Dhaka ১২:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বৈরাচারের কালো ছায়া মুক্ত বাংলাদেশ: ডা. শফিকুর রহমান

ঢাকা, ২৪ জুলাই ২০২৬: দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে অবশেষে অবসান ঘটল একটি অধ্যায়ের। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর আজ সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান তুলে ধরেন। অত্যন্ত দৃঢ় ও বর্ণনাত্মক ভাষাশৈলীতে তিনি এই পরিবর্তনকে “জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের কালো ছায়া সরে যাওয়া” বলে অভিহিত করেন।

নৈতিকতার পতন যোগ্যতা হারানোর ইতিহাস

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যের শুরুতেই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, সাবেক রাষ্ট্রপতি অনেক আগেই তার পদে থাকার সমস্ত নৈতিক অধিকার ও যোগ্যতা হারিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে প্রথমে ‘হ্যাঁ’ এবং পরবর্তীতে তা অস্বীকার করে তিনি যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিলেন, তা ছিল জাতির সাথে এক চরম মিথ্যাচার। জামায়াত আমিরের মতে, এই মিথ্যাচার ছিল রাষ্ট্রপতির নেওয়া পবিত্র শপথের সরাসরি লঙ্ঘন। তাই তিনি কী কারণে বা কোন পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করেছেন, তা নিয়ে জামায়াতের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই; বরং তার বিদায়টাই ছিল সময়ের দাবি।

জুলাইআগস্টের গণহত্যায় নীরব ভূমিকা

বক্তব্যের এক আবেগঘন অংশে ডা. শফিকুর রহমান ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি চারণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যখন ফ্যাসিবাদের বুলেটে ঢাকার রাজপথ ছাত্র ও সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে বসে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্বৈরাচারী সরকারের সেই নির্মম দমনপীড়ন ও গণহত্যার পেছনে সাবেক রাষ্ট্রপতির এক ধরনের “নীরব সহযোগিতা” ছিল বলে তিনি দাবি করেন। গণআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এই অপসারণ আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নতুন নেতৃত্বের উদয় অভিনন্দনের বার্তা

সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ডা. শফিকুর রহমান জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নতুন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন এই ক্রান্তিলগ্নে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীন, নির্মোহ এবং ন্যায়নিষ্ঠভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করবেন।

জামায়াতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা সহযোগিতার আশ্বাস

সংবাদ সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথরেখা নিয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি ঘোষণা দেন:

  • পূর্ণ সহযোগিতা: নতুন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি যদি ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করেন, তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাকে সব ধরনের রাজপথের ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা দেবে।
  • তোষামোদহীন নেতৃত্ব: বাংলাদেশের পরবর্তী স্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজন ব্যক্তিত্বকে দেখতে চায় জামায়াত, যিনি কোনো ব্যক্তি বা দলের তোষামোদকারী হবেন না। তিনি হবেন সম্পূর্ণ স্বাধীন, মেরুদণ্ডসম্পন্ন এবং জনগণের প্রকৃত অভিভাবক।


ডা. শফিকুর রহমানের এই সংবাদ সম্মেলনটি ছিল মূলত ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশ দূরীকরণের এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। তার বর্ণনামূলক ও ঝাঁঝালো বক্তব্য এটিই প্রমাণ করে যে, দেশের রাজনীতি এখন এক নতুন ভোরের দিকে যাত্রা করছে, যেখানে তোষামোদি বা স্বৈরাচারের কোনো স্থান থাকবে না।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

শেভরনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ

স্বৈরাচারের কালো ছায়া মুক্ত বাংলাদেশ: ডা. শফিকুর রহমান

Update Time : ০৪:০৫:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

ঢাকা, ২৪ জুলাই ২০২৬: দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে অবশেষে অবসান ঘটল একটি অধ্যায়ের। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর আজ সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান তুলে ধরেন। অত্যন্ত দৃঢ় ও বর্ণনাত্মক ভাষাশৈলীতে তিনি এই পরিবর্তনকে “জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের কালো ছায়া সরে যাওয়া” বলে অভিহিত করেন।

নৈতিকতার পতন যোগ্যতা হারানোর ইতিহাস

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যের শুরুতেই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, সাবেক রাষ্ট্রপতি অনেক আগেই তার পদে থাকার সমস্ত নৈতিক অধিকার ও যোগ্যতা হারিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে প্রথমে ‘হ্যাঁ’ এবং পরবর্তীতে তা অস্বীকার করে তিনি যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিলেন, তা ছিল জাতির সাথে এক চরম মিথ্যাচার। জামায়াত আমিরের মতে, এই মিথ্যাচার ছিল রাষ্ট্রপতির নেওয়া পবিত্র শপথের সরাসরি লঙ্ঘন। তাই তিনি কী কারণে বা কোন পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করেছেন, তা নিয়ে জামায়াতের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই; বরং তার বিদায়টাই ছিল সময়ের দাবি।

জুলাইআগস্টের গণহত্যায় নীরব ভূমিকা

বক্তব্যের এক আবেগঘন অংশে ডা. শফিকুর রহমান ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি চারণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যখন ফ্যাসিবাদের বুলেটে ঢাকার রাজপথ ছাত্র ও সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে বসে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্বৈরাচারী সরকারের সেই নির্মম দমনপীড়ন ও গণহত্যার পেছনে সাবেক রাষ্ট্রপতির এক ধরনের “নীরব সহযোগিতা” ছিল বলে তিনি দাবি করেন। গণআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এই অপসারণ আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নতুন নেতৃত্বের উদয় অভিনন্দনের বার্তা

সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ডা. শফিকুর রহমান জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নতুন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন এই ক্রান্তিলগ্নে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীন, নির্মোহ এবং ন্যায়নিষ্ঠভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করবেন।

জামায়াতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা সহযোগিতার আশ্বাস

সংবাদ সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথরেখা নিয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি ঘোষণা দেন:

  • পূর্ণ সহযোগিতা: নতুন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি যদি ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করেন, তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাকে সব ধরনের রাজপথের ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা দেবে।
  • তোষামোদহীন নেতৃত্ব: বাংলাদেশের পরবর্তী স্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজন ব্যক্তিত্বকে দেখতে চায় জামায়াত, যিনি কোনো ব্যক্তি বা দলের তোষামোদকারী হবেন না। তিনি হবেন সম্পূর্ণ স্বাধীন, মেরুদণ্ডসম্পন্ন এবং জনগণের প্রকৃত অভিভাবক।


ডা. শফিকুর রহমানের এই সংবাদ সম্মেলনটি ছিল মূলত ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশ দূরীকরণের এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। তার বর্ণনামূলক ও ঝাঁঝালো বক্তব্য এটিই প্রমাণ করে যে, দেশের রাজনীতি এখন এক নতুন ভোরের দিকে যাত্রা করছে, যেখানে তোষামোদি বা স্বৈরাচারের কোনো স্থান থাকবে না।