ঢাকা, ২৪ জুলাই ২০২৬: বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। গুরুতর স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ দেখিয়ে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন। শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার পর সংবিধানের বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্বের এই পরিবর্তন সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ায় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে কোনো সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়নি।
স্বাস্থ্যগত কারণেই পদত্যাগ
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্রে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। সাম্প্রতিক চিকিৎসা পরীক্ষায় তার শরীরে অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি (Autonomic Neuropathy) ধরা পড়ে, যার ফলে তিনি মাঝেমধ্যে হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা তার পক্ষে আর সম্ভব নয় বলেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা তার আর অবশিষ্ট নেই। উন্নত চিকিৎসা গ্রহণের স্বার্থেই তিনি স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
যেভাবে সম্পন্ন হলো সাংবিধানিক প্রক্রিয়া
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত লিখিত পত্রের মাধ্যমে স্পিকারের নিকট পদত্যাগ করতে পারেন। সেই বিধান অনুসারেই শুক্রবার বিকেলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র স্পিকারের কার্যালয়ে পৌঁছায় এবং বিকেল ৫টা ১ মিনিটে তা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়।
এরপর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ কার্যকর হয়। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সেই সাংবিধানিক বিধান অনুসারেই স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫৪ অনুচ্ছেদের অধীনে স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের জন্য পৃথকভাবে নতুন শপথ গ্রহণের প্রয়োজন হয় না; স্পিকার হিসেবে বিদ্যমান সাংবিধানিক শপথের ভিত্তিতেই তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পথ
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর এখন সংবিধানের ১২৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সমন্বয়ে শিগগিরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বার্তা
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর সংসদ ভবনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম এবং অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রউফ কুদ্দুস কাজল তাকে শুভেচ্ছা জানান। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন এবং দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি সব রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের শান্ত, দায়িত্বশীল ও আইনানুগ আচরণ বজায় রাখার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, রাষ্ট্রপতির এই পদত্যাগ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ঘটনা। তবে সংবিধানের নির্ধারিত বিধান অনুসারে দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন হওয়ায় রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই অন্তর্বর্তী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক,দৈনিক প্রান্তিক। 





















