Dhaka ০৬:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজীপুরে আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা: ঝটিকা মিছিলের আড়ালে পুরোনো নেটওয়ার্কের নতুন ছক

একটি দল ক্ষমতা হারাতে পারে, তার কার্যালয় বন্ধ হতে পারে, সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হতে পারে; কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক একদিনে অদৃশ্য হয় না। গাজীপুরে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা সেই বাস্তবতারই এক অস্বস্তিকর ছবি তুলে ধরছে।

রাজপথে বড় সমাবেশ নেই, প্রকাশ্য মিছিলের অনুমতি নেই, দলীয় কর্মসূচির বৈধতা নেই—তবু হঠাৎ কোথাও কয়েক মিনিটের মিছিল, কোথাও মহাসড়কে স্লোগান, কোথাও পুলিশের দিকে হুমকি, আবার কোথাও ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া। যেন প্রকাশ্য রাজনীতি নয়, বরং ছায়ার ভেতর দিয়ে সংগঠনটিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি পরিকল্পিত কৌশল।

২০২৬ সালের শুরু থেকেই গাজীপুরে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে সদর এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুনে মহানগরের বাসন এলাকায় যুবলীগের মিছিল থেকে পুলিশকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং পরে বিশেষ অভিযানে ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলাইয়ে রাজেন্দ্রপুরে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির মোড়লের নেতৃত্বে ঝটিকা মিছিল হয়। একই মাসে টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের মিছিলকে কেন্দ্র করে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে।

ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা বিচ্ছিন্ন মিছিল হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। বরং স্থান, সময়, অংশগ্রহণকারী, নেতৃত্ব এবং মিছিলের পরবর্তী প্রচার—সবকিছু পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে: ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেটওয়ার্ক কি নতুন কৌশলে নিজেদের সক্রিয় রাখছে?

অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাইরে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের কর্মীদের যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। বরং ঝটিকা কর্মসূচি, কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং সাংগঠনিক যোগাযোগ ধরে রাখতে অর্থ সহায়তা স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে।

এই অর্থ কীভাবে আসে, কার মাধ্যমে আসে, কার হাতে পৌঁছায় এবং কোন কর্মসূচিতে ব্যয় হয়—এখন সেটিই অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

রাজনীতিতে অর্থের প্রবাহ অনেক সময় প্রকাশ্য সাংগঠনিক কাঠামোর চেয়েও বেশি কার্যকর। কারণ একটি ঝটিকা মিছিলের জন্য বড় কার্যালয় লাগে না; লাগে কয়েকটি মোটরসাইকেল, যোগাযোগের একটি চ্যানেল, নির্দিষ্ট সময়ে কয়েকজন কর্মীকে এক জায়গায় আনার সক্ষমতা এবং পরে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা। অর্থাৎ সংগঠনকে দৃশ্যমান রাখতে যে ন্যূনতম অবকাঠামো দরকার, সেটিই যদি বাইরে থেকে সরবরাহ করা হয়, তাহলে নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক সংগঠনও সীমিত পরিসরে মাঠে তার অস্তিত্ব জানান দিতে পারে।

এ কারণেই গাজীপুরের সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলের অনুসন্ধান শুধু ‘কে মিছিলে ছিল’—এই প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। অনুসন্ধানের কেন্দ্র হওয়া উচিত অর্থ, যোগাযোগ, নির্দেশনা এবং স্থানীয় বাস্তবায়নকারী নেটওয়ার্ক।

এই ধারাবাহিকতায় নাসির মোড়লের ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পরপরই ৩ জুলাই গাজীপুর মহানগরের রাজেন্দ্রপুর নান্দুয়ান এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। মিছিলটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ৩ নম্বর গেট এলাকা থেকে শুরু হয়ে রাজেন্দ্রপুর বাজারের দিকে যায়। মিছিল শেষে নাসির মোড়ল কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।

