক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎ ক্রয় কিংবা সংশ্লিষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে।
তারপর প্রয়োজন হতে পারে গণস্বাক্ষর, সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, স্মারকলিপি, জনশুনানি, নাগরিক সমাবেশ, গবেষণাভিত্তিক প্রচার এবং সাংবিধানিক ও আইনসম্মত অন্যান্য কর্মসূচি। অর্থাৎ প্রতিবাদকে হতে হবে পদ্ধতিগত, তথ্যনির্ভর এবং লক্ষ্যভিত্তিক।
অসংলগ্ন গালিগালাজের মাধ্যমে মুহূর্তের আবেগ প্রকাশ করা যেতে পারে; কিন্তু তাতে বিদ্যুতের দাম কমে না। সরকারের নীতিও পরিবর্তিত হয় না। বরং এমন আচরণ মূল দাবিটির গ্রহণযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—রাজনীতিতে ভাষারও একটি দায়িত্ব আছে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তির সমালোচনা করার অধিকার যেমন নাগরিকের রয়েছে, তেমনি সেই সমালোচনাকে শালীন, যুক্তিসঙ্গত ও দায়িত্বশীল রাখার দায়ও রয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলা গণতন্ত্রের শক্তি; কিন্তু ব্যক্তিগত কুৎসা বা অশ্রাব্য ভাষা গণতন্ত্রের শক্তি নয়।
সিফাতের উচিত ছিলো- নিজের ক্ষোভকে অস্বীকার না করে সেটিকে সংগঠিত প্রতিবাদে রূপ দেওয়া। কারণ ক্ষোভ যখন যুক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা রাজনৈতিক বক্তব্য। আর যুক্তিহীন ক্ষোভ যখন গালিগালাজে পরিণত হয়, তখন তা কেবল শব্দের অপচয়।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের জবাবদিহি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই জবাবদিহি আদায় করতে হলে প্রয়োজন তথ্য, পরিসংখ্যান, যুক্তি, বিকল্প প্রস্তাব এবং সংগঠিত নাগরিক চাপ। শুধু প্রধানমন্ত্রীকে গালাগাল করলে সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না।
সিফাতের সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই কঠোর সমালোচনার দাবি রাখে—বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে তার ক্ষোভের কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভ প্রকাশের পদ্ধতি যদি অসংলগ্ন ও পদ্ধতিহীন হয়, তাহলে প্রতিবাদটি শেষ পর্যন্ত মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আর ঘটনার গভীরে গিয়ে লাভ কী! কথা প্রসঙ্গে কথা নয়; সিফাত বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদের নামে যেটা করেছেন –সেটা আইন আমলে অপরাধ। দণ্ডবিধি, ১৮৬০”- এর ধারা ৫০৪ — ইচ্ছাকৃত অপমান ও শান্তিভঙ্গের প্ররোচনা, ধারা ২৯৪ — জনসমক্ষে অশ্লীল শব্দ/আচরণ, ধারা ৪৯৯ ও ৫০০ — মানহানি। আর এইসব ধারায় অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, অথবা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
প্রতিবাদ হোক তীব্র, কিন্তু যুক্তিনির্ভর। ভাষা হোক কঠোর, কিন্তু শালীন। প্রশ্ন হোক ধারালো, কিন্তু তথ্যসমৃদ্ধ। কারণ গণতন্ত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র গালি নয়—যুক্তি।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন.সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক। 













