রংপুর প্রতিনিধি-দৈনিক প্রান্তিক। ১১ জুলাই ২০২৬:
এক উৎসবমুখর ও রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত পরিবেশে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে আজ অনুষ্ঠিত হয়েছে বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ১১ দলীয় ঐক্যজোটের বহুল প্রতীক্ষিত বিভাগীয় মহাসমাবেশ। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার রংপুরে দুপুরের পর থেকেই রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ঢল নামতে শুরু করে। তীব্র বৃষ্টি ও আবহাওয়ার প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ব্যানার, ফেস্টুন আর মুহুর্মুহু স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো রংপুর শহর।
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মহাসমাবেশকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনামূলক ও তীব্র হুংকারপূর্ণ বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বর্তমান সংসদীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান。 তিনি তাঁর বক্তব্যে সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, যে সরকার বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে না, জনগণের খোঁজ নেওয়ার সময় পায় না, তা কোনো সরকারই না। তিনি বর্তমান প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে ঘোষণা করেন, আওয়ামী লীগের আমলে সংঘটিত সমস্ত গুম, খুন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গণহত্যার সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় সুশাসনের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
সমাবেশটির সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি তাঁর বক্তব্যে কড়া হুংকার দিয়ে বলেন, শেখ হাসিনার জন্য ফাঁসির দড়ি অপেক্ষা করছে। সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলী আহমদ বীর বিক্রম তাঁর বক্তব্যে বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষায় কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না; সাধারণ জনগণের অধিকার এবং দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় এই ঐক্যজোট রাজপথে সর্বদা সোচ্চার থাকবে। এরপর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের ন্যায্য দাবি তথা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় রাজপথ থেকেই দাবি আদায় করা হবে। শীর্ষ নেতাদের এই যৌথ ও জোরালো উপস্থিতি রংপুরের মাটি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে এক শক্তিশালী ঐক্যের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
মহাসমাবেশে বক্তারা মূলত উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং সমসাময়িক জাতীয় সংকটগুলোকে জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছেন। তাদের বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশের শাসনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুসংহত করতে গণভোটের গণরায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি। একই সাথে উত্তরবঙ্গের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে বাঁচাতে এবং মরুময়তা রোধে বহুল আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি জোর তাগিদ দেওয়া হয়। এছাড়া দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সীমান্তে সাধারণ নাগরিকদের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বন্ধে ‘সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন’ চিরতরে বন্ধের দাবি জানান জোটের শীর্ষ নেতারা। সেই সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ও জনদুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
রংপুর বিভাগের আটটি জেলা—দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় এবং স্বাগতিক রংপুর থেকে সকাল থেকেই ট্রেন, বাস, ট্রাক ও বিভিন্ন ছোট যানবাহনে করে হাজার হাজার মানুষ সমাবেশস্থলে এসে পৌঁছান。 দুপুরের মধ্যেই জিলা স্কুল মাঠের সীমানা পেরিয়ে আশপাশের প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে নগরীর আইনশৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে প্রশাসন। নেতাকর্মী ও উপস্থিত সাধারণ মানুষের মতে, এই মহাসমাবেশ কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি উত্তরবঙ্গের অবহেলিত মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ের এক সম্মিলিত গণবিস্ফোরণ।
রংপুর প্রতিনিধি-দৈনিক প্রান্তিক। 





