এই ঘটনাটি গাজীপুরের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি প্রতীকী ছবি তৈরি করে—বিদেশে অবস্থান, দেশে প্রত্যাবর্তন এবং সরাসরি মাঠের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব।

তাঁর বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও দেখায় যে এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য শুধু কয়েক মিনিটের মিছিল নয়; কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দেওয়ার প্রচার-উদ্দেশ্যও এর সঙ্গে যুক্ত।

গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুরে অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে অধ্যাপক এনামুল হক

তিনি মির্জাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হিসেবে স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। তাঁর স্বাক্ষর ও অনুমোদনে ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী লীগ কমিটি গঠনের নথিও রয়েছে। অর্থাৎ এনামুল হক কেবল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি নন; ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগঠন নির্মাণের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।

কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়ে মোজাম্মেল হকের ভাগ্নে হিসেবে তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের কারণে।

দীর্ঘদিন গাজীপুরের আওয়ামী রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা মোজাম্মেল হকের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের কারণে এনামুল হক স্থানীয় রাজনীতিতে যে প্রভাববলয়ের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন, সেটি তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা বিশ্লেষণে উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়।

বরং সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে—ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর সেই পুরোনো রাজনৈতিক যোগাযোগের কতটা এখনো সক্রিয়?

মির্জাপুরের স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামোয় এনামুল হকের অতিমাত্রায় সক্রিয় ভূমিকার বিষয়টি সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে।

এই নেটওয়ার্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম মো. শফিকুল ইসলাম শফি

বৃহত্তর মির্জাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শফি স্থানীয় আওয়ামী রাজনীতিতে জামিল হাসান দুর্জয়ের ডান হাত হিসেবে খ্যাত

এটি নিছক ব্যক্তিগত পরিচিতি নয়; স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দুজনের দীর্ঘদিনের একই বলয়ে অবস্থানের তথ্যও রয়েছে। ফলে মির্জাপুরের পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করতে গেলে শফির অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে সামনে আসে।

এনামুল হক যেখানে ইউনিয়ন পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, শফিকুল ইসলাম শফি সেখানে দীর্ঘদিনের মাঠসংগঠক। ফলে দুজনের রাজনৈতিক অবস্থান পরস্পরকে সম্পূরক করে একটি স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামোর ছবি তৈরি করে।

মির্জাপুরের এই নেটওয়ার্কের আরও নিচের স্তরে রয়েছে এমদাদ মোক্তারের নাম।

পাইনশাইল ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত এই ব্যক্তি স্থানীয় সংগঠন ও কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে অনুসন্ধানী তথ্য থেকে উঠে এসেছে।

ফলে মির্জাপুরের কাঠামোকে তিনটি স্তরে দেখা যায়—

এই তিনটি স্তরের সঙ্গে যদি বাইরে থাকা রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগাযোগ এবং অর্থের প্রবাহের অভিযোগ যুক্ত হয়, তাহলে ঝটিকা মিছিলের মতো সীমিত কিন্তু দৃশ্যমান কর্মসূচি সংগঠিত করার একটি সম্ভাব্য কাঠামো তৈরি হয়।

গাজীপুরের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে মহানগর ও সদর এলাকায় ঝটিকা কর্মসূচির একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়।

জানুয়ারিতে সদর এলাকায় ছাত্রলীগের মিছিল ও গ্রেপ্তার; জুনে বাসনে যুবলীগের মিছিল ও পুলিশকে হুমকির ঘটনা; জুলাইয়ে রাজেন্দ্রপুরে নাসির মোড়লের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের মিছিল; এরপর টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঝটিকা কর্মসূচি—ঘটনাগুলোর ভৌগোলিক বিস্তারও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এর সঙ্গে সেপ্টেম্বরের কালিয়াকৈরের ঝটিকা মিছিল যুক্ত হলে বোঝা যায়, বিষয়টি কেবল মহানগর বা সদর উপজেলার একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কালিয়াকৈরে ২ সেপ্টেম্বর সাবেক কাউন্সিলর ও পৌর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. খাত্তাব মোল্লার নেতৃত্বে মিছিলের তথ্য পাওয়া গেছে; পরে এ ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে।

