বিশেষ প্রতিবেদন,দৈনিক প্রান্তিক।
ঢাকা, ৩১ আগস্ট ২০২৬
ফেব্রুয়ারির সেই কনকনে শীতের রাতে পশ্চিম রাজাবাজারের ফ্ল্যাটে যখন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির রক্তে ঢাকার মাটি ভিজে গিয়েছিল, তখনই বোঝা গিয়েছিল এই জনপদে সত্য বলার চেয়ে বড় অপরাধ আর কিছু নেই। রাষ্ট্রযন্ত্র তখন থেকেই এক অদ্ভুত নীরবতার চাদরে এই নৃশংসতাকে ঢেকে রেখেছিল। চৌদ্দটি বছর কেটে গেছে, নদী দিয়ে কত জল গড়িয়েছে, দেশের সিংহাসনে বদল এসেছে, কিন্তু এই হতভাগ্য দম্পতির রক্তের দাগ যেন ক্ষমতার অলিন্দে মুছে ফেলার এক অবিরাম চেষ্টা চলেছে। পুলিশ, ডিবি কিংবা র্যাব—রাষ্ট্রের সব কটি সুসজ্জিত বাহিনী একশবারেরও বেশি সময় চেয়ে আদালত থেকে ফিরে এসেছে, অথচ খুনিদের নাগাল পায়নি। এই ব্যর্থতা নিছক অযোগ্যতা নয়, এ ছিল এক গভীর এবং সচেতন অপরাধ। কিন্তু সত্যের একটা নিজস্ব শক্তি থাকে; তাকে যত গভীরে জ্যান্ত কবর দেওয়া হোক না কেন, একদিন না একদিন সে মাটির বুক চিরে বেরিয়ে আসেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি ভিন্ন মামলার কল ডিটেইল রেকর্ড বা সিডিআর পর্যালোচনা করতে গিয়ে তদন্তকারীরা হঠাৎ করেই এমন এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের সন্ধান পেয়েছেন, যা এই দীর্ঘস্থায়ী নাটকের দৃশ্যপটকে এক লহমায় বদলে দিয়েছে।
এই নতুন সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় যাদের ছায়া দেখা যাচ্ছে, তারা হলেন তৎকালীন র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং আওয়ামী ঘরানার সাংস্কৃতিক জগতের পরিচিত মুখ অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী। তদন্তের অন্দরমহল থেকে যে তথ্য চুইয়ে পড়ছে, তা কেবল শিউরে ওঠার মতো নয়, বরং আমাদের সমাজের তথাকথিত সুশীল ও ক্ষমতার রক্ষকদের আসল চেহারাটা নগ্ন করে দেয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, সাগর ও রুনি কোনো সাধারণ অপরাধের শিকার হননি, তারা হাত দিয়েছিলেন ক্ষমতার সবচেয়ে সংবেদনশীল ও রক্তাক্ত অধ্যায়ে। ২০০৯ সালের পিলখানা বিডিআর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের আসল কুশীলব ও সত্য ঘটনা নিয়ে তারা একটি অত্যন্ত গোপন ও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করছিলেন। এই সত্য যদি তখন প্রকাশ পেয়ে যেত, তবে ক্ষমতার মসনদ কেঁপে উঠত। আর সেই কারণেই ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে তাদের নির্মমভাবে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং ঘর থেকে উধাও হয়ে যায় সেই সংবেদনশীল প্রামাণ্যচিত্র সম্বলিত দুটি পেনড্রাইভ।
এখানেই প্রবেশ ঘটে রোকেয়া প্রাচীর। জিয়াউল আহসানের এক তৎকালীন ঘনিষ্ঠ সহযোগীর জবানবন্দি এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থেকে জানা যাচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পরদিনই সেই প্রামাণ্যচিত্রের পেনড্রাইভ দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোকেয়া প্রাচীর জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল। দুই দিন ধরে তিনি ক্ষমতার এই রক্তাক্ত দলিল নিজের হেফাজতে রেখেছিলেন এবং পরবর্তীতে তা আবার জিয়াউল আহসানের কাছে ফিরিয়ে দেন। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে এই দুই চরিত্রের মধ্যে অবিরাম ফোনালাপের যে ডিজিটাল প্রমাণ এখন তদন্তকারীদের হাতে, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। সংস্কৃতির মোড়কে ঢাকা রোকেয়া প্রাচী এবং বুটের তলায় আইনকে পিষে ফেলা জিয়াউল আহসানের এই গোপন আঁতাত প্রমাণ করে যে, এই দেশে রাজনীতি, সংস্কৃতি আর ক্ষমতার অন্ধকার জগৎ কীভাবে একে অপরের হাত ধরাধরি করে চলে।
তবে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এলেও আইনি মারপ্যাঁচের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এর চূড়ান্ত বিচার সম্ভব নয়। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন, সাগর-রুনি হত্যা কোনো নিয়মতান্ত্রিক গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ নয়, এটি একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক ফৌজদারি অপরাধ। ফলে ট্রাইব্যুনাল এই প্রাপ্ত তথ্য ও ডিজিটাল প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করছে, যা মামলার মূল তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই এবং উচ্চ আদালতের বিশেষ টাস্কফোর্সের কাছে হস্তান্তর করা হবে। বিচার শেষ পর্যন্ত দেশের সাধারণ দায়রা আদালতেই হবে। দীর্ঘ দেড় দশক পর যখন খুনিদের মুখোশ উন্মোচনের একটা সুনির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছে, তখন সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘ এবং তার পরিবার নতুন করে আশার আলো দেখছেন। তারা ইতিমধ্যেই এই কুশীলবদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও দ্রুত গ্রেফতারের দাবি তুলেছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে এসে এই তদন্ত যদি কোনো রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার না হয়ে পিবিআই-এর চূড়ান্ত চার্জশিটে রূপ নেয়, তবেই কেবল বোঝা যাবে এই দেশে সুশাসনের সূর্য উদয় হতে আর কত দেরি। না হলে, সত্যের এই আলোর ঝলকানিও ক্ষমতার আরেকটি নতুন খেলা হিসেবেই ইতিহাসে হারিয়ে যাবে।
বিশেষ প্রতিবেদন,দৈনিক প্রান্তিক। 














