মোঃ রওশন আলী,বিশেষ প্রতিনিধি-দৈনিক প্রান্তিক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন একটু স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে পরিচিত মুখের একের পর এক ‘নস্টালজিক’ ছবি। কেউ নব্বইয়ের দশকের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ, কারও পরনে পুরোনো দিনের ফ্যাশন, কারও ছবিতে সিনেমার মতো দানাদার আলো-ছায়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে কয়েকটি নির্দেশনা লিখলেই তৈরি হচ্ছে সেই কাঙ্ক্ষিত অতীত।
নব্বইয়ের দশকে ফিরে যাওয়ার এই ডিজিটাল আনন্দ আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ। কিন্তু ছবিটির পেছনে যে অদৃশ্য অবকাঠামো কাজ করছে, তার রয়েছে বাস্তব পরিবেশগত মূল্য। বিশাল ডেটা সেন্টার, শক্তিশালী জিপিইউ, বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, পানি এবং নতুন নতুন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি—সব মিলিয়ে এআই এখন আর শুধু ‘ডিজিটাল’ কোনো বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে একটি বড় ভৌত অবকাঠামো এবং সেই অবকাঠামোর পরিবেশগত পদচিহ্ন।
২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথ (UNU-INWEH)-এর এক গবেষণা এই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাব শুধু কার্বন নিঃসরণ দিয়ে মাপলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানি, ভূমি, বিদ্যুৎ এবং ইলেকট্রনিক বর্জ্যেরও বড় হিসাব।
একটি এআই ছবির পেছনে কতটা বিদ্যুৎ?
UNU-INWEH-এর হিসাব অনুযায়ী, একটি সাধারণ মানের এআই-উৎপাদিত ছবি তৈরিতে আনুমানিক ২.৯ ওয়াট-ঘণ্টা (Wh) বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে। এর সঙ্গে প্রায় ১.২২ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ, প্রায় ২৮.৬ মিলিলিটার পানির water footprint এবং প্রায় ০.৪৫ বর্গসেন্টিমিটার ভূমি-সম্পর্কিত footprint যুক্ত হতে পারে। এগুলো অবশ্য প্রতিটি ছবি বা প্রতিটি এআই মডেলের জন্য নির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় সংখ্যা নয়; মডেল, ছবির আকার, হার্ডওয়্যার, ডেটা সেন্টারের অবস্থান এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের উৎসভেদে হিসাব বদলে যায়।
২.৯ Wh বিদ্যুৎ খুব বড় কোনো সংখ্যা মনে নাও হতে পারে। কিন্তু ১০ ওয়াটের একটি এলইডি বাতি দিয়ে তুলনা করলে বোঝা যায়—এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে বাতিটি প্রায় ১৭ মিনিট জ্বালানো সম্ভব।
অর্থাৎ একটি ছবি পৃথিবীকে অন্ধকার করে দিচ্ছে—এমন নয়। সমস্যা তৈরি হয় অন্য জায়গায়। প্রতিদিন যখন লাখ লাখ বা কোটি কোটি এআই-নির্ভর কাজ সম্পন্ন হয়, তখন ছোট ছোট ব্যবহার মিলেই তৈরি হয় বড় অবকাঠামোগত চাহিদা।
‘ক্লাউড’ আসলে মেঘ নয়
আমরা প্রায়ই বলি, ছবি বা তথ্য ‘ক্লাউডে’ তৈরি হচ্ছে। শব্দটি শুনলে মনে হতে পারে, সবকিছু যেন আকাশের কোনো অদৃশ্য জগতে ঘটছে। বাস্তবে ক্লাউড মানে বিশাল সার্ভার, ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ সরবরাহ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং অসংখ্য যন্ত্রপাতির সমন্বিত অবকাঠামো।
এআই দিয়ে একটি ছবি তৈরির নির্দেশনা পাঠানোর পর সেই হিসাব সম্পন্ন করতে শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামো কাজ করে। বিশেষ করে গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউভিত্তিক সার্ভারগুলো একই সময়ে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর অনুরোধ প্রক্রিয়াজাত করে।
এই যন্ত্রপাতি চালাতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন। আবার সার্ভারগুলো চালু থাকলে তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপ নিয়ন্ত্রণে শীতলীকরণ ব্যবস্থা দরকার। ফলে এআইয়ের প্রতিটি ডিজিটাল কাজের পেছনে বিদ্যুৎ ও পানির একটি বাস্তব অবকাঠামোগত হিসাব রয়েছে।
পানির হিসাবটি কোথায়?
এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
UNU-INWEH-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পানির footprint প্রায় ৯.৩ ট্রিলিয়ন লিটার হতে পারে। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের হিসাবে, এই পরিমাণ পানি সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রায় ১.৩ বিলিয়ন মানুষের এক বছরের মৌলিক গৃহস্থালি পানির চাহিদার সমতুল্য।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এই ৯.৩ ট্রিলিয়ন লিটারকে শুধু ‘ডেটা সেন্টারের কুলিংয়ে ব্যবহৃত পানি’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। গবেষণার হিসাবটি মূলত ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত সামগ্রিক water footprint—যার মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পানির ব্যবহারও রয়েছে। আবার কোনো নির্দিষ্ট ছবি তৈরিতে ২৮.৬ মিলিলিটার পানি মানেই ওই পানি সরাসরি কোনো ডেটা সেন্টারের পাইপ থেকে বেরিয়ে গেছে—এমন অর্থও করা যাবে না।
অর্থাৎ এখানে ‘পানির অপচয়’ বলার চেয়ে পানির পরিবেশগত footprint বলা বেশি নির্ভুল।
২০৩০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা কোথায় দাঁড়াবে?
এখানে পুরোনো কিছু হিসাবের সঙ্গে নতুন তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা—IEA-এর সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৯৫০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় (TWh) পৌঁছাতে পারে। এটি বিশ্বব্যাপী মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার ছিল প্রায় ৪৮৫ TWh; অর্থাৎ কয়েক বছরের মধ্যে তা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পথে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ৩ শতাংশ শুধু এআইয়ের জন্য নয়; এতে ডেটা সেন্টারের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত। তবে IEA বলছে, এই বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হচ্ছে এআই। এআই-নির্ভর ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা সামগ্রিক ডেটা সেন্টারের তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ছে।
অতএব ‘২০৩০ সালে এআই বিশ্বের ৩ থেকে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ খেয়ে ফেলবে’—এই বাক্যটি ব্যবহার না করাই ভালো। বরং বলা যায়, এআইয়ের বিস্তারের কারণে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং ২০৩০ সালে তা বিশ্ব বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
শুধু কার্বন নয়, আছে ই-বর্জ্যের পাহাড়ও
এআইয়ের পরিবেশগত সংকট শুধু বিদ্যুৎ ও পানিতে সীমাবদ্ধ নয়।
এআই চালাতে প্রয়োজন শক্তিশালী সার্ভার, জিপিইউ, চিপ, স্টোরেজ এবং নেটওয়ার্ক অবকাঠামো। প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো হার্ডওয়্যারও দ্রুত অচল হয়ে পড়তে পারে। ফলে তৈরি হয় ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য।
২০২৪ সালে Nature Computational Science-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, জেনারেটিভ এআইয়ের দ্রুত সম্প্রসারণের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ২০২০ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১.২ থেকে ৫ মিলিয়ন টন অতিরিক্ত ই-বর্জ্য তৈরি হতে পারে। গবেষকরা একই সঙ্গে দেখিয়েছেন, পুনর্ব্যবহার ও circular economy কৌশল গ্রহণ করলে এই বর্জ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
২০২৬ সালের আরেকটি বিশ্লেষণ অবশ্য আগের কিছু অনুমানকে পুনর্মূল্যায়ন করে বলেছে, ২০৩০ সালে এআই সার্ভার থেকে বছরে প্রায় ১৩১ থেকে ২২৪.৮ হাজার টন ই-বর্জ্য তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ গবেষণাগুলোর হিসাবের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যই দেখায়—এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাবের হিসাব এখনো দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং এর জন্য আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রয়োজন।
তাহলে কি এআই ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে?