ঝটিকা মিছিলের প্রতিটি ঘটনায় কয়েক মিনিটের জন্য কয়েক ডজন মানুষ রাজপথে আসে। তারপর তারা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মিছিলের আগে তাদের একত্র করে কে? কার নির্দেশে? কার অর্থে? কার যোগাযোগে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত গাজীপুরে আওয়ামী লীগের বর্তমান অপতৎপরতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।

কারণ একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন প্রকাশ্য সাংগঠনিক কার্যালয় ছাড়া যদি বারবার রাজপথে উপস্থিত হতে পারে, তাহলে তার পেছনে কোনো না কোনো যোগাযোগের অবকাঠামো থাকার সম্ভাবনাই সামনে আসে।

আর সেই জায়গাতেই মির্জাপুরের এনামুল–শফি–এমদাদ নেটওয়ার্ক, সদর উপজেলা যুবলীগের আমু–বেলায়েত কাঠামো এবং নাসির মোড়লের মতো মাঠপর্যায়ে প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অবস্থান একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

গাজীপুরের এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলোকে আওয়ামী লীগের বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের স্থানীয় প্রতিফলন হিসেবেও দেখা যায়।

বড় সমাবেশ নয়—ছোট মিছিল।
দীর্ঘ কর্মসূচি নয়—কয়েক মিনিটের উপস্থিতি।
প্রকাশ্য সাংগঠনিক সভা নয়—গোপন যোগাযোগ।
প্রচলিত প্রচার নয়—ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া।
স্থানীয় অর্থের ওপর নির্ভরতা নয়—বিদেশে থাকা নেতাদের সম্ভাব্য সহায়তার অভিযোগ।

এই কৌশল মূলত একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ধরে রাখার কৌশল হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়।

গাজীপুরের ঘটনাগুলো তাই কেবল আইনশৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর মধ্যে রয়েছে একটি পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির স্থানীয় নেটওয়ার্ক ধরে রাখার চেষ্টা, কর্মীদের মনোবল পুনর্গঠন এবং সুযোগমতো রাজপথে ফিরে আসার প্রস্তুতির রাজনৈতিক ইঙ্গিত।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ক্ষমতার রাজনীতি গাজীপুরে যে বিস্তৃত স্থানীয় নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, রাজনৈতিক পালাবদলের পর তার সবটুকু নিশ্চিহ্ন হয়নি। বরং সেই নেটওয়ার্কের কিছু অংশ ব্যক্তি, সম্পর্ক, পুরোনো সাংগঠনিক পরিচয় এবং নতুন যোগাযোগের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করছে—সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলগুলো সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত বহন করে।

নাসির মোড়লের দেশে ফিরে সরাসরি ঝটিকা মিছিলে নেতৃত্ব, মহানগরে যুবলীগের আকস্মিক মিছিল, সদর এলাকায় ছাত্রলীগের তৎপরতা, মির্জাপুরে এনামুল হক–শফিকুল ইসলাম শফি–এমদাদ মোক্তারের পুরোনো সাংগঠনিক স্তর এবং সদর উপজেলা যুবলীগের আমু–বেলায়েত কাঠামো—সবকিছু পাশাপাশি রাখলে একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না:

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মিছিলের সামনে থাকা মুখের চেয়ে মিছিলের পেছনের অর্থ, যোগাযোগ, নির্দেশনা সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক অনুসরণ করতে হবে। আর সেই অনুসন্ধানেই গাজীপুরের আওয়ামী লীগের পুরোনো স্থানীয় নেতৃত্ব ও বর্তমান মাঠপর্যায়ের তৎপরতার মধ্যকার যোগসূত্রটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

