ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে এবং ৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গাজীপুরের কালীগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উদ্যোগে এক বিশাল পদযাত্রা ও মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালের সেই ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উদযাপন এবং দলটির মাসব্যাপী দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ সোমবার বিকেলে কালীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকা এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দুপুরের পর থেকেই গাজীপুরের বিভিন্ন প্রান্ত এবং কালীগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ব্যানার, ফেস্টুন, আর প্ল্যাকার্ড হাতে হাজারো নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ সমাবেশ অভিমুখে আসতে শুরু করেন। পুরো এলাকা “দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ” এবং “বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চাই” স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। দলটির উত্তরাঞ্চলীয় পর্বের এই বর্ণাঢ্য পদযাত্রাটি কালীগঞ্জ বাজারের প্রধান প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় প্রদক্ষিণ করে কালীগঞ্জ বাজার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স সংলগ্ন বাসস্ট্যান্ডের মূল সভামঞ্চে এসে শেষ হয় এবং সেখানেই এক বিশাল মহাসমাবেশের সূচনা ঘটে।
মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করেন যে, শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই এবং জুলাই বিপ্লবীরা যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল, তা যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করা হবে। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সমালোচনা করে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানান এবং সরকারের চলমান মাদকবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন। জুলাইয়ের শহীদদের স্বপ্নপূরণে তিনি দেশের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি দেশের শাসনতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বলেন, জনগণের প্রকৃত ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ব্যালটের মাধ্যমে, তাই ২০২৬ সালের গণভোটের রূপরেখা দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো সংস্কারে গণভোটের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, দলটির উত্তর অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম তার সাবলীল ও উদ্দীপনামূলক ভাষায় তরুণ সমাজকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, তরুণ ও যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন না হওয়া পর্যন্ত এনসিপির কর্মীরা রাজপথ ছেড়ে যাবে না। এর পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য দেশবাসীকে সদা জাগ্রত থাকার আহ্বান জানান তিনি। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক অ্যাডভোকেট আলী নাছের খান।
জাতীয় নেতাদের পাশাপাশি এই মহাসমাবেশে আঞ্চলিক ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দও অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য ও সাংগঠনিক হুংকার তুলে ধরেন। মহাসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গাজীপুর জেলা এনসিপির আহ্বায়ক এবং আসন্ন কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এম এম শোয়াইব। তিনি তার সমাপনী বক্তব্যে কালীগঞ্জ অঞ্চলকে বৈষম্য, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন যে, কালীগঞ্জের মাটি জুলাইয়ের বিপ্লবীদের মাটি এবং এখানকার সাধারণ মানুষ এনসিপির ৩ দফা দাবির পক্ষে রায় দিয়েছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে এই আন্দোলনকে আরও বেগবান করার ঘোষণা দেন তিনি। এছাড়া মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন করে বিশেষ বক্তব্য রাখেন গাজীপুর মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল মুহিম এবং গাজীপুর জেলা এনসিপির সদস্য সচিব খন্দকার আল আমীন। তারা স্থানীয় যুব ও ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে আগামী দিনের জেলাভিত্তিক কর্মসূচিগুলোকে সফল করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আজকের এই ঐতিহাসিক উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়েই এনসিপির মাসব্যাপী দেশব্যাপী আন্দোলনের সফল সূচনা ঘটল। দলটির কেন্দ্রীয় রূপরেখা অনুযায়ী, আগামী এক মাসে দেশের ৬৪টি জেলার মোট ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় এই ‘জুলাই পদযাত্রা’ ও গণসংযোগ কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হবে, যার মূল লক্ষ্য থাকবে গণভোট বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
জহিরুল ইসলাম-উপসম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক। 






