এখানেই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আমার এআই-ভিত্তিক বিশ্লেষণ বলছে, বিষয়টিকে ‘এআই ভালো’ অথবা ‘এআই খারাপ’—এই দুই মেরুর একটিতে নামিয়ে আনা ঠিক হবে না।
একটি ব্যক্তিগত ছবি তৈরির জন্য ২.৯ Wh বিদ্যুৎ বা ২৮.৬ মিলিলিটার water footprint নিজে কোনো বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয় নয়। এমনকি এআইয়ের অনেক ব্যবহার মানুষের সময় ও সম্পদ বাঁচাতে পারে। IEA-ও বলছে, এআই নিজেই শক্তি খাতের দক্ষতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সমস্যা হলো ব্যবহারের মাত্রা এবং ব্যবহারের ধরন।
একটি প্রয়োজনীয় ছবি আর একই ছবির ৫০টি সংস্করণ বানানোর মধ্যে পরিবেশগত অর্থে পার্থক্য আছে। একটি প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য এআই ব্যবহার আর নিছক কয়েক সেকেন্ডের বিনোদনের জন্য শত শত ছবি ও ভিডিও তৈরি করার মধ্যেও পার্থক্য আছে।
প্রযুক্তি যত সস্তা ও সহজ হচ্ছে, মানুষের ব্যবহার তত বাড়ছে। আর দক্ষতা বাড়লেও মোট ব্যবহার এত দ্রুত বাড়তে পারে যে সামগ্রিক বিদ্যুৎ, পানি ও অবকাঠামোর চাহিদা কমার বদলে বেড়ে যায়। ২০২৬ সালের IEA বিশ্লেষণেও দেখা যাচ্ছে, প্রতি এআই কাজের শক্তি দক্ষতা দ্রুত বাড়লেও ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে ডেটা সেন্টারের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ছে।
নব্বইয়ের দশকে ফিরতে গিয়ে যেন ভবিষ্যৎ হারিয়ে না ফেলি
নব্বইয়ের দশকের একটি ছবি আমাদের ব্যক্তিগত স্মৃতি ফিরিয়ে দিতে পারে। পুরোনো পোশাক, পুরোনো চশমা, ক্যাম্পাসের আবহ কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোনো মুখ—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক মুহূর্তে সেই স্মৃতিকে নতুন করে সাজিয়ে দিতে পারে।
এই আনন্দের বিরোধিতা করার কারণ নেই।
কিন্তু ‘ক্লাউডে’ তৈরি হওয়া ছবিটিরও একটি বাস্তব পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবীতে রয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, ডেটা সেন্টার, পানি, জমি, খনিজ, চিপ কারখানা এবং একদিন ফেলে দেওয়া সার্ভারের স্তূপ।
তাই প্রশ্নটি এআই ব্যবহার করব কি করব না—সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, কী প্রয়োজনের জন্য, কতটা এবং কত সচেতনভাবে এআই ব্যবহার করছি।
প্রযুক্তির অগ্রগতি থামানো বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রয়োজন প্রযুক্তির পরিবেশগত মূল্যকে দৃশ্যমান করা। ডেটা সেন্টারের পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, কম শক্তিখরচের মডেল, দক্ষ হার্ডওয়্যার, যন্ত্রপাতির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার এবং ই-বর্জ্যের পুনর্ব্যবস্থাপনা—সবই হতে পারে সমাধানের অংশ।
নব্বইয়ের দশকের নস্টালজিয়া আমাদের অতীতে ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু সেই নস্টালজিয়ার বিনিময়ে যদি বর্তমান পৃথিবীর পানি, বিদ্যুৎ ও সম্পদের ওপর অদৃশ্য চাপ বাড়তে থাকে, তবে প্রশ্ন করতেই হবে—আমরা কি কেবল অতীতের একটি সুন্দর ছবি বানাচ্ছি, নাকি অজান্তেই ভবিষ্যতের একটি অসুন্দর পৃথিবী তৈরি করছি?
এআই আমাদের সময়ের অন্যতম শক্তিশালী প্রযুক্তি। তাই এর দায়িত্বশীল ব্যবহারও আমাদের সময়ের অন্যতম বড় নাগরিক ও পরিবেশগত দায়িত্ব।
কারণ শেষ পর্যন্ত ‘ক্লাউড’ কোনো মেঘ নয়।
তার নিচে একটি বাস্তব পৃথিবী আছে—যে পৃথিবীতেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।
মোঃ রওশন আলী,বিশেষ প্রতিনিধি-দৈনিক প্রান্তিক। 