খুলশীর আটতলা ভবনে পুলিশের অভিযান: ৬৩ বিদেশি আটক, জব্দ ৭০ ডিভাইস

গাজীপুরে আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা: ঝটিকা মিছিলের আড়ালে পুরোনো নেটওয়ার্কের নতুন ছক

Update Time : ০৫:৩৩:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি দল ক্ষমতা হারাতে পারে, তার কার্যালয় বন্ধ হতে পারে, সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হতে পারে; কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক একদিনে অদৃশ্য হয় না। গাজীপুরে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা সেই বাস্তবতারই এক অস্বস্তিকর ছবি তুলে ধরছে।

রাজপথে বড় সমাবেশ নেই, প্রকাশ্য মিছিলের অনুমতি নেই, দলীয় কর্মসূচির বৈধতা নেই—তবু হঠাৎ কোথাও কয়েক মিনিটের মিছিল, কোথাও মহাসড়কে স্লোগান, কোথাও পুলিশের দিকে হুমকি, আবার কোথাও ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া। যেন প্রকাশ্য রাজনীতি নয়, বরং ছায়ার ভেতর দিয়ে সংগঠনটিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি পরিকল্পিত কৌশল।

২০২৬ সালের শুরু থেকেই গাজীপুরে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে সদর এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুনে মহানগরের বাসন এলাকায় যুবলীগের মিছিল থেকে পুলিশকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং পরে বিশেষ অভিযানে ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলাইয়ে রাজেন্দ্রপুরে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির মোড়লের নেতৃত্বে ঝটিকা মিছিল হয়। একই মাসে টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের মিছিলকে কেন্দ্র করে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে।

ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা বিচ্ছিন্ন মিছিল হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। বরং স্থান, সময়, অংশগ্রহণকারী, নেতৃত্ব এবং মিছিলের পরবর্তী প্রচার—সবকিছু পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে: ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেটওয়ার্ক কি নতুন কৌশলে নিজেদের সক্রিয় রাখছে?

অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাইরে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের কর্মীদের যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। বরং ঝটিকা কর্মসূচি, কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং সাংগঠনিক যোগাযোগ ধরে রাখতে অর্থ সহায়তা স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে।

এই অর্থ কীভাবে আসে, কার মাধ্যমে আসে, কার হাতে পৌঁছায় এবং কোন কর্মসূচিতে ব্যয় হয়—এখন সেটিই অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

রাজনীতিতে অর্থের প্রবাহ অনেক সময় প্রকাশ্য সাংগঠনিক কাঠামোর চেয়েও বেশি কার্যকর। কারণ একটি ঝটিকা মিছিলের জন্য বড় কার্যালয় লাগে না; লাগে কয়েকটি মোটরসাইকেল, যোগাযোগের একটি চ্যানেল, নির্দিষ্ট সময়ে কয়েকজন কর্মীকে এক জায়গায় আনার সক্ষমতা এবং পরে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা। অর্থাৎ সংগঠনকে দৃশ্যমান রাখতে যে ন্যূনতম অবকাঠামো দরকার, সেটিই যদি বাইরে থেকে সরবরাহ করা হয়, তাহলে নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক সংগঠনও সীমিত পরিসরে মাঠে তার অস্তিত্ব জানান দিতে পারে।

এ কারণেই গাজীপুরের সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলের অনুসন্ধান শুধু ‘কে মিছিলে ছিল’—এই প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। অনুসন্ধানের কেন্দ্র হওয়া উচিত অর্থ, যোগাযোগ, নির্দেশনা এবং স্থানীয় বাস্তবায়নকারী নেটওয়ার্ক।

এই ধারাবাহিকতায় নাসির মোড়লের ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পরপরই ৩ জুলাই গাজীপুর মহানগরের রাজেন্দ্রপুর নান্দুয়ান এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। মিছিলটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ৩ নম্বর গেট এলাকা থেকে শুরু হয়ে রাজেন্দ্রপুর বাজারের দিকে যায়। মিছিল শেষে নাসির মোড়ল কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।

এই ঘটনাটি গাজীপুরের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি প্রতীকী ছবি তৈরি করে—বিদেশে অবস্থান, দেশে প্রত্যাবর্তন এবং সরাসরি মাঠের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব।

তাঁর বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও দেখায় যে এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য শুধু কয়েক মিনিটের মিছিল নয়; কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দেওয়ার প্রচার-উদ্দেশ্যও এর সঙ্গে যুক্ত।

গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুরে অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে অধ্যাপক এনামুল হক

তিনি মির্জাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হিসেবে স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। তাঁর স্বাক্ষর ও অনুমোদনে ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী লীগ কমিটি গঠনের নথিও রয়েছে। অর্থাৎ এনামুল হক কেবল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি নন; ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগঠন নির্মাণের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।

কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়ে মোজাম্মেল হকের ভাগ্নে হিসেবে তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের কারণে।

দীর্ঘদিন গাজীপুরের আওয়ামী রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা মোজাম্মেল হকের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের কারণে এনামুল হক স্থানীয় রাজনীতিতে যে প্রভাববলয়ের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন, সেটি তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা বিশ্লেষণে উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়।

বরং সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে—ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর সেই পুরোনো রাজনৈতিক যোগাযোগের কতটা এখনো সক্রিয়?

মির্জাপুরের স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামোয় এনামুল হকের অতিমাত্রায় সক্রিয় ভূমিকার বিষয়টি সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে।

এই নেটওয়ার্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম মো. শফিকুল ইসলাম শফি

বৃহত্তর মির্জাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শফি স্থানীয় আওয়ামী রাজনীতিতে জামিল হাসান দুর্জয়ের ডান হাত হিসেবে খ্যাত

এটি নিছক ব্যক্তিগত পরিচিতি নয়; স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দুজনের দীর্ঘদিনের একই বলয়ে অবস্থানের তথ্যও রয়েছে। ফলে মির্জাপুরের পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করতে গেলে শফির অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে সামনে আসে।

এনামুল হক যেখানে ইউনিয়ন পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, শফিকুল ইসলাম শফি সেখানে দীর্ঘদিনের মাঠসংগঠক। ফলে দুজনের রাজনৈতিক অবস্থান পরস্পরকে সম্পূরক করে একটি স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামোর ছবি তৈরি করে।

মির্জাপুরের এই নেটওয়ার্কের আরও নিচের স্তরে রয়েছে এমদাদ মোক্তারের নাম।

পাইনশাইল ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত এই ব্যক্তি স্থানীয় সংগঠন ও কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে অনুসন্ধানী তথ্য থেকে উঠে এসেছে।

ফলে মির্জাপুরের কাঠামোকে তিনটি স্তরে দেখা যায়—

এই তিনটি স্তরের সঙ্গে যদি বাইরে থাকা রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগাযোগ এবং অর্থের প্রবাহের অভিযোগ যুক্ত হয়, তাহলে ঝটিকা মিছিলের মতো সীমিত কিন্তু দৃশ্যমান কর্মসূচি সংগঠিত করার একটি সম্ভাব্য কাঠামো তৈরি হয়।

গাজীপুরের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে মহানগর ও সদর এলাকায় ঝটিকা কর্মসূচির একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়।

জানুয়ারিতে সদর এলাকায় ছাত্রলীগের মিছিল ও গ্রেপ্তার; জুনে বাসনে যুবলীগের মিছিল ও পুলিশকে হুমকির ঘটনা; জুলাইয়ে রাজেন্দ্রপুরে নাসির মোড়লের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের মিছিল; এরপর টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঝটিকা কর্মসূচি—ঘটনাগুলোর ভৌগোলিক বিস্তারও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এর সঙ্গে সেপ্টেম্বরের কালিয়াকৈরের ঝটিকা মিছিল যুক্ত হলে বোঝা যায়, বিষয়টি কেবল মহানগর বা সদর উপজেলার একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কালিয়াকৈরে ২ সেপ্টেম্বর সাবেক কাউন্সিলর ও পৌর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. খাত্তাব মোল্লার নেতৃত্বে মিছিলের তথ্য পাওয়া গেছে; পরে এ ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে।

ঝটিকা মিছিলের প্রতিটি ঘটনায় কয়েক মিনিটের জন্য কয়েক ডজন মানুষ রাজপথে আসে। তারপর তারা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মিছিলের আগে তাদের একত্র করে কে? কার নির্দেশে? কার অর্থে? কার যোগাযোগে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত গাজীপুরে আওয়ামী লীগের বর্তমান অপতৎপরতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।

কারণ একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন প্রকাশ্য সাংগঠনিক কার্যালয় ছাড়া যদি বারবার রাজপথে উপস্থিত হতে পারে, তাহলে তার পেছনে কোনো না কোনো যোগাযোগের অবকাঠামো থাকার সম্ভাবনাই সামনে আসে।

আর সেই জায়গাতেই মির্জাপুরের এনামুল–শফি–এমদাদ নেটওয়ার্ক, সদর উপজেলা যুবলীগের আমু–বেলায়েত কাঠামো এবং নাসির মোড়লের মতো মাঠপর্যায়ে প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অবস্থান একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

গাজীপুরের এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলোকে আওয়ামী লীগের বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের স্থানীয় প্রতিফলন হিসেবেও দেখা যায়।

বড় সমাবেশ নয়—ছোট মিছিল।
দীর্ঘ কর্মসূচি নয়—কয়েক মিনিটের উপস্থিতি।
প্রকাশ্য সাংগঠনিক সভা নয়—গোপন যোগাযোগ।
প্রচলিত প্রচার নয়—ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া।
স্থানীয় অর্থের ওপর নির্ভরতা নয়—বিদেশে থাকা নেতাদের সম্ভাব্য সহায়তার অভিযোগ।

এই কৌশল মূলত একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ধরে রাখার কৌশল হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়।

গাজীপুরের ঘটনাগুলো তাই কেবল আইনশৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর মধ্যে রয়েছে একটি পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির স্থানীয় নেটওয়ার্ক ধরে রাখার চেষ্টা, কর্মীদের মনোবল পুনর্গঠন এবং সুযোগমতো রাজপথে ফিরে আসার প্রস্তুতির রাজনৈতিক ইঙ্গিত।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ক্ষমতার রাজনীতি গাজীপুরে যে বিস্তৃত স্থানীয় নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, রাজনৈতিক পালাবদলের পর তার সবটুকু নিশ্চিহ্ন হয়নি। বরং সেই নেটওয়ার্কের কিছু অংশ ব্যক্তি, সম্পর্ক, পুরোনো সাংগঠনিক পরিচয় এবং নতুন যোগাযোগের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করছে—সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলগুলো সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত বহন করে।

নাসির মোড়লের দেশে ফিরে সরাসরি ঝটিকা মিছিলে নেতৃত্ব, মহানগরে যুবলীগের আকস্মিক মিছিল, সদর এলাকায় ছাত্রলীগের তৎপরতা, মির্জাপুরে এনামুল হক–শফিকুল ইসলাম শফি–এমদাদ মোক্তারের পুরোনো সাংগঠনিক স্তর এবং সদর উপজেলা যুবলীগের আমু–বেলায়েত কাঠামো—সবকিছু পাশাপাশি রাখলে একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না:

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মিছিলের সামনে থাকা মুখের চেয়ে মিছিলের পেছনের অর্থ, যোগাযোগ, নির্দেশনা সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক অনুসরণ করতে হবে। আর সেই অনুসন্ধানেই গাজীপুরের আওয়ামী লীগের পুরোনো স্থানীয় নেতৃত্ব ও বর্তমান মাঠপর্যায়ের তৎপরতার মধ্যকার যোগসূত্রটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।